বহু সন্ন্যাসী ও সাধক, সাধারন মানুষ এই যোগী গুরুর সাধন নির্দেশ লাভ করে ধন্য হয়েছিলেন। যোগীরাজ শ্যামচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের সংস্পর্শে আসেন তিনি। ক্রমে যোগ সাধনার উচ্চতর ক্রিয়া ও পদ্ধতি শিক্ষা করে অসামান্য যোগশক্তির অধিকারী হয়ে সাধু সমাজে এক বিশেষ মর্যাদার আসন লাভ করেন বালানন্দজি। বালানন্দজি শিষ্যদের উপদেশ দিতেন ‘মক্ষিকা বন যাও’ অর্থাৎ মৌমাছি হয়ে যাও। যেখানে যার কাছে যত আধ্যাত্ম্য সম্পদের মধু পাবে তা সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ করে তোলো তোমার সাধক জীবনকে।
বালানন্দজির কাছে ‘আমি পথিক, পথ আমারই সাথী’ ছিল। মহারাজ বলতেন ‘রমতা যোগী ঔর বহেতা পানি’ এর মধ্যে কোন ময়লা জমে না। হিমালয়ের কোন তীর্থই তিনি ঘুরতে বাকি রাখেননি। একদিকে যেমন অমরনাথ কৈলাশ মদমহেশ কেদার বদ্রি প্রভৃতি পদব্রজে ঘুরে বেড়িয়েছেন তেমনি আবার সমতলে নেমে হরিদ্দার কাশি গয়া বৃন্দাবন পুরী এমনকি পূর্বপ্রান্তবর্তি সুদূর কামাখ্যা পর্যন্ত সকল তীর্থস্থান পরিভ্রমণ করেছেন।
শ্রী ভগবানের ঐশীশক্তি সব সময় ঘিরে থাকে মহাপুরুষদের জীবনকে। তাদের প্রভূত ত্যাগ ও তপস্যারই ফল তারা যেমন মাঝে মাঝে ঈশ্বরের কৃপা ও দর্শন লাভ করে ধন্য হন, তেমনি আবার তাদের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে বহু মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়। বালানন্দ মহারাজের মত দিব্য মহাপুরুষদের জীবনকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা ঘটেছে প্রচুর যা স্বল্প পরিসরে হয়তো বলা সম্ভব হবে না।
বঙ্গে তাঁর প্রথম দীক্ষিত শিষ্য রামচরণ বসু। রামচরণ বসুর সঙ্গে বালানন্দজির সাক্ষাৎ ও দীক্ষাদানের কাহিনীটি বড়ো মনোজ্ঞ।
কামাখ্যা থেকে ফেরার পর বালানন্দজি বাংলা নানা অঞ্চলে ঘুরে পৌঁছলেন রানাঘাটে। তখন রামচরণবাবু ছিলেন সেখানকার মহকুমা প্রশাসক।
রামচরণ বসু উনিশ শতকের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পরিবেশে বড়ো হয়েছেন ও শিক্ষা নিয়েছেন। ব্যবহারিক জীবনে তিনি ছিলেন বেশ সাহেবি রুচিসম্পন্ন।
হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবার প্রবণতা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও খ্রীষ্ট ধর্মের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ সেই সময় শহরতলির বহু যুবকের মধ্যে দেখা দিয়েছিল। রামচরণ বসুও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। হিন্দুধর্ম ও হিন্দুদেবদেবীর ওপর তিনি বিশ্বাস রাখতে পারেননি। সাধু সন্ন্যাসীদের প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল না। তবে ধর্মজীবনের প্রতি যোগ না থাকলেও রামবাবু ছিলেন সৎ ও কর্তব্যনিষ্ঠ।
একসময় তিনি এক ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছিলেন। রানাঘাটের কাছেই একটা ট্রেন দুর্ঘটনায় বহু লোক হতাহত হয়। সাব ডিভিশনের অফিসার রামবাবু সেই সময় কর্তব্য পালন করেনি বলে অভিযোগ উঠল, সংবাদপত্রে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও চলল। গভর্মেন্ট বাধ্য হয়ে তার কাছে কৈফিয়ত তলব করে। তাঁর চাকরি নিয়ে টানাটানি হওয়ার উপক্রম হলো।
রামবাবুর মা ছিল ভক্তিমতি।একদিন তিনি ইষ্টদেবের চরণে পুত্রের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা জানাচ্ছেন হঠাৎ অন্তর থেকে কে যেন বলে উঠলো,’তোদের আর ভয় নেই। ঈশ্বরপ্রতিম এক সাধক এগৃহে আসছেন। বিপদ এবার ঠিক কেটে যাবে’।
