বাংলা দেশের গৌরব অতীশ-দীপংকর-শ্রীজ্ঞান। বিক্রমপুর পগণায় জন্ম নেয়া অতীশ ভিক্ষু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলেন বিক্রমশীলা বিহারে। নিজ মেধা, প্রজ্ঞা ও সাধনার ওপরনির্ভর করে অল্প দিনের ব্যবধানে পদোন্নতি প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি এই বিহারের প্রধান পণ্ডিত হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
এক সময় বিক্রমশীলা মঠের তখনকার অধ্যক্ষ তার ওপর নানা গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। এক পর্যায়ে মহামতি বুদ্ধের মানবতার বাণী প্রচারে তিনি ভ্রমণ করেন মালয়ের সুবর্ণদ্বীপে।
তিনি সেখানে গিয়ে পরম যত্ন এবং আস্থার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং বৌদ্ধ দর্শনে অগাধ জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও উদ্ভূত নানা সমস্যা সমধানের সক্ষমতা লাভ করেন। তিনি ফিরে আসার পর তাকে বিক্রমশীলা বিহারের অধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। মনে করা হয় তার আন্তরিক প্রচেষ্টা, পাণ্ডিত্য, জ্ঞানানুরাগ ও সক্ষমতার গুণেই তখনকার প্রসিদ্ধ নালন্দা বিহার থেকে বিক্রমশীলার গুরুত্ব বেড়ে যায় বহুগুণে।
বিক্রমশীলা বিহার থেকে শিক্ষালাভের পর এখানকার শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মাকাণ্ডে ভারতবর্ষের সীমারেখা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষত, তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও কাজের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠ আন্তরিকতা বিশ্বের নানা স্থানে বৌদ্ধ ধর্মমত প্রসার ও প্রসারে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছিল।
আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান সম্পর্কে বলেছেন- ‘দীপঙ্কর হিন্দুযুগের শেষ অধ্যায়ের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরুষ এবং বাঙালি জাতির চির গৌরব। শ্রীজ্ঞানের নাম বৌদ্ধ জগতের পুরোভাগে। তাঁহার প্রতি সমস্ত এশিয়ার লোকের শ্রদ্ধা এরূপ হইয়াছিল যে, তাঁহার নাম শুনিলে রাজচক্রবর্ত্তীদের মস্তক আনত হইত।’
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান দশম-একাদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি পন্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন চর্চ্চা এবং প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়া জুড়ে স্মরণীয় অতীশ দীপঙ্কর। তাঁর প্রভাব আজও বিরাজ করছে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে।
তার পিতা কল্যাণশ্রী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। তাঁর বাল্যনাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। মায়ের নিকট এবং স্থানীয় বজ্রাসন বিহারে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি বিখ্যাত বৌদ্ধ গুরু জেতারির নিকট বৌদ্ধধর্ম ও শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
এ সময় তিনি সংসারের প্রতি বিরাগবশত গার্হস্থ্যজীবন ত্যাগ করে ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের সঙ্কল্প করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি পশ্চিম ভারতের কৃষ্ণগিরি বিহারে গিয়ে রাহুল গুপ্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং বৌদ্ধশাস্ত্রের আধ্যাত্মিক গুহ্যবিদ্যায় শিক্ষালাভ করে ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ উপাধিতে ভূষিত হন। মগধের ওদন্তপুরী বিহারে মহাসাংঘিক আচার্য শীলরক্ষিতের নিকট দীক্ষা গ্রহণের পর তাঁর নতুন নামকরণ হয় ‘দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান’। একত্রিশ বছর বয়সে তিনি আচার্য ধর্মরক্ষিত কর্তৃক সর্বশ্রেষ্ঠ ভিক্ষুদের শ্রেণিভুক্ত হন। পরে দীপঙ্কর মগধের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আচার্যদের নিকট কিছুকাল শিক্ষালাভ করে শূন্য থেকে জগতের উৎপত্তি এ তত্ত্ব (শূন্যবাদ) প্রচার করেন।
