দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের তৃতীয় লিঙ্গটি হল প্রাচীন মালবে অর্থাৎ ইতিহাস-সংস্কৃতি-স্থাপত্য ও পৌরাণিক কাহিনীর সমাবেশে মুখরিত মহাকবি কালিদাসের উজ্জয়িনীতে। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরে রুদ্রসাগর হ্রদের তীরে অবস্থিত স্বয়ম্ভু শিব, মহাকালেশ্বর। প্রাচীনকালে যার নাম ছিল অবন্তিকা। মহাকালের রথের চাকায় কালিদাসের উজ্জয়িনী ধূলিসাৎ হলেও উজ্জয়িনী মহাভারতের যুগে ছিল, কালিদাসের কালেও ছিল, আজও আছে থাকবে ভবিষ্যতেও। এই পবিত্র ভূমিতে ১২ বছর অন্তর শিপ্রা নদীর রামