ভারতবর্ষ সাধু সন্তদের দেশ। সাধু-সন্তদের জীবন সর্বস্ব ত্যাগ তিতিক্ষাময়। এখানে সাধুরাই মানুষকে মুক্তির পথ দেখান। এমনই একজন মহান সাধক হলেন মহর্ষি বালানন্দ ব্রহ্মচারী। উজ্জয়নীতে আবির্ভাব হয়েছিল এই সাধকের।
বালানন্দজির পূর্ব নাম ছিল পীতাম্বর। পিতাম্বরের বাবা ও মায়ের নাম বংশীলাল ও নর্মদাবাঈ। বংশীলাল ছিলেন হিমালয় অঞ্চলের মহাপীঠস্থান জ্বালামুখীর অধিবাসী। উজ্জয়িনীর অনাদি শিবলিঙ্গ মহাকালের পূজারী পুরুষোত্তম ও লক্ষীদেবীর একমাত্র সন্তান নর্মদার সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর বংশীলাল জ্বালামুখী ছেড়ে সস্ত্রীক শ্বশুরবাড়িতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। পুরুষোত্তমের উদ্যোগে বংশীলাল মহাকাল মন্দিরের কাজে ব্রতী হন। মহাকাল দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম।
সন্তানলাভের আশায় পুরুষোত্তমের অনুরোধে ভক্তিমতি নর্মদাবাঈ গোপালের আরাধনা করতে থাকেন। তারপর দেখলেন এক আশ্চর্য বালগোপালের স্বপ্ন। বালগোপাল তাঁকে বলছেন যে তিনি তার কাছে সন্তানরূপে আসছেন। ঐ স্বপ্নদর্শনের কিছুদিন পরেই আনুমানিক ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে পীতাম্বরের জন্ম হয়। স্বয়ং বালগোপালই সন্তানরূপে এসেছেন এই ভাবনা থেকেই বংশীলাল ও নর্মদা পুত্রের নাম রাখেন ‘পীতাম্বর’।
অল্পবয়সে পিতার প্রয়ানের পর মা নর্মদাবাঈ ছেলেকে খুব কষ্টে বড় করেন। ছোট থেকেই বালকের মন ছিল উদাসী- সংসারের প্রতি নিঃস্পৃহ। শিপ্রা নদীর তীরে মন্দির আর সাধুদের সঙ্গ লাভেই বালক আনন্দে থাকতো। ব্রহ্মচারীজির একাধিক গুরু ছিলেন। প্রথম গুরু যোগী ব্রহ্মানন্দ। দীক্ষা প্রাপ্তির পর সাধন ভজনে ব্রহ্মচারীজির দিন কাটতে থাকে। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে অনেক সাধু সন্ন্যাসী তাঁর সাথে দর্শন লাভ করতে আসতেন। ব্রহ্মানন্দ মহারাজ তাঁর সন্ন্যাস নামকরণ করেন “বালানন্দ ব্রহ্মচারী”।
মাত্র নয় বছর বয়সেই গর্ভধারিণী মায়ের স্নেহডোর ছিন্ন করে নদীরূপিনী জগৎ জননী নর্মদার কোলে আশ্রয় নিয়েছিলেন বালানন্দজি।এখান থেকেই তিনি তার ঐশ্বরিক যাত্রা শুরু করেন। এই সময়ে, তিনি অগণিত রহস্যময় ঘটনার সম্মুখীন হন। যখন তিনি গুজরাটের গঙ্গোনাথে পৌঁছেছিলেন, সেখানে তিনি তাঁর গুরু — শ্রী শ্রী ব্রহ্মানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজ, নর্মদাখণ্ডের মহান সাধক এবং শ্রদ্ধেয় যোগী-এর সান্নিধ্যে এসেছিলেন। নর্মদা তটের বিভূতিস্বরূপ গঙ্গনাথের ব্রহ্মচারী মহারাজের কাছে ব্রহ্মচার্য সংস্কার নিয়ে নর্মদার দর্শন ও কৃপালাভের জন্য নিরলসভাবে তখন নর্মদা পরিক্রমা ও তপস্যা শুরু করেন। কঠোর তপস্যার ফলস্বরূপ নর্মদা পরিক্রমাও সুসম্পন্ন করেছিলেন, এবং পরিক্রমাকালে তিনি কয়েকবার মায়ের অহেতুক কৃপাও জীবনে লাভ করেছিলেন। একবার তার জীবনের উপস্থিত হয়েছিলো এক কঠিন পরীক্ষা।
