উপন্যাসে জাদুবাস্তবতাবাদের পুরোধা গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস সম্বন্ধে না বললে সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা সম্বন্ধে সম্যক জানা সম্ভব নয়। মূর্তিমান কলোম্বিয়ান লেখক গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ৮৭ বছর বয়সে মারা যান, কিন্তু তিনি তাঁর উপন্যাসগুলোতে উজ্জ্বল ভাবে আবিষ্কার করে গেছেন জাদুবাস্তবতার অনুষঙ্গে। তাঁর মাস্টারপিস ‘ওয়ান হান্ডের্ড ইয়ারস অফ সোলিচিউড’ ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়, যার জন্য ১৯৮২ সালে নোবেল প্রাইজ লাভ করেন। তিনি নোবেল ভাষণে বলেন যে তিনি চেষ্টা করেছিলেন কেন জাদুবাস্তবতা লাতিন আমেরিকায় এতটা চমৎকার। তিনি বলেন, “ কবি ও ভিক্ষুক, সঙ্গীত শিল্পী ও ভবিষ্যত দ্রষ্ট্রা , যোদ্ধা ও বদমায়েস এবং সব প্রাণীর মাঝে উদ্দাম বাস্তবতা আছে,আমরা তার মাঝে সামান্য কল্পনার মেলবন্ধন ঘটিয়েছি’ —
জাদুবাস্তবতা প্রসঙ্গে আরো বলা যায়, জাদুবাস্তবতা একটা অনুষঙ্গ যাতে অপ্রাকৃত উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। প্রথম কালপর্বে কবি সাহিত্য ও চিত্রকরা সাহিত্য ও চিত্রকলায় শুধুমাত্র বাস্তববাদিকতাকে তুলে ধরতেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশ শতকের চল্লিশ ও পঞ্চাশ শতকে ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকজন লেখকের লেখায় জাদুবাস্তবতার অনুষঙ্গের উপস্থিতি বিশেষ ভাবে উঠে আসে। Magical realism শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় ফ্রাৎস রো (১৮৯০- ১৯৫৫) নামে একজন কলা সমালেচকের বইয়ে ১৯২৫ সালে। এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রের লক্ষ্য ছিল দৈনন্দিন জীবনের রহস্যজনক উপাদানগুলোকে মেলে ধরা। রো যদিও সাহিত্যের রচনা শৈলিতে Magical realism হিসাবে বলে মনে করেননি। তাঁর মতে এই শব্দটির ব্যবহারিক ভিত্তি ছিল রোজকার জীবনের চমকের সামনে মানুষের বিস্ময়েরই অভিব্যক্তি।
আমেরিকার প্রখ্যাত মহিলা কবি এমিলি ডিকিনসন (১৮৩০- ১৮৮৬) কাব্য প্রতিভার কথা উপেক্ষিত থেকে গেছে। উনিশ শতকের এমিলির কবি জীবনের কালপর্বে বিশ্ব সাহিত্যের গদ্য ও পদ্যে জাদুবাস্তবতার কথা না উঠলেও কবি এমিলি ডিকিনসন তাঁর লেখা কবিতায় পরবর্তীকাল পর্বে সাহিত্য সমালোচকরা জাদুবাস্তবতা এর অনুষঙ্গ লক্ষ করেন। উনিশ শতকের উত্তর আমেরিকার প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে অন্যতম মহিলা কবি এমিলি ডিকিনসন এর কাব্য প্রতিভার ওপর আলোকপাত করা যেতে পারে। এমিলি ডিকিনসন উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত কবি, তাঁর জীবিতকালে ২০০০ এর অধিক কবিতা রচনা করলেও বেঁচে থাকাকালে তাঁর কবিতা তেমন প্রকাশিত হয় না।
এমিলি ডিকিনসনের কবিতাগুলো বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তাঁর লেখা কবিতার অর্থ তাৎপর্যপূর্ণ এবং জাদুবাস্তবতায় বর্ণনামূলক কাব্যিক অনুষঙ্গে ভরপূর। তাঁর লেখা কবিতায় ধ্যানমগ্নতা, বিশ্বজনীনতা, প্রেম ভালবাসা ও প্রকৃতি বন্দনায় ঋদ্ধ। এমিলি ডিকিনসনের কাব্যপ্রতিভার স্বাক্ষর ছড়িয়ে আছে তাঁর অসংখ্য কবিতায় জাদুবাস্তবতা বা magical realism অনুষঙ্গে, যদিও গল্প উপন্যাসে জাদুবস্তবতা বা উপস্থিতি বিশ শতকের চল্লিশ ও পঞ্চাশ শতকে ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকজন গদ্য লেখকের লেখায় জাদুবাস্তবতার শব্দটির কথা শোনা যায়। পদ্য গদ্য না হলেও কোন কবির কবিতায় কাব্যিক অনুষঙ্গ সাথে সাথে তা বর্ণনামূলক যে হতে পারে, তা এমিলি ডিকিনসনের কবিতায় উঠে এসেছে। তাঁর অনেক কবিতায় magical realism বা জাদুবাস্তবতার উপস্থাপিত হয়েছে গদ্যের আঙ্গিকে। প্রসঙ্গক্রমে তাঁর সে ধরনের কবিতার দুটো স্তবক উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা যেতে পারে।
THE CHARIOT.