১০১১ খ্রিস্টাব্দে শতাধিক শিষ্যসহ দীপঙ্কর মালয়দেশের সুবর্ণদ্বীপে গিয়ে আচার্য চন্দ্রকীর্তির নিকট ১২ বছর বৌদ্ধশাস্ত্রের যাবতীয় বিষয় অধ্যয়ন করেন এবং ৪৩ বছর বয়সে মগধে ফিরে আসেন। মগধের তখনকার প্রধান প্রধান পন্ডিতদের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় ও বিতর্ক হয়। বিতর্কে তাঁর বাগ্মিতা, যুক্তি ও পান্ডিত্যের কাছে তাঁরা পরাজিত হন। এভাবে ক্রমশ তিনি একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী পন্ডিতের স্বীকৃতি লাভ করেন।
এ সময় পালরাজ প্রথম মহীপাল সসম্মানে তাঁকে বিক্রমশিলা (ভাগলপুর, বিহার) মহাবিহারের আচার্যপদে নিযুক্ত করেন। বিক্রমশিলাসহ ওদন্তপুরী ও সোমপুর বিহারে দীপঙ্কর ১৫ বছর অধ্যাপক ও আচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। সোমপুর বিহারে অবস্থানকালেই তিনি মধ্যমকরত্নপ্রদীপ গ্রন্থের অনুবাদ করেন বলে কথিত হয়।এ সময় মহীপালের পুত্র নয়পালের সঙ্গে কলচুরীরাজ লক্ষমীকর্ণের যে যুদ্ধ হয়, দীপঙ্করের মধ্যস্থতায় তার অবসান ঘটে এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।
এ সময় তিববতের বৌদ্ধ রাজা লাঃ লামা ইয়োসি হোড্ (লাহ্লামা-যে-শেস্) তিববতে বৌদ্ধধর্মের উন্নতি কামনায় দীপঙ্করকে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বর্ণোপহার ও পত্রসহ বিক্রমশীলায় দূত প্রেরণ করেন। দূত জানান যে, দীপঙ্কর তিববতে গেলে তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হবে। কিন্তু নির্লোভ নিরহঙ্কার দীপঙ্কর এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন।
রাজা লাঃ লামার মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র চ্যাং চুব (চ্যান-চাব) জ্ঞানপ্রভ তিববতের রাজা হন এবং তাঁর একান্ত অনুরোধে ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন বিশিষ্ট পন্ডিতসহ দীপঙ্কর মিত্র বিহারের পথে তিববত যাত্রা করেন। মিত্র বিহারের অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকগণ এ দলকে অভ্যর্থনা জানান; পথেও বহু স্থানে তাঁরা অভ্যর্থিত হন। নেপালের রাজা অনন্তকীর্তি দীপঙ্করকে বিশেষভাবে সংবর্ধিত করেন। তিনি সেখানে ‘খান-বিহার’ নামে একটি বিহার স্থাপন করেন এবং নেপালের রাজপুত্র পদ্মপ্রভকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেন।
তিববতরাজ চ্যাং চুব দীপঙ্করের শুভাগমন উপলক্ষে এক রাজকীয় সংবর্ধনার আয়োজন করেন, যার দৃশ্য সেখানকার একটি মঠের প্রাচীরে আজও অাঁকা আছে। সংবর্ধনা উপলক্ষে শুধু দীপঙ্করের উদ্দেশেই ‘রাগদুন’ নামক এক বিশেষ ধরনের বাদ্যযন্ত্র নির্মিত হয়েছিল। এ সময় রাজা চ্যাং চুব প্রজাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন যে, দীপঙ্করকে তিববতের মহাচার্য ও ধর্মগুরু হিসেবে মান্য করা হবে; বাস্তবে দীপঙ্কর এ সম্মান পেয়েছেনও।
তিববতে থো-লিং বিহার ছিল দীপঙ্করের মূল কর্মকেন্দ্র। এ বিহারে তিনি দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি তিববতের সর্বত্র ঘুরে ঘুরে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তিববতে বৌদ্ধধর্মের ব্যভিচার দূর হয় এবং বিশুদ্ধ বৌদ্ধধর্মাচার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিববতে তিনি মহাযানীয় প্রথায় বৌদ্ধধর্মের সংস্কার সাধন করেন এবং বৌদ্ধ ক-দম্ (গে-লুক) সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। তিববতবাসীরা তাঁকে বুদ্ধের পরেই শ্রেষ্ঠ গুরু হিসেবে সম্মান ও পূজা করে এবং মহাপ্রভু (জোবো ছেনপো) হিসেবে মান্য করে। তিববতের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ক্ষমতার অধিকারী লামারা নিজেদের দীপঙ্করের শিষ্য এবং উত্তরাধিকারী বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তিববতের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে দীপঙ্করের প্রভাব অদ্যাপি বিদ্যমান। তিববতে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি তিববতের একটি নদীতে বাঁধ দিয়ে বন্যা প্রতিরোধের মাধ্যমে জনহিতকর কাজেও অংশগ্রহণ করেন।
