যা নেই ভারতে, তা নেই মহাভারতে — মহাকাব্যের এই রাজনৈতিক, সামাজিক, কৃষ্টিশীল ব্যাপ্তি যতদূরসম্ভব দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনও গল্পগাথায় নেই বলেই যুগে যুগে শিল্পী সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, নাট্যপরিচালক, চিত্রশিল্পী, গদ্যশিল্পী মহাভারতের গহীনে ডুব দিতে চেয়েছেন। প্রত্যেকে তার মত করে যাপিত সময়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন মহাভারতের বাস্তবতার জটিলতাকে। যে বোঝার চেষ্টায় জুড়ে যায় ৪০০ বছর আগের মুঘল সময়ের সম্রাট আকবরের উদ্যমে রাজমনামা নামে অনুবাদ থেকে চিকাগো প্রেসের ক্রিটিক্যাল এডিশন থেকে বর্তমান সময়ে সত্যজিত রায়ের পাশাখেলা দৃশ্যায়িত করার অপূর্ণ খোয়াব থেকে হলিউডের পরিচালক পিটার ব্রুকের পাঁচ মহাদেশিয় ম্যাগনাম প্রোডাকশান ডিজাইন থেকে শাঁওলী মিত্রের নাথবতী অনাথবত থেকে তিজনবাঈ-এর অসামান্য পাণ্ডবানী থেকে বুদ্ধদেব বসুর মহাভারতের কথা থেকে খুব সম্প্রতি শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষের ধারাবাহিক মহাভারতের ইন্টারপ্রিটেশন থেকে এক্কেবারে হাল আমলের চিত্রবাখানকার শুভাপ্রসন্নের ধারাবাহিকভাবে মহাভারতের চরিত্রগুলোর অন্তরে ডুব দিয়ে দেখার প্রচেষ্টাগুলি। প্রত্যেক শিল্পীই তার মত করে মহাভারতকে বোঝার চেষ্টা করেছেন, তাদের অনুভূতিগুলো পাঠক, দর্শকদের মধ্যে চারিত করে নতুনভাবে মহাভারতকে যুগোপযোগী করে পেশ করেছেন, নিজেকে রাঙ্গিয়ে নিয়েছেন চিরনতুন মহাভারতের রঙিন আঙিনায়।

কলকাতার রূপ-রস-গন্ধকে টিনড্রামিয় ক্যানভাসে ধরা আধুনিকতম চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন গত কয়েক বছর ধরে তাঁর মত করেই মহাভারতের জটিলতম চরিত্রগুলোকে বোঝার ভাবনা ভাবছেন এবং ঘনিষ্ঠমহলে চারিয়ে দিয়ে কলকাতার আর্ট গ্যালারিতে তিনি ধারাবাহিকভাবে মহাভারতের চরিত্রগুলোকে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতার ভাবনায় তিনি খুব সম্প্রতি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন ‘ফেসের আ রেস ফ্রম এপিক’ নামে আলিপুরের গ্যালারি সংস্কৃতিতে। প্রদর্শনী উদ্বোধনে ছিলেন হর্ষবর্ধন নেওটিয়া, সত্যম চৌধুরী, ব্রাত্য বসু প্রমুখ।

প্রদর্শনী বিষয়ে শুভাপ্রসন্ন বললেন, “মহাভারত যে শুধুমাত্র শৈল্পিক দিক থেকে উন্নত তা নয়, এই মহাকাব্যের এক একটি চরিত্রের এতরকম দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকী রাজনৈতিক দিকের এর প্রাসঙ্গিকতা আমাকে আকর্ষণ করে। প্রত্যেকটা চরিত্র এত আধুনিক, ঘটনাগুলো এত প্রাসঙ্গিক যে মহাভারত পুরোনো হওয়ার নয়। সেই আধুনিক মহাভারতকে আমার ক্যানভাসে রঙ তুলির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সমাজের মধ্যে তীব্র লোভ লালসা, ঈর্ষা, যৌনতা — সে সব অত্যন্ত ভালভাবে ফুটে উঠেছে মহাকাব্যে। আমি মহাভারত নিয়ে দীর্ঘদিন চর্চা করেছি। ছেলে বয়সে যে গল্প জানতাম, সেটা বড় হয়ে যখন নতুন করে দেখতে বুঝতে শুরু করলাম, তখন মনে হয়েছিল, আমায় মহাভারতকে নতুন করে উপস্থাপন করতে হবে।

অতিমারির আগে আমি ৬ ফুটের প্রমান আকারের বহু ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করেছি। সেই প্রদর্শনীটা আয়োজিত হয়েছিল কলকাতা সেন্টার ফর আর্টসে। দুর্ভাগ্য প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই লকডাউন নেমে আসে। সেই ছবি এখনও আছে। সেই ছবি ভবিষ্যতে বম্বে বা দিল্লিতে দেখানো হবে। এখানে, গ্যালারি সংস্কৃতিতে মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্রের মুখ নিয়ে ৩০টা ছবির প্রদর্শনী করছি। এরা নতুন করে গ্যালারি সাজিয়েছেন। নবসাজের পরেই আমার প্রথম প্রদর্শনী”, জানালেন শিল্পী।
প্রদর্শনী চলবে ২৩ মার্চ পর্যন্ত।
ছবি : অভিষেক সামন্ত, চয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়