তখন ইংরেজ আমল। বালানন্দ ব্রহ্মচারী নর্মদা পরিক্রমা করতে এসেছেন মন্ডলা শহরে উদাসীন সম্প্রদায়ের একজন সাধু হরনম দাসের সঙ্গে। নর্মদার উত্তরতট ধরে তারা ‘হর নর্মদে হর’ বলতে বলতে এগিয়ে চলেছেন, এমন সময় এক ইংরেজ কমিশনার সাহেবের নজর পরলো তাদের দিকে। নর্মদার তটের ওপরেই ছিল সাহেবের বাংলো। এমনিতেই সেই সময় ওই অঞ্চলে চোর ডাকাতের উপদ্রব বেড়ে চলেছিল। কোন শ্রদ্ধা ছিল না সাহেবদের সাধু-সন্তদের উপর। তাদের ধারণা ছিল সাধু সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে এরাই চুরি ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে। ফলে এদেরকে ধরার জন্য সাহেব লোক পাঠালেন।
তখন বালানন্দজির বয়স ছিল আঠারো কি উনিশ, বলিষ্ঠ সুঠাম শরীর। কাজেই এ যে ডাকাত হবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই রইল না সাহেবের। সাধুদের ধরে নিয়ে আসতেই সাহেব তাকে অকথ্য ভাষায় তিরস্কার করলেন। হাজার চেষ্টা করেও সেই মুহূর্তে বোঝাতে পারলেন না ব্রহ্মচারীজি তিনি চোর ডাকাত নন, নর্মদা মায়ের পরিক্রমণকারী সন্তান।
উপরন্তু সাহেব ব্রহ্মচারীজির ঝুলি পরীক্ষা করে কিছু শেকড়-বাকড়, খানিকটা গাঁজা, একটি ছোট শাবল, একখানে ছোট্ট টাঙ্গি ও ছোট কাপড়ের পুঁটলিতে বাঁধা শংখিয়া বিষ। এ দেখে সাহেব তো গরম, ঠিক এ বেটা! শুধু চোর নয়, খুনে ডাকাত! সাহেব এদের জেলে পাঠাতে উদ্যত হলেন।
কোন পরিস্থিতিতেই বিচলিত হতেন না বা ভয় পেতেন না বালানন্দজি। শান্ত-ধীর চিত্তের মানুষ। বললেন শাবল ও টাঙ্গী দিয়ে তাঁরা ছোট ছোট গাছের ডাল কেটে রান্না বা ধুনির কাজে লাগায়। আর জামা কাপড় পড়ে না বলে শীতের সময় গা গরম রাখতে সামান্য গাঁজা বা শংখিয়া বিষ পান করেন।
সাহেব বিশ্বাস করলেন না, বললেন তুমি যদি এই বিষ খাও তবে আমার সামনে খাও। বালানন্দজি সমাহিত হয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তিনি ভাবলেন যদি সাহেব তাকে জেলে পাঠান তবে নর্মদা পরিক্রমারূপ যে তপস্যা, তা খন্ডিত হয়ে যাবে। এর চেয়ে নর্মদা মায়ের চিন্তা করে মৃত্যুই ভালো।
নর্মদা মাকে স্মরণ করে ঝোলা থেকে প্রায় আধতোলা বিষ বালানন্দজি পান করলেন সাহেবের সামনে। সাহেব এরপরও সাধুদের তার বাগানের মধ্যে আটক করে রাখলেন। বালানন্দজি বাগানের একটি গাছের তলায় যোগাসনে বসলেন।
হরনাম দাসকে বললেন, ভাই আমার প্রাণবিয়োগ ঘটলে তুমি আমার দেহটি নর্মদার জলে ভাসিয়ে দিও। হরনাম সে কথা শুনে কেঁদে ফেললেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছা পূরণের স্বীকৃতিও দিলেন।