দীপঙ্কর তিববতের ধর্ম, রাজনীতি, জীবনীগ্রন্থ, স্তোত্রনামাসহ ত্যঞ্জুর নামে এক বিশাল শাস্ত্রগ্রন্থ সঙ্কলন করে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। তাই অতীত তিববতের যেকোনো বিষয়ের আলোচনা দীপঙ্করকে ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। এসব গ্রন্থ তিববতে ধর্ম প্রচারে সহায়ক হয়েছিল। তিববতে তিনি অনেক সংস্কৃত পুথি আবিষ্কার করেন এবং নিজহাতে সেগুলির প্রতিলিপি তৈরি করে বঙ্গদেশে পাঠান। অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ তিনি ভোট (তিববতি) ভাষায় অনুবাদও করেন। তিববতি ভাষায় তিনি বৌদ্ধশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা এবং কারিগরি বিদ্যা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন বলে তিববতিরা তাঁকে ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর মূল সংস্কৃত ও বাংলা রচনার প্রায় সবগুলিই কালক্রমে বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তিববতি ভাষায় সেগুলির অনুবাদ সংরক্ষিত আছে। তিববতি মহাগ্রন্থ ত্যঞ্জুরে তাঁর ৭৯টি গ্রন্থের তিববতি অনুবাদ সংরক্ষিত আছে। তাঁর রচিত প্রধান কয়েকটি গ্রন্থ হলো: বোধিপথপ্রদীপ, চর্যাসংগ্রহপ্রদীপ, সত্যদ্বয়াবতার, বোধিসত্ত্বমান্যাবলি, মধ্যমকরত্নপ্রদীপ, মহাযানপথসাধনসংগ্রহ, শিক্ষাসমুচ্চয় অভিসাম্য, প্রজ্ঞাপারমিতাপিন্ডার্থপ্রদীপ, একবীরসাধন, বিমলরত্নলেখ প্রভৃতি। বিমলরত্নলেখ মূলত মগধরাজ নয়পালের উদ্দেশে লেখা দীপঙ্করের একটি সংস্কৃত চিঠি। চর্যাসংগ্রহপ্রদীপ নামক গ্রন্থে দীপঙ্কর রচিত অনেকগুলি সংকীর্তনের পদ পাওয়া যায়।
সুদীর্ঘ ১৩ বছর তিববতে অবস্থানের পর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৭৩ বছর বয়সে তিববতের লাসা নগরের নিকটস্থ লেথান পল্লীতে ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে দেহত্যাগ করেন। তাঁর সমাধিস্থল লেথান তিববতিদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ২৮ জুন দীপঙ্করের পবিত্র চিতাভস্ম চীন থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকায় আনা হয় এবং তা বর্তমানে ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে সংরক্ষিত আছে।
বিক্রমশীলা বিহার থেকে শিক্ষালাভের পর এখানকার শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মাকাণ্ডে ভারতবর্ষের সীমারেখা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষত, তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও কাজের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠ আন্তরিকতা বিশ্বের নানা স্থানে বৌদ্ধ ধর্মমত প্রসার ও প্রসারে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছিল। আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান সম্পর্কে বলেছেন- ‘দীপঙ্কর হিন্দুযুগের শেষ অধ্যায়ের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরুষ এবং বাঙালি জাতির চির গৌরব। শ্রীজ্ঞানের নাম বৌদ্ধ জগতের পুরোভাগে। তাঁহার প্রতি সমস্ত এশিয়ার লোকের শ্রদ্ধা এরূপ হইয়াছিল যে, তাঁহার নাম শুনিলে রাজচক্রবর্ত্তীদের মস্তক আনত হইত।
জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান উচ্চশিক্ষা অর্জন করার পর নিজ এলাকা বিক্রমপুর ও বগুড়ার সোমপুর মহাবিহারে অধ্যাপনা করেছেন এবং সেখানে বসে বই লিখলেন ‘মধ্যামকররত্নপ্রদীপ’। ওদন্তপুরি ও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন এবং পরবর্তীতে রাজা নয় পাল অতীশ দীপঙ্করকে বিক্রমশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
তিব্বতীয় আচার্য বিনয়ধর গ্যা-ট-সন, পণ্ডিত ভূমিগর্ভ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে নিয়ে নেপাল ও হিমালয়ের দুর্গম পথ দিয়ে যাত্রা করেন। পথে দুইবার দস্যুদের কর্তৃক আক্রান্ত হন। পথে তিব্বতী পণ্ডিত গ্যাটসন মারা যান। নেপালরাজ অনন্তকীর্তির সঙ্গে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের সাথে দেখা হয় এবং অনন্তকীর্তির পুত্র বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন। নেপালে প্রায় এক বছররের কাছাকাছি পর্যন্ত ছিলেন; তখন ১০৪১ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে। এ নেপালে বসেই ‘চর্যাসংগ্রহপ্রদীপ’ রচনা করেছিলেন। পালরাজ নয় পালকে উপদেশমূলক একটি পত্র লিখেন, কিভাবে রাজ্য শাসন করবেন এবং প্রতিবেশী রাজাদের সাথে ব্যবহার কেমন হব- এরূপ প্রিয় রাজাকে পত্র ‘বিমলরত্মলেখ’ নামে সেই চিঠিটি বিখ্যাত হয়ে আছে।
