কবিতায় জাদুবাস্তবতা এবং কবিতায় তার অবস্থান প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই কবিতা কি এবং কবিতা কাকে বলে তার ওপর আলোচনা করতে হয় ।
কবিতার ইংরেজি শব্দ poetry যা প্রাচীন গ্রীক শব্দ ποιεω, Poetry শব্দটি Greek শব্দ poiesis থেকে এসেছে যার অর্থ হলো নির্মাণ বা তৈরি, যা শিল্পের একটি শাখা, এই শাখায় ভাষায় নান্দিক কবিতা মানুষের ভাষার বিশেষ কলা, যা সাধারণ গদ্যরীতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
প্রকৃতপক্ষে, কবিতার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া বড়ই কঠিন! বিশ্বসাহিত্যে খ্যাতিমান কবিরা বিভিন্নভাবে একে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘প্রগাঢ় আবেগগুলোর স্বত:ফুর্ত উচ্ছ্বাস’ তাঁর মতে, কবিতা সব জ্ঞানের মূল্যবোধ, সৌন্দর্যের প্রকাশ। নিভৃতচারী নারী কবি এমিলি ডিকিনসন বলেন, ‘যদি আমি একটি বই পড়ি তবে তা আমার ঠান্ডা শরীর উষ্ণতায় ভরে উঠে, আমি জানি ওইটাই কবিতা ‘ডিলান টমাস কবিতার সংজ্ঞা দেন এভাবে;’কবিতা, যা আমাকে হাসায় কিংবা কাঁদায় অথবা হাই তোলায়, যা পায়ের আঙুলের নখ শিহরিত হয়, যা আমার দিয়ে এটা কিংবা ওটা কিংবা কিছু করাতে চায়।’ খ্যাতিমান ইংরেজ কবি কোলেরিজের মতে, শ্রেষ্ঠতম বিন্যাসের শব্দগুলোর বিন্যাসই কবিতা। কবিতায় মূল্যবোধ,সৌন্দর্য প্রকাশ করতে গেলে কবিতায় তন্ময়তা, সঙ্গীতের মন্ময়তা এবং একটা বাণী। তাছাড়া ছন্দময়তা তো অবশ্য থাকতে হবে।
ইংলিশ রেঁনেসার প্রাক্কালে জন মিলটন, ক্রিস্ট্রোফার মার্লো, শেক্সপিয়ার প্রমুখ কবিরা যে সমস্ত কাব্যিক নাটক রচনা করেন, যা চিরকালীন । ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কালপর্বে গেটের “ফস্ট”, কোলেরিজের “কুবলাই খান” এবং জন কিটসের “Ode on a Grecian Urn.” কাব্য অন্তরঙ্গ অনুষঙ্গে কাব্যানুরাগী মানুষকে বিমোহিত করে। জন কিটস বলেছেন, “Beauty is truth. Truth, beauty. That is all ye know on Earth and all ye need to know.” ‘সৌন্দর্য হচ্ছে সত্য, সত্য হচ্ছে সৌন্দর্য পৃথিবীতে তোমরা এ সব জান আর তোমাদের এ সব জানার প্রয়োজন।”
সত্য আর সৌন্দর্যের বহি:প্রকাশই কবিতা এটাই প্রকাশ পেয়েছে জন কিটসেই এই কবিতায়। কবিতা সম্বন্ধে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল। এবার আমাদের আলোচ্য বিষয় কবিতায় জাদুবাস্তবতা। আমরা দেখার চেষ্টা করবো জাদুবাস্তবতা আসলে কী?
