ইতালিতে জন্মগ্রহণ করা ফ্রেঞ্চ আপোলিনিয়ার (১৮৮০-১৯১৮) সুররিয়েলিজম’ শব্দটি উল্লেখ করেন। তাঁর লেখা কবিতায় আদি-সুররিয়েলিজম কাব্যের নিদর্শন রয়েছে। ‘টাইরেসিয়াম-এর ‘স্তন’ নাটকে প্রথম সুররিয়েলিজম প্রয়োগ করেন তিনি। পরে তা ইংরেজী ও জার্মান সাহিত্যেও এ ধারা সম্প্রসারণ হয়। ‘চাঁদের আলো’ কবিতায় তিনি পরাবাস্তবতাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন এভাবে —
‘ক্রোধীর ঠোঁটে শ্রবণসুখকর চাঁদ
আর রাতের লোভার্ত নগর ও উদ্যান
মৌমাছির মতো নক্ষত্রদের ভ্রম হয়
এই আলোকময় মধুতে আঙুরবাগান আহত
আকাশ থেকে ঝরছে মধুর মধু
চাঁদের রশ্মি যেন মধুর ঝিকিমিকি
হাওয়ায় গোলাপে মিশছে মধুর চন্দ্রিমা।’
বাঙলা সাহিত্যে অনেকে পরাবাস্তবতা, যা জাদুবাস্তবতার বেশ কিছু প্রয়োগ করেছেন। বর্তমানকালের প্রায় সব কবিই পরাবাস্তবতার প্রয়োগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বা কাজী নজরুল কবিতা ও গানে সামান্য পরাবাস্তবতার উপাদান ব্যবহার করেছেন। যেমন ‘আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই, সেই পাহাড়ের ঝরনা আমি…।’ বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, শক্তি চট্টপাধ্যায়, সুনীল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মান্নান সৈয়দ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ কবিতায় পরাবাস্তবতা এনেছেন মাঝে মধ্যে।
আধুনিক বাংলা কবিতায় কবি বিষ্ণু দে তাঁর ‘ঊর্বশী ও আর্টেমিস’ কাব্যগ্রন্থে প্রথম সার্থক সুররিয়েলিজম বা পরাবাস্তবতার প্রয়োগ করেন। তবে পরাবাস্তবতার উপাদান সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর ‘ঝরাপালক’, ‘বনলতা সেন’, ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থে পরাবাস্তবতার ব্যবহার অনেক বেশি। তাঁকে ‘পরাবাস্তবতার কবি’ বলা হয়ে থাকে। পরাবাস্তবতার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে তিনি জনপ্রিয় হয়েছেন পরাবাস্তবতার কয়েকটি উদাহরণ দিতে পারি নিচের কবিতায়।
‘জানতাম তোমার চোখে একদা জারুলের বন
ফেলেছে সম্পন্ন ছায়া, রাত্রির নদীর মতো শাড়ি
শরীরের চরে অন্ধকারে জাগিয়েছে অপরূপ’ — (কোন এক পরিচিতাকে, শামসুর রাহমান)
‘অনেক আকাশ’ কবিতায় সৈয়দ আলী আহসান ধরা দিয়েছেন এভাবে-
‘… সোনার ঘাসের পাতা ঘুমের মতো
অজস্র পাতার ফাঁকে হৃদয়ের নদী হয় চাঁদ নেমে ঘাসে’ —
আল মাহমুদ বেশ কয়েক জায়গায় পরাবাস্তবতার উপাদান ব্যবহার করেছেন। ‘নদীর ভেতরে নদী’ কবিতায় পরাবাস্তবতার একটু প্রয়োগ দেখি-
‘নদীর ভেতরে যেন উচ্চ এক নদী —।
তিতাসের স্বচ্ছ জলে প্রক্ষালনে নেমেছে তিতাসই।
নিজের শাপলা লয়ে নেমে নদী নদীর ভেতরে
ঠাট্টা বা বিদ্রুপ নেই, শ্যেনচক্ষু, নেই চারণের বালি।’
মান্নান সৈয়দ বলতেন- সুররিয়েলিজমই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। তিনিও কবিতায় সার্থক পরাবাস্তবতার প্রয়োগ করেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ (১৯৬৭)। এখানে সুররিয়েলিজমের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তিনি জীবনান্দ দাশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা লিখেছেন এবং গবেষণা করেছেন। আর এ কারণে জীবনান্দের প্রভাব কবির মনে। আরো কয়েকটি কবিতায়।যেমনঃ