তিব্বতীয়দের জ্ঞানের আলোয় আনয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখলেন- ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’ ‘The lamp of Enlightenment’ও ‘বোধিমার্গ-প্রদীপ-পঞ্জিকা’ এবং দৈনন্দিন জীবন চরিতের জন্য ‘দশ-অকুশল-কর্ম-পথ-দেশনা’ মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য লিখেন, , ‘Sman-yig sa-sbyor dar-ya-kan’ ‘চিকিৎসা-জীব-সেবা’ ‘The Method of Curing Head Ailments’ অতীশের অসামপ্ত কাজগুলো অতীশের প্রাণপ্রিয় শিষ্য ডোম-তোন-পা, অতীশের বইগুলো অনুবাদ করেন। পরবর্তীতে শিষ্যকেই অতীশের উত্তরাধিকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিন শতাধিক গ্রন্থ ও অনুবাদ রচনা করেন। তিব্বতের রাজা Byam-chub-hod of M-nah-ris দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে যে ‘অতীশ’ উপাধি প্রদান করা হয় সেই ‘অতীশ’ শব্দের অর্থ- শান্তি বা জ্ঞানের অগ্রপথিক।
বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো স্বপ্ন বুনন করেন এবং মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের শ্রীজ্ঞানের জন্মভূমি বজ্রযোগিনী গ্রামে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ ছাত্র নিয়ে পরিদর্শন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ঢাকা জাদুঘরের তৎকালীন সহকারী কিউরেটর শ্রী গণেশ চক্রবর্তী। ১৯৭৮ সালের ২৮ জুন মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের দেহাবশেষ তার স্বদেশের ঢাকাস্থ তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে আনা হয়।
১৯৮৩ সালে অতীশের দীপঙ্করের বাস্তুভিটায় মুন্সীগঞ্জস্থ (বিক্রমপুর) বজ্রযোগিনী গ্রামে অতীশের দীপঙ্করের হাজার বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়। সেই সময়ে অতীশের বাস্তুভিটায় অতীশের স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মৃতিসৌধ ও অতীশ দীপঙ্কর স্মৃতি কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী সময়ে কিছু জমিও ক্রয় করা হয়। সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতি রক্ষার্থে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে অতীশের রিলিক্স স্তুপা নির্মাণ ও অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে অতীশ দীপঙ্কর লাইব্রেরি কাম মিউজিয়াম ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ভিক্ষুসংঘ বসবাস করে এ প্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে।
দার্শনিক অতীশ দীপঙ্কর, তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন — তিব্বত থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত।
তিনি জন্মেছিলেন প্রায় এক হাজার ৪০ বছর আগে আজকের বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রামে। বাবা ছিলেন গৌড়ীয় রাজ পরিবারের রাজা কল্যাণশ্রী, মা প্রভাবতী একথা আগেই বলা হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন চর্চ্চা এবং প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়া জুড়ে স্মরণীয় অতীশ দীপঙ্কর। তাঁর প্রভাব আজও বিরাজ করছে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে।
পনের বছর আগে বিবিসি বাংলার এই অনুষ্ঠান তৈরির সময় ভিক্ষু শুদ্ধানন্দ মহাথেরো ছিলেন ঢাকার বৌদ্ধ মহাবিহারের আচার্য।তিনি সে সময় বলেছিলেন,
“অতীশের বাস্তুভিটা নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা নামে পরিচিত ছিল। ১৯৫২/৫৩ সালে কিছুটা চিহ্ণ সেখানে ছিল। আমরাও দেখেছি একটা মন্দির ছিল সেখানে,” তিনি আরো।