জাদুবাস্তবতা হলো সাহিত্যের একটি ফর্মেট, নমুনা বা গঠন। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ম্যাজিক রিয়ালিজম। বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের গল্প এবং উপন্যাসে যার প্রভাব লক্ষণীয় হলেও মূলত ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যিকরা একে বেড়ে উঠতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তারা এটি করেছে ইংরেজি সাহিত্য হতে নিজেদের আলাদা করতে। যা মূলত তাদের সাহিত্যের একটি আন্দোলন।
বিশ্বসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার ব্যবহারে মার্কেজকে বলা যায় ‘দ্যা ফাদার অফ ম্যাজিক রিয়ালিজম’। কেননা তিনি তার গল্প এবং উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার যে ব্যবহার করেছেন তার ফলেই বিশ্বসাহিত্য তাকে সাদরে গ্রহণ করেছে।এছাড়া ইসাবেল এবং কার্পেন্তিয়ারও ছিলেন এ বিষয়ে সিদ্ধহস্ত। তবে জাদুবাস্তবতার ধারণাটির জন্মদাতা কোনো ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যিক নয়। জার্মান চিত্রকলা বিষয়ক সমালোচক ফ্রাঞ্জ রোহ তার নবীন ইউরোপীয় চিত্রকলা বিষয়ক বইটিতে প্রথম জাদুবাস্তবতা শব্দের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন। চিত্রকলায় যা ব্যবহার হত। পাঠকগণদের নিকট উদাহরণস্বরূপে বলা যায়, পাঠকগণ মোনালিসার হাসির সঠিক ব্যাখ্যা এ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশারদগণ বিভিন্ন অর্থে বলেছে। যাকে জাদুবাস্তবতা বলা চলে।
জাদুবাস্তবতা সাহিত্যে প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৯৫৫ সালে এঞ্জেল ফোর্স নামে স্পেনীশ উপন্যাসে। পরবর্তী সময়ে মার্কেজ, ইসাবেল, কার্পেন্তিয়ারা একে বিশ্বসভার আসরে স্থান করে নিতে সাহায্য করেন তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে। যদি আমরা ১৭ শতক বা আঠার শতকের বিশ্বসাহিত্য নিয়ে কথা বলি, তাহলে দেখা যায় — ১৭২৬ সালে প্রকাশ হওয়া জনাথন সুইফটের উপন্যাস ‘গালিভার ট্রাভেলস’ এবং ১৮৪২ সালে প্রকাশিত হওয়া নিকোলাস গোগল এর উপন্যাস ‘নোজ’ এ জাদুবাস্তবতার ব্যবহার ছিল। কিন্তু তখন এর কোনো ধারণা ছিল না। এর ধারা প্রমাণ হয় যে, জাদুবাস্তবতা কোনো মৌলিক বিষয় নয়। লেখকের কল্পনা শক্তিই মূলত তার প্রকৃতরূপ। এছাড়া ওই সময়ের পরে ডিকেন্স, বালজাক আর কালভিনোর উপন্যাসেও জাদুবাস্তবতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
