ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে মহাশিবরাত্রি পালিত হয়। দেবাদিদেব মহাদেব যিনি পরমসত্ত্বা রূপে ঘোষিত, ব্রহ্মা-বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতার উপাস্য, সৃষ্টি-স্থিতি-লয়রূপ তিন কারণের কারণ সেই শিব ঠাকুরকে নারীজাতি চিরকাল স্বামী হিসাবে কামনা করে এসেছেন। কখনো তিনি রুদ্র ভৈরব কখনো শান্ত সমাহিত বিশ্বনিয়ন্তা আবার কখনো সমগ্র নারী সমাজের কাছে নয়নবিমোহন পুরুষ রূপে আরাধ্য।
আসলে বাঙালির দেবতারা কোনদিনই মন্দিরের সসম্ভ্রম দূরত্বে আবদ্ধ ছিলেন না। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে তাঁদের অবাধ লীলাখেলা। তাই, এতবড় দেবতা হওয়া সত্ত্বেও, কোথাও যেন তিনি আমাদের কাছে খুব সাধাসিধে, ছাপোষা, বউকে ভয় পাওয়া ঘরের মানুষটি হয়ে আছেন।
কখনো সৃষ্টি, কখনো প্রলয় আবার কখনো শান্ত হয়ে কৈলাসে গভীর ধ্যানে মগ্ন আবার পরমুহূর্তেই ত্রিশূল আর ডমরু হাতে রুদ্ররূপ ধারণ করেন। এইভাবে শিবঠাকুর পৌরাণিক আখ্যায়, গল্প কথায়, নাটকের মধ্যে দিয়ে ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছেন। আবার এই নায়কপ্রতিম ইমেজের বাইরে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ঘরের বাবাটি।

সাচী আর্ট
কিছু শিল্পীর তুলির ছোঁয়ায় শিবের চেহারা নিয়ে তৈরি হয় ‘আমার শিব বনাম তোমার শিব’ জাতীয় প্রবল বিতর্কের। কোন ছবিতে তিনি অত্যন্ত পেশীবহুল (সিক্সপ্যাক), কোথাও তাঁর চুল জটামুক্ত হয়ে হওয়ায় উড়ছে। আবার নন্দলাল বসু, যামিনী রায়ের ক্যানভাসে দেখা মেলে মহাদেবের নাদুসনুদুস সুখী অবয়ব।
আসলে আমরা যে রাজ্যে বা পরিবেশে বসবাস করি, তাঁর প্রভাবই পরে আমাদের মননে দেবতার চেহারা সৃষ্টিতে। আর শিল্পী তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে, শিল্পকর্মের নিপুনতায় আঁকেন দেবতাকে।
ভারতীয় শিবের প্রথম চেহারা পাওয়া যায় যজুর্বেদে, শতরুদ্রীয় অংশে। সেখানে শিব ধ্বংসের দেবতা, অতএব তাঁর চেহারাতেও একটা রুদ্র ভাব আছে, অনেকটা যোদ্ধার মতোই। কাজেই তিনি ভুঁড়িওয়ালা নন আবার ‘জিম’ করা নায়কদের মতোও নন।
দক্ষিণ ভারতে ফোক কালচারে প্রভাবিত শিবের গোঁফ আছে, চোখ অগ্নিবর্ন।

রাজা রবি বর্মা কৃত শিব
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বাঙালির ঠাকুরদেবতা তো সবার! নজরুলের অসামান্য সব শ্যামাসঙ্গীত আমরা ভুলে গিয়েছি? আর লালনের গানগুলো? …দেবতাদের নিয়ে রঙ্গব্যঙ্গের পরম্পরাও অনেক দিনের। মঙ্গলকাব্য থেকেই চলছে।’’ অন্নদামঙ্গলের শিবের নাকি কোনও গুণ নাই তার কপালে আগুন বা কুকথায় পঞ্চমুখ, কণ্ঠ ভরা বিষ। আগমনি গানে উমার বর শিব, ঘটিবাটি বেচে নেশা করছেন… ইত্যাদি। সুপ্রাচীন কাল থেকে বহমান ভারতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব অসীম।
শিবের সঙ্গে এমন গাঢ়, সরল সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ মালদহের গম্ভীরা গানে। শিবের এক নাম ‘গম্ভীর’, তাই শিবের বন্দনাগীত হলো গম্ভীরা গান। বরেন্দ্র অঞ্চলে গাজন-পরবর্তী যাত্রানুষ্ঠানে শিবঠাকুরের সঙ্গে কৃষকদের কথোপকথন চলে। গম্ভীরা গায়করা নিজেদের রাগ বিরক্তি অভিমান মঞ্চে উপুড় করে দেন বুড়ো শিবের ওপর, দর্শক মহানন্দে তা উপভোগ করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাঁরা গাইতেন, ‘শিব হে! স্বরাজ পেলে মন্ডা দেব, ঘন দুধের বাটি দেব, নইলে কাঁচকলা, ও ভোলা ও ভোলা!’ “কোনকিছু পাওয়ার আশায় দুধ-মন্ডা মানত করা আর কাজ না হলে কাঁচকলা দেবার হুমকিটি লক্ষণীয়। কোথাও যেন শিবের মতো বন্ধু গরিবের আর কেউ নেই , ছবিটি ফুটে উঠেছে …দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা।”