“উনি যখন সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, তখন তৎকালীন বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় ওনাকে নাস্তিক হিসাবে অভিহিত করা হয়। যেহেতু বৌদ্ধরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না।”
দীপঙ্করের শিক্ষার শুরু হয় তন্ত্র চর্চ্চা দিয়ে। পরে তিনি বৌদ্ধ শাস্ত্র পাঠ করেন। হয়ত শৈশবেই তিনি ঘর ছেড়েছিলেন।
কিন্তু তান্ত্রিক আচারে আবদ্ধ না থেকে তিনি বৌদ্ধধর্মের হীনযান, মহাযান ও বজ্রযান শাখায় পূর্ণ জ্ঞান আয়ত্ত করেন।
এক হাজার এগারো কি বারো সালে গভীরতর জ্ঞানের খোঁজে তিনি গেলেন সুবর্ণদ্বীপে যা সম্ভবত আজকের ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ।
বারো বছর পর ভারতে ফিরে দীপঙ্কর নিযুক্ত হলেন ভাগলপুরে বিক্রমশীলা বিহারের আচার্য হিসাবে।
ভারতের বিহার বা মগধ রাজ্যের রাজা তখন বৌদ্ধ পাল রাজবংশীয় নয়পাল। পাল সম্রাটরা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন।
খ্রিস্টীয় ৯বম শতাব্দীর প্রথম ভাগে পাল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। ওই সময় পাল সাম্রাজ্যই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
“অতীশ দীপঙ্কর মহান হয়ে আছেন বহু দেশে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও পালির অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী বলছেন নয়পাল দীপঙ্করকে খুব সম্মান করতেন এবং দীপঙ্করের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ চলত।
“বলা যায় তিনি অনেকটা রাজার উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেছেন। তবে যে ঘটনাটা খুব বড় ছিল মনে হয় সেটা হল নয়পালের সঙ্গে কলচুরি রাজ লক্ষ্মীকর্ণের যে যুদ্ধ হয়, দীপঙ্করের মধ্যস্থতায় তার অবসান ঘটে। এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়।”
পাল রাজারা মগধে রাজত্ব করতেন। আর মগধের দক্ষিণ-পশ্চিমে নর্মদাতীরে ছিল চেদি রাজ্য, যেখানে রাজত্ব করতেন কলচুরি রাজ লক্ষ্মীকর্ণ। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল ত্রিপুরী। নয়পাল আর লক্ষ্মীকর্ণের মধ্যে বংশানুক্রমিক শত্রুতা ছিল। লক্ষ্মীকর্ণের পিতা গাঙ্গেয়দেব এবং নয়পালের পিতা মহীপাল
বিহারে নালন্দা বৌদ্ধবিহার: নালন্দায় কিশোর বয়সে শ্রমণ হিসাবে দীক্ষা নেন দীপঙ্কর এবং সেখানে ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
প্রায় পনের বছর ভারতে অধ্যাপনার পর তিব্বতের রাজার বারবার অনুরোধে ষাট বছর বয়সে দীপঙ্কর তিব্বতে যান সেখানে বৌদ্ধধর্ম পুনরুদ্ধার করতে। সেখানে তখন বৌদ্ধধর্মের অনুসারীর সংখ্যা কমছিল।
সেখানে তাঁকে বরণ করা হয়েছিল মহা আড়ম্বরে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিক ড: দীনেশ চন্দ্র সেনের ‘বৃহৎ বঙ্গ’-এ এর উল্লেখ রয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরঞ্জন অধিকারী।
“ড: সেনের বইয়ে সেই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলা আছে: ‘এই স্থানে দীপঙ্কর রাজ প্রতিনিধির হাতে উপহার হিসাবে পাঠানো চা পান করিলেন। ইহাই বোধহয় বাঙালির প্রথম চা খাওয়া’। অর্থাৎ আমাদের প্রতিনিধি হয়ে অতীশ দীপঙ্করই প্রথম চা পান করেছিলেন।”
তিব্বতবাসীদের দু:খকষ্টের বিবরণই দীপঙ্করকে সেদেশে যেতে রাজি করিয়েছিল। বাংলাদেশে অতীশ দীপঙ্করের জীবনীকার বিপ্রদাস বড়ুয়া বলেন,
‘অতীশ যেখানেই গেছেন, সেখানে সাধারণ মানুষের কষ্ট দেখেছেন। যেখানে তিনি দেখেছেন চাষবাসের জন্য সুবিধা আছে, সেখানে তিনি একজন এনজিনিয়ারের মত বাঁধ দিয়ে ফসল ফলানোর জন্য মানুষকে একত্রিত করেছেন,” বলেছেন বিপ্রদাস বড়ুয়া।
“কোথাও রোগ, শোক, মহামারি দেখা দিয়েছে- অতীশ সেখানে ছুটে গেছেন। নিজে তো তিনি ডাক্তারিশাস্ত্র জানতেন। মানুষের তিনি সেবা করেছেন, একত্রিত হয়ে যেখানে কাজ করেছেন।
নমস্য মহাজ্ঞানী অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞান তপস্যার জন্য আমরা গর্বিত।
মনোজিৎকুমার দাস, লেখক ও গবেষক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।