এরই ধারাবাহিকতায় কবিতায় জাদুবাস্তবতা ব্যবহারের চেষ্টা করছেন সাহিত্যিকরা। কিন্তু যা করা হচ্ছে তা কী জাদুবাস্তবতা হচ্ছে নাকি তা বিচার সাপেক্ষ? কেননা কোনো অবাস্তব ঘটনার অবতারণা, পৌরাণিক কাহিনি বা মিথ ইত্যাদি বিষয়কে জাদুবাস্তবতা বলা যায় না। জাদুবাস্তবতা সেটা যা বাস্তবতাকে বিশেষ কিছু শক্তিমত্তায় বা অলৌকিক রূপে প্রকাশ করা হবে। যাতে বাস্তবতার সাথে অদ্ভুত বা বিস্ময়কর কোনো বিষয়ের সংমিশ্রণ ঘটানো হয়। এই জাদুবাস্তবতা মূলত গড়ে ওঠে কাহিনিকে কেন্দ্র করে। যার জন্য গল্প বা উপন্যাসে এর প্রয়োগ হয়ে থাকে কবিতায়ও এটি ব্যবহার করা যায়। তবে তা সবার দ্বারা সম্ভব নয়। কেননা অদ্ভুত কোনো বিষয়ের অবতারণা করলেই সেটা জাদু বাস্তবতা হয় না। আর কবিতা তো কাহিনি নির্ভর না।বাংলা সাহিত্যে কেউ কেউ এটা ব্যবহার করতে গিয়ে এমন কিছু লিখে যে তাতে কবিতার কোনো মৌলক বিষয় বা মূলভাব থাকছে না। কবিতার যদি মূলভাবনাই না থাকে তাহলে ওই লেখার কি কোন মূল্য আছে? আমাদের মনে রাখা উচিত যে কবিতায় তার বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ।
পাঠক কবিতার মাঝে একটি রহস্য খুঁজে পায় বা ঘোরের মাঝে আবর্তিত হয়, কীভাবে এটি সম্ভব? ঠিক এই বিষয়টিরই নাম দেয়া হয়েছে জাদুবাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়ালিজম। অর্থাৎ কবিতার রহস্যতাকেই কবিতায় জাদুবাস্তবতা (magical realism) বলা চলে।
জাদুবাস্তবতার আগে সাহিত্যে পরাবাস্তবতার অবতারণা করেছেন সাহিত্যিকরা। পরাবাস্তবতা হচ্ছে এমন এক ধরনের বাস্তবতা যার সঙ্গে চাক্ষুষ বাস্তবতার কোন মিল নেই। ইংরেজীতে সুররিয়েলিজম (surrealism) বলা হয়। বস্তুত চেতনার মূল ভিত্তি হলো অযুক্তি ও অবচেতন। ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক ধারণা মিলানো যায় এখানে। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের ভাবনা- মানুষ অবচেতন মনে অনেক কিছুই করে বা ভাবে। তিনি বলেন — এ ভাবনা চেতন মনের চেয়ে অবচেতন মনেরই বেশি। পরাবাস্তবতা হচ্ছে মানুষের চেতনটা যখন শিথিল হয় তখন মানব মনে অবচেতন প্রভাব ফেলে। এটি হচ্ছে- কবির প্রতীক ও চিত্রকল্পসমূহের মধ্যে যোগসূত্র। মূলত সুইজারল্যান্ড থেকে উঠে আসা ‘ডাডাইজম’ এর পরবর্তী আন্দোলন হচ্ছে ‘সুররিয়েলিজম’ বা ‘পরাবাস্ততা’। এখন আবার তাকে জাদুবাস্তবতা বলছেন অনেকে। জাদুবাস্তবতাবাদ এবং পরাবাস্তবতাবাদ উভয়ই ১৯২০ সালের দিকে তাত্ত্বিক রূপ পায়। এবং প্রায় সমসাময়িক সময়েই এদের ইশতেহার রচিত হয়। সে সময়টা ১৯২৫ সালের দিকে ফ্রাঞ্জ রোহ জাদুবাস্তবতাবাদ এবং এর কিছুদিন আগেই আন্দ্রে ব্রেতঁ প্রকাশ করেন পরাবাস্তববাদের ইশতেহার। এখন যাকে জাদুবাস্তবতা বলছেন অনেকে।
মার্ক আর্নেস্টের সংজ্ঞা আমরা তুলে ধরতে পারি। সুররিয়েলিজমকে তিনি বলেছেন সুররিয়ালিস্টের লক্ষ্য হচ্ছে অবচেতনার বাস্তব চিত্র আঁকা নয় কিংবা অবচেতনার বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে কল্পনার আলাদা এলাকা সৃষ্টি করাও নয়। এর লক্ষ্য হলো চেতন ও অবচেতন মনের সাথে বাইরের জগতের সব দৈহিক ও মনের বেড়া তুলে দেয়া। এই পরিপ্রেক্ষিত, আসলে পরাবাস্তবতাই জাদুবাস্তবতা। একারণে আমরা পরাবাস্তবতার কবিতাগুলোর। আলোকপাত করতে পারি। (চলবে)