বালানন্দজি মা নর্মদা-র কাছে আকুল প্রার্থনা করলেন, ‘হে দেবী মা, যুগ যুগ ধরে কত ভাবে কত রূপে তুমি সন্তানের প্রতি কৃপা বর্ষণ করে এসেছ, আজও আবার তুমি অভয় মূর্তি রূপে আবির্ভূত হও মা। তোমার সন্তানদের রক্ষা করো।’ এই বলে বালানন্দজি গভীর ধ্যানে মগ্ন হলেন। তাঁর বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হলো।
ভক্তির পরীক্ষায় মীরাবাঈকেও বিষ পান করতে হয়েছিল সেক্ষেত্রে গিরিধারী তার উপর কৃপা বর্ষণ করেছিলেন। বিষকে অমৃত বানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি যে ভক্তের ভগবান। বালানন্দজিকেও মা নর্মদা কৃপা করলেন।
বালানন্দজির ধ্যানের মধ্যে উদ্ভাসিত হলো এক অপার্থিব স্নিগ্ধ জ্যোতির্ময়ী নদীপ্রবাহ। সেই নদীপ্রবাহ থেকে আবির্ভূত হলেন পরমা সুন্দরী এক কুমারী মূর্তি। সর্বাঙ্গ তার রত্ন আভরণ, খোলা চুল চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, পদ্মের উপর দন্ডায়মানা সেই দেবীর মুখে সকৌতুক হাসি।
বালানন্দজি দর্শন করলেন রসঘন, জ্যোতির্ঘন ছন্দঘন নদীরূপীনি দেবী নর্মদাকে।
বালানন্দজি চোখ মেলে চাইলেন সঙ্গে সঙ্গে দেবী মূর্তি অদৃশ্য হলো। চোখ মেলে দেখলেন তার সামনে একজন ভক্ত হাতজোড় করে বসে আছেন, হরনামদাস পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আর একজন ডাক্তার তার চিকিৎসার জন্য উপস্থিত হয়েছেন। বালানন্দজি বুঝলেন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে মা নর্মদা তাকে রক্ষা করেছেন।অশ্রুপূর্ণ কণ্ঠে মা নর্মদার স্তব করতে লাগলেন।
বালানন্দজি যখন ধানমগ্ন ছিলেন তখন কমিশনার সাহেবের বাংলোয় ঘটে গেল এক অঘটন। সাহেবের ছেলে শিকার করতে গিয়ে ফিরে এসে অসুস্থ হয়ে বমি করতে শুরু করে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। সাহেব অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে বারবার বলতে লাগলেন, সাধুকে জোর করে বিষ খাওয়ানোর পাপে তার ছেলের এভাবে মৃত্যু হল। অনুতপ্ত মনে বালানন্দজির কাছে এসে ক্ষমা চাইলেন এবং তাদের দুজনকে মুক্ত করে দিলেন।
এই ঘটনার পর কমিশনার সাহেবের জীবনে এলো এক আমূল পরিবর্তন। তিনি হয়ে উঠলেন পরিক্রমাকারী সাধুদের পরম বন্ধু। তাদের জন্য চাল ডাল লোটা কম্বল টাকা পয়সা ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। এমনকি বালানন্দজির সঙ্গে সাহেবের কোন জায়গায় দেখা হলে, তিনি ঘোড়া থেকে নেমে টুপি খুলে তাঁকে সন্মান জানাতেন, তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন। (চলবে)
Asadharon sundor lekha
ধন্যবাদ ????