খানিক বাদে বৃদ্ধা জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন জটাজুট সমন্বিত এক দিব্যকান্তি সাধু তাদের বাংলোয় এসো উপস্থিত হয়েছেন। সাধু রামবাবুকে বললেন, ‘বাবা আমার একটা বাঘছালের বড় দরকার পড়েছে। এখানকার লোকেরা বলল আপনি নাকি একজন বড় শিকারি, ভাবলাম হয়তো আপনার কাছে এই বস্তুটি পাওয়া যাবে, সেই জন্যই এলাম।’
সাধুর দিব্যকান্তি প্রশস্তি মূর্তি দেখে রামচরন বাবুর মন ভরে গেল। দু-একটা ব্যাঘ্র চামড়া তাকে দেখালেন কিন্তু পছন্দ মতো নয় বলে সাধু তা গ্রহণ করলেন না। সামান্য একটু মাত্র দর্শনেই কিন্তু রামবাবুর জন্মান্তরের সাত্ত্বিক সংস্কার যেন সঙ্গে সঙ্গেই জেগে উঠলো। রাত্রিতে নিদ্রার ঘোরে এই সাধুর স্বপ্ন তিনি দেখলেন। পরের দিন রামবাবু সপরিবারে মহাত্মার স্মরণ নিলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পরেই প্রকাশিত হলো ট্রেন দুর্ঘটনার সরকারী তদন্তের ফল। সাধু মহারাজ যা বলেছিলেন তাই হল। রামচরণ বসু সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হলেন। সুযোগ্য প্রশাসক হিসেবে প্রশংসিত হলেন তিনি। বসু পরিবারের সবাই বিশ্বাস করলেন যে ঐ সাধুবাবার কৃপাতেই রামচরণ বিপন্মুক্ত হয়েছেন।
এরপর “সাহেব” রামচরণ বসুর জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন হল। তিনি রূপান্তরিত হলেন পরম ভক্তে।
রামবাবু ও তার স্ত্রী দীক্ষা নিলেন শ্রীমৎ বালানন্দ ব্রহ্মচারীর কাছে। পরবর্তীকালে তাঁর এবং পূর্নানন্দ ব্রহ্মচারীর প্রচেষ্টায় চিরপরিব্রাজক শ্রীমৎ বালানন্দ ব্রহ্মচারী দেওঘর বৈদ্যনাথ ধামে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। লোকে তাঁকে বলতো ‘সচল বৈদ্যনাথ’।
বালানন্দজি কলকাতায় বরানগরে একটি জায়গায় বেশ কিছুদিন ছিলেন। সেই সময় মহারাজা যতীন্দ্রনাথমোহন ঠাকুর তারই এক প্রতিনিধিকে পাঠালেন বালানন্দজিকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে। তাঁর প্রতিনিধি গিয়ে বলেন, ‘তিনি কৃপা করে তার বাড়িতে যেন একবার আসেন।’
যোগীবর বালানন্দজি প্রতিনিধিকে পরিহাস করে বলেন, যতীন্দ্রমোহন একজন মহারাজ আর লোকে তাকেও মহারাজ বলেই ডাকে। একজন মহারাজের কাছে আর একজন মহারাজেলে তাতে লজ্জার কি আছে? মহারাজ যতীন্দ্রমোহন নিজে এলেই তো ভালো হয়!
প্রতিনিধি গিয়ে যতীন্দ্রমোহনকে সব জানান। সব শুনে লজ্জিত হয়ে যতীন্দ্রমোহন নিজেই বালানন্দজীর কাছে যান। গিয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের মতো সংসারী লোক কি কিভাবে মুক্তি পাবে এই সংসারের মোহ বন্ধনের জাল থেকে?
বালানন্দজি বললেন, মহারাজ আপ অর উলট যাইয়ে অর্থাৎ এবার উল্টে যান।
এর মানে বুঝতে না পেরে মুখপানে তাকিয়ে থাকলে বালানন্দজি বললেন, ‘মহারাজ আপনার যা কিছু সবই থাকবে শুধু এবার দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টাতে হবে। সব আমার এই মনোভাবের পরিবর্তে সবই তাঁর অর্থাৎ ভগবানের এই মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। অহংবোধ দূরে সরিয়ে ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। নিজেকে সবকিছুই মালিক না ভেবে ভগবানের কর্মচারী ভাবতে হবে, তবেই মুক্তির পথ পাওয়া যাবে।’