১) ‘দেখেছি ঘাসের মেঝে ছিন্ন
লাল মুন্ডু নিয়ে খেলে বিনা অপব্যয়ে
সূর্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে কালো রেলগাড়ি।’ (কবিতা, রাত্রপাত)
২) ‘জ্যোৎসনা হয় জল্লাদের ডিমের মতো জলহীন মুন্ডু
জোড়া-জোড়া চোখ
সাতটি আঙুলের ও একমুষ্টি হাত
রক্তকবরীর অন্ধকার
এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিৎকার’ — (জ্যোৎসনা কবিতায়)
৩) ‘একেকটি দিন একেকটি সবুজভুক সিংহ’ কবিতায়-
‘পরিবর্তনের ছাদ বিড়ালের মতো
অন্যমনস্ক হওয়ার সুযোগে পা টিপে-টিপে এগোল
বরফের মানুষ নাজেহাল ছোটো-ছোটো নুড়ির আওয়াজ — কবি জীবনানন্দ দাশের কয়েকটি কবিতার কিছু চরণ তুলে ধরলে তাঁর কবিতায় আমরা দেখতে পাই তিনি জাদুবাস্তবতার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত। লক্ষ করুন — তিনি পাঞ্জাবির পকেটে চাঁদের উঁকি দেয়া দেখতে পান-
‘দেখি তাঁর চুলে রাত্রি থেমে আছে
চোখে সবুজ প্রিজমের ভেতর থেকে লাফিয়ে পড়ে ফড়িং
… বেরিয়ে আসছে সান্ধ্যবেলার সবগুলো তারা
দেখি তার পাঞ্জাবির ঢোল পকেটে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ।’
‘বনলতা সেন’ কবিতাগ্রন্থের ‘তুমি’ কবিতায় রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতা সম্বন্ধে যা বলেন তার মধ্যে কবিতার সংজ্ঞা অবশ্যই নিহিত আছে। ’
জীবনান্দ দাশ তাঁর বিপুল কবিতাসম্ভারে প্রেম, প্রকৃতি রোমান্টসিজিমরে নিবিড় সমারোহ! জাদুবাস্তবতাবাদ নামটি সাহিত্যতত্ত্বে বিংশ শতকীয় সংযোজন হলেও সাহিত্যে এর ব্যবহার বহুপ্রাচীন। ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ প্রভৃতি প্রাচীন মহাকাব্যগুলোকেও জাদুবাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। অনেক সাহিত্য সমালোচক বলেন — জাদুবাস্তবতাবাদের সাথে অনেকের পরাবাস্তবতাবাদকে (Surrealism) মিলিয়ে ফেলেন, যদিও দু’টি ধারণায় খুবই কাছাকাছি, কিন্তু এক নয়। বলা যেতে পারে একটি গাছের দু’টি শাখা, জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় দু’টি ব্যাপারকেই খুব দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছেন। জীবনানন্দ অন্যান্য কবিতায় পরাবাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার অনেক অনেক উদাহরণ যথাস্থানে দেবো। আগেই বলা হয়েছে,কবিতায় জাদুবাস্তবতা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে জাদুবাস্তবতা কাকে বলে। সত্যি কথা বলতে জাদুবাস্তবতার সংজ্ঞা দেওয়া বড়ই কঠিন। আমরা তুলে ধরবো বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য সমালোচকের উক্তি। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য সমালোচকরা জাদুবাস্তবতা বা Magical realism নানা সংজ্ঞা প্রদান করেছেন নানা ভাবে।