Because I could not stop for Death,
He kindly stopped for me;
The carriage held but just ourselves
And Immortality.
We slowly drove, he knew no haste,
And I had put away
My labor, and my leisure too,
For his civility.
My labor, and my leisure too,
For his civility
রথ
কারণ আমি মৃত্যুর জন্য থামতে পারলাম না,
সে আমার জন্য অনুগ্রহ করে থামল;
রথটি ছিল ঠিক আমাদের আর অমরত্বের কাছাকাছি।
আমরা ধীরে ধীরে চালিত হলাম, সে জানতো কোন তাড়াহুড়ো নেই,
আর আমি দূরে ছিলাম
আমার পরিশ্রম, আর আমার অবসরও,
তার সৌজনের জন্য। (প্রাবন্ধিকের অনুবাদ)
মূলত এক নজরে একে সহজ বলে মনে হতে পারে। মানুষ প্রায়ই ভুলে যায় বর্ণনার কথা যার মাঝে কবিতার অর্ন্তনিহিত ভাব উপস্থিত থাকে। সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখলে অনুধাবন করা যাবে এমিলি ডিকিনসন সময় নিয়েছিলেন একটা গল্প সৃষ্টিতে তাঁর THE CHARIOT কবিতায় । সম্ভবত এমনটা লেখায় এমিলি ডিকিনসনের ছিল একটা সুনির্দিষ্ট সাঙ্কেতিক উদ্দেশ। এই কবিতাটিতে তিনি magic realism বা জাদুবাস্তবতার উপস্থাপন করেছেন সজ্ঞানে। আর একটি কবিতায় এমিলি ডিকিনশন কিভাবে magic realism বা জাদুবাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন তা তাঁর magic realism কবিতায় দেখা যেতে পারে। আমরা এই কবিতার প্রথমাংশ এখানে উদ্ধৃত করে magic realism-এর উপস্থিতি লক্ষ করার চেষ্টা করব।
PLAYMATES
God permits industrious angels
Afternoons to industrious.
I met one, — forgot my school-mates,
All, for him, straightway.
God calls home the angels promptly
At the setting sun;
I missed mine. How dreary marbles,
After playing Crown!
ঈশ্বর অনুমতি দেন পরিশ্রমী দেবদূতদেরকে
বিকালগুলোতে পরিশ্রমী খেলা খেলতে।
আমি একজনের সঙ্গে মিলিত হলাম-ভুলে গেলাম আমার স্কুলের সহপাঠীদের,
সবাই, তার জন্য সোজাসুজি এল।
ঈশ্বর দেবদূতদেরকে দ্রুত
সূর্য অস্তমিত হবার সময় ফিরে আসার জন্য ডাকলেন;
আমি নিজেকে হারালাম। বিষণ মার্বেলগুলো,
খেলায় বিজয়মুকুট লাভের পর। (প্রাবন্ধিকের অনুবাদ)
আপনি দেখতে পাবেন এই কবিতাটিতে একটি শিশু, (যে হতে পারে একটা ছোট্ট মেয়ে) যার মুখ দিয়ে ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে। কবিতাটির প্রথম স্তবকের তৃতীয় লাইনে মেয়েটি ঘোষণা করে একজন দেবদূতের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা।
God calls home the angels promptly
At the setting sun;
I missed mine. How dreary marbles,
After playing Crown
আমরা এই পৃথিবীতে বসবাস করি আমাদের মত । এই পৃথিবীতে আমরা স্কুলে শিশু, তাদের মার্বেল এবং সূর্যের উদয় এবং অস্ত অবলোকন করি। একটি ছোট্ট মেয়ে দেবদূতদের সঙ্গে খেলা করে। এখানেই এমিলি ডিকিনসন জাদুবাস্তবতার অনুষঙ্গ উপস্থাপন করেছেন বিশেষ নৈপুন্যে, একথা স্বীকার করতেই হবে।
এমিলি ডিকিনসনের কবিতায় বর্ণনামূলক অনুষঙ্গ বিশেষ ভাবে উঠে এসেছে তা দেখা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। My Life had stood — a Loaded Gun –এই কবিতায় এমিলি ডিকিনসন আগের দুটো কবিতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন । আমরা এখানে এই কবিতাটির অংশ তুলে ধরছি।