কামাখ্যা থেকে ফিরে এসে বাড়ানোর যে তারকেশ্বর এবং অন্যান্য তীর্থ অঞ্চলে পর্যটন করতে থাকেন একবার হুগলি জেলায় ঘুরতে ঘুরতে তিনি শুনতে পান জলের মধ্যে এক জাগ্রত ও প্রাচীন শিবলিঙ্গ রয়েছে জলেশ্বর শিব’ নামে এটি পরিচিত। দীর্ঘ বনপথ অতিক্রম করে তিনি বিগ্রহ দর্শন করতে আসলেন। সন্ধ্যে তখন উত্তীর্ণ হয়ে আছে। মন্দিরটি অত্যন্ত প্রাচীন ভিতরে গৌরীপট্যের ওপর অর্ধ্বহস্ত পরিমাণ একটি শিবলিঙ্গ। পাশেই কিছুটা উঁচু স্থানে একটি প্রাচীন পঞ্চমন্দির। মন্দির সন্নিহিত কুপের জলে হাত পা ধুয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন, কিছুক্ষণ জপ ধ্যানে কেটে গেল। তারপর দেখা দিল এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা।
চারিদিক থেকে মন্দিরে দেওয়াল যেন তাকে চেপে ধরছে, আকাশে বাতাসে প্রচন্ড হাহা রব, এক অদৃশ্য শক্তির ঝটিকার আলোড়ন। হঠাৎ সেখানে দৈব বাণী শোনা গেল, ‘ওরে তুই পঞ্চমুন্ডির আসনে বলে অঘোর মন্ত্র জপ কর।’
বালানন্দজি তৎক্ষনাথ এক মনে নিবিষ্ট হয়ে মন্ত্র জপ করতে আরম্ভ করলেন। এক দিব্য প্রশান্তি ও আনন্দের সারা অন্তর তার ভরপুর হয়ে গেল উপলব্ধি করলেন দেবাদিদেবের কৃপা।
রাত্রি প্রভাত হয়ে গেল পরের দিন তাকে এই মন্দির থেকে বেরোতে দেখেই গ্রামের লোকেদের বিস্ময়ের সীমা রইল না, তারা বলাবলি করতে লাগলো কে এই শক্তিমান সাধু এই শিব মন্দিরের রাত্রিযাপন করা তো সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনি সিদ্ধ যোগীপুরুষ ছিলেন বালানন্দজি।
গঙ্গোনাথের আশ্রমটি গুরুজী বালানন্দজিকে দান করে যান কিন্তু গুরুদেবের দেহত্যাগের পর সেখানে আর মন টিকলো না বালানন্দজির। তাই তিনি গুরু ভাই কেশবানন্দজির ওপর আশ্রমে ভার দিয়ে দেওঘরে ফিরে গেলেন। এদিকে রামচরণ বাবুর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী বেশ কিছু টাকা নিয়ে করনিবাদে এক আশ্রমভবন প্রতিষ্ঠা করে দেন। তখন থেকেই বালানন্দজির ভক্তের সংখ্যা বেড়ে চলে।
আনন্দ কল্যাণের এক পূর্ণ কুম্ভ রূপে পবিত্র বৈদ্যনাথধামে বালানন্দ মহারাজ তখন অবস্থান করছেন। অতঃপর ধীরে ধীরে একদিন এই জীবনলীলা নাথের শেষ দৃশ্যটি এসে পড়ল। সাধনপীঠ দেওঘর রামনিবাস ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ধ্যানকুঠির ১৩৪৪ সালের ২৬শে জ্যৈষ্ঠ (৯ জুন, ১৯৩৭) বুধবার শুক্লাপক্ষের প্রতিপদতিথি। সেদিন সাধুশিষ্য, ভক্তজন ডাক্তার সকলেই বালানন্দ ব্রহ্মচারীকে বেষ্টন করে বসে আছেন। আজ মহারাজ আহার –ঔষধ – পথ্য এমনকি পরিধানের সামান্য কৌপিনটুকুও ত্যাগ করেছেন। আজ শিবকল্প মহাপুরুষ ১০৮ বছরের জীবনযাত্রা পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে মধ্যরাত্রিতে পরমাত্মায় লীন হয়ে গেলেন।
তার জীবনের শেষ বছরগুলিতে, ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে, তিনি সংস্কৃত ভাষার সংরক্ষণ এবং দেওঘরের জনগণকে চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের জন্য সংস্কৃত কলেজ এবং আয়ুর্বেদ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি বলতেন — “ভক্তি সাধনের নয়টি ধাপ। সেগুলি হল শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, পাদসেবন, অর্চন, বন্দন, দাস্য, সখ্য, ও আত্মনিবেদন। এই ধাপ গুলিকে ক্রমে ক্রমে সাধন করতে হয়, একেবারে হয় না। সবশেষে আসে আত্মা নিবেদন এবং তখনই তুমি ভগবানের হয়ে যাবে এবং ভগবান হয়ে যাবেন তোমার।”
তার দীর্ঘ সাধক জীবনে অসংখ্য মুমূর্ষ নর-নারীকে এক মহা জীবনের আস্বাদ দিয়ে গেছিলেন। নয় বছর বয়সে উজ্জয়নীর মহাকাল জ্যোতির্লিঙ্গের পাদপীঠ থেকে শুরু হয় যে মহাজীবনের অভিযাত্রা, বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের পরম সত্তায় সেদিন ঘটে তারই পরিসমাপ্তি।
তথ্য ঋণ : ভারতের সাধক (১ মখন্ড) – শঙ্করনাথ রায়, হে মহাজীবন– শ্রী সুমঙ্গল চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য।