অর্ধনারীশ্বর, শিল্পী নন্দলাল বোস
দুঃখ দুর্দশা ধর্মীয় ভেদাভেদ মানে না। শিবের গম্ভীরা গান মুসলিম ভাইয়ের কণ্ঠে কোনোদিন দর্শকের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
শিব-ই একমাত্র ভগবান যিনি বহুবিবাহের মধ্যে আটকে পড়েননি। জীবের উদ্ধারে গরল ধারণ করেছেন বিনিময়ে কিন্তু কিচ্ছু দাবী করেননি। সামান্য শ্বেত কল্কে, আকন্দ, ধুতরা, বেলপাতা পেয়েই খুশি হন তিনি। যাঁর মাথায় জল ঢাললেও খুশি হন। মহাশিবরাত্রির ব্রতকথা (ব্যাধের কাহিনী) তারই প্রমাণ। জগৎ সংসারে তিনিই একমাত্র পুরুষ যিনি স্ত্রীর ক্রোধ শান্ত করতে তাঁর পদতলে শুয়ে পড়তেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেননি।
প্রতিটা মেয়েরই স্বপ্ন থাকে তাঁর স্বামী তাঁর কথা শুনবে, ভালোবাসবে, খেয়াল রাখবে, যত্ন নেবে, সম্মান করবে, অনুভূতিগুলোকে মূল্য দেবে। তাই হয়তো মেয়েরা ঈশ্বরের কাছে স্বামী চাওয়ার সময় শিব ঠাকুরের মতোই স্বামী চান।
প্রচলিত লোকগাথা অনুযায়ী, শিবের জটায় গঙ্গাকে অবস্থান করতে দেখে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন পার্বতী। তাঁকে শান্ত করার জন্যে পার্বতীর শরীরের সঙ্গে মিলিত হন মহেশ্বর। একাংশে বর্তমান থাকে শিবের উপস্থিতি, অন্য অংশে বিরাজ করেন নারী শক্তি পার্বতী।

শিল্পী যামিনী রায়
‘অর্ধনারীশ্বর’ মূর্তিতে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, একটি পুরুষ কিংবা একটি নারী দুজনেই কিন্তু একে অপরের পরিপূরক। প্রত্যেকেই কিন্তু অর্ধেক। পূর্ণতার জন্য তাদের পারস্পরিক অপেক্ষা আছে। আর সেই অপেক্ষার মধ্যে আছে প্রেম, ভালোবাসা এবং শারীরিক আকর্ষণ— পৃথিবীর তিন সত্য।
পুরানমতে শিবচতুর্দশীর দিন শিব-পার্বতীর বিবাহ হয়েছিল, তাই ঐ দিনটি খুবই মহত্বপূর্ণ।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্’ এই তিনটি শব্দের মধ্যেই শিব শব্দের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা যায়। শিব ও সত্য পরস্পর এক ও অভিন্ন। তাই শিবপূজায় সত্য জীবন যাপনের জন্য সংকল্প করতে হয়। ঐ সত্যনিষ্ঠা মন, বাক্য ও আচরণে সর্বদা ভক্তিসহকারে পালন করা হলেই পরম সুন্দর শিব-চেতনায় মন ভরে উঠবে। তাই সারা দেশে অন্ধকার আর অজ্ঞতা দূর করতে শ্রদ্ধা, ভক্তিতে হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে পালিত হবে মহা শিবরাত্রি।।
“ওম ত্র্যম্বকম যজামহে সুগন্ধিম পুষ্টিবর্ধনম্।/ উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যৌর্মুক্ষীয় মামৃতাত্।।”
Shiboratri r aagerdin emon lekha pore mon ta khub valo hoye uthlo
কতো কিছু জানলাম।