বিশ্বসাহিত্যের গল্প, উপন্যাস ও কবিতায় খ্যাতনামা লেখকদের রচনায়রিয়ালিজম, ক্রিটিক্যাল রিয়ালিজম, সোস্যালিস্ট রিয়ালিজম, সুররিয়ালিজম, স্ট্রাকচারালিজম, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম, মডার্নিজম, পোস্টমডার্নিজম, পোস্ট কলোনিয়ালিজম, ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তবতা অনুষঙ্গ আমরা লক্ষ্য করি। আমাদের আলোচ্য বিষয় কবিতায় জাদুবাস্তবতা। জাদুবাস্তবতাকে তুলে ধরার শৈল্পিক রীতি হল জাদুবাস্তবতাবাদ। কবিতায় জাদুবাস্তবতা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে আমাদেরকে জাদুবাস্তবতাবাদের বৈশিষ্টগুলোর উপর নজর দিতে হয়। স্বপ্ন ও কল্পনার মিশেলে অতিপ্রাকৃত, অলৌকিকত্ব, কল্প কাহিনী, রহস্যময়তা ইত্যাদি জাদুবাস্তবতাবাদে দেখা যায়।
সমকালীন বিশিষ্ট ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও সমালোচক-গবেষক ডেভিড লজের মতে, ‘নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে বাস্তবতা লক্ষণীয় হলেও অনেক সময় ঘটনার বাস্তব অনুষঙ্গের ভেতরে চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটে তখন তাকে জাদুবাস্তবতাবাদ আখ্যায়িত করা হয়,যার বিশেষ সংশিষ্টতা আছে লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখায়, এসম্বন্ধে আগেই আভাস দেওয়া হয়েছে। যদিও এর দেখা পাওয়া যায় অন্যান্য মহাদেশের লেখকদের গল্প-উপন্যাসে, যাঁদের মধ্যে আছেন গুন্টার গ্রাস, সালমান রুশদি এবং মিলান কুন্দেরা। এই লেখকদের প্রত্যেকেই নানান ঐতিহাসিক ঘটনার সহিংস আলোড়ন এবং ব্যক্তিগত জীবনেও নানান উত্থান-পতনের তীব্র সংক্ষোভের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের সেই অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে প্রকাশের জন্য বাস্তববাদ যথেষ্ট ধারণক্ষম নয় বলেই তাঁরা মনে করেছেন। Lodge, 1992 : 114 লজ আরো মনে করেন, ‘অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিমাণ ব্রিটিশ লেখকের মধ্যে এর প্রভাব রয়েছে এবং বাইরে থেকে এর আগমন ঘটলেও কয়েকজন একে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছেন; তাঁদের মধ্যে আছেন ফে ওয়েল্ডন, অ্যাঞ্জেলা কার্টার এবং জেনেটি উইন্টারসন। Lodge,1992 : 114 জাদুবাস্তবতাবাদ দৃষ্টান্ত হিসেবে মিলান কুন্দেরার ‘দ্যা বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’র একটা অংশ উপস্থাপন করেন। আমরা সেই অংশটিতে দেখি একদল নৃত্যরত মানুষ নাচতে নাচতে মাটি থেকে হাওয়ায় ভাসতে থাকে এবং ভাসতে ভাসতে আকাশে উড়ে যায়। জাদুবাস্তবতাবাদ একদিক থেকে মূলত এমন একটি রচনারীতি ও প্রকাশভঙ্গি যাতে অনেক বিষয়কে নতুন করে বর্ণনা করা হচ্ছে। এই রীতিটিকে প্রায়শই মিশিয়ে ফেলা হয় অতিপ্রাকৃত, উদ্ভট, আজগুবি ঘটনার সঙ্গে।
জাদুবাস্তবতার কথা আলোচনা করতে ডেভিড লজ যে প্রধান চারজন লেখক নাম উল্লেখ করেছেন তারা হচ্ছে: গাবরিয়াল গার্সিয়া মার্কেস গ্যুন্টার গ্রাস, মিলান কুন্দেরা এবং সালমান রুশদি। জাপানের হারুকি মুরাকামিএর ‘দ্য উইন্ড আপ বার্ড ক্রেনিকেল’, রাশিয়ান লেখক মিখাইল বুলগাকভের ‘দ্য মাস্টার এন্ড মারগারিটা’, চিলির ইসাবেলা আলেন্দের ‘দ্য হাউস অফ দি স্পিরিট, আমেরিকান-আফ্রিকান লেখিকা টনি মরিশনের ‘বিলাভেড’ এ magical realism বা.জাদুবাস্তবতা পুরোমাত্রায় বর্তমান। (আগামীকাল শেষ পর্ব)