My Life had stood — a Loaded Gun —
In Corners — till a Day
The Owner passed — identified —
And carried Me away –
And now We roam in Sovereign Woods —
And now We hunt the Doe –
And every time I speak for Him —
The Mountains straight reply —
আমার জীবনটা দাঁড়িয়েছিল — গুলিভরা একটা বন্দুকের সামনে-
কোণগুলোতে- পুরো একটা দিন
আমাকে শনাক্ত করে মালিক আমাকে এখানে নিয়ে আসে –
এখন আমরা সার্বভৌম বনে বনে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরছি-
আর এখন আমরা হরিণ শিকার করছি-
প্রত্যেবার আমি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলি- পর্বত সোজাসুজি জবাব দেয় — ( প্রাবন্ধিকের অনুবাদ)
এমিলি ডিকিনসনের এই কবিতার কিছুটা ক্ষোভ আছে। বর্ণনায় উঠে এসেছে বন্দুকের কথা। এখানে তিনি অনুশোচনাহীনভাবে হরিণ হত্যা করে গর্ববোধের আভাস দিয়েছেন। বন্দুকের গুলির শব্দ পর্বতে পর্বতে প্রতিধ্বনিত হয়। দেবদূতদের সঙ্গে একটা শিশুর মিলিত হওয়া এবং একজন মহিলার মৃত্যুর তারিখের দিকে যাওয়ার মধ্যে এই কবিতার পার্থক্য আছে My Life had stood — a Loaded Gun কবিতাটিতে। এই কবিতাটির বর্ণনায় একজন অনুশোচনাহীন যৌনতা ও রিরংসা জারিত শয়তানের বিপথগামীতার কথা কবিতায় উঠে এসেছে। এটা এমিলির লেখা একটি অসাধারণ কবিতা। ঘেরাটোপে আবদ্ধ আগ্রাসনের শিকার মুক্তিকামী মহিলার মুখ দিয়ে এমিলি ডিকিনশন উৎপীড়নের কথা উপস্থাপন করেছেন। তিনি এই কবিতায় বন্দুক ও পুরুষ শিকারীর মধ্যে আক্ষরিক নয় এমন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আধিপত্যবাদী এক মহিলাকে তুলে ধরেছেন।
এমিলি ডিকিনসনের অন্যান্য কবিতার মত এক কবিতাটিতে অনেক না বলা কথা, অব্যাখ্যাত বর্ণনার সমারোহ দেখতে পাওয়া যায়। কোথা থেকে বন্দুক আসে? কেন এটার মধ্যে বোধশক্তি আছে? সত্যি কথা বলতে এ কবিতায় অপ্রকৃত অনুষঙ্গে গল্প উঠে এসেছে। এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যায় এমিলি ডিকিনসনের কবিতায় ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম, ফ্যান্টাস্টিক অনুষঙ্গ সহ নানা ধরনের বিষয় উঠে এসেছে।
গত শতকের পৃথিবীর নানা ভাষার কবিরা তাদের কবিতায় ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম বা জাদুবস্তবতার অনুষঙ্গ উপস্থাপন করেছেন সচেতন ভাবে অরিজোনার কবি আলবার্তো আলভারো রিওস । আলবার্তো আলভারো রিওস এর জন্ম অরিজোনার নোগালসে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫২ সালে। তিনি আগস্ট ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অরিজোনার স্টেট পোয়েট হিসাবে বিবেচিত হন। দশটি কাব্য, তিনটি ছোটগল্প সংকলন ও একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ পেয়েছে।তিনি তাঁর কবিতায় magic realism বা জাদুবাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন সচেতন ভাবে। আলবার্তোর লেখা কবিতা Domingo Limon, Nani, Teodoro Luna’s Two kisses ইত্যাদি কবিতায় জাদুবস্তবতা বিশেষ ভাবে দৃশ্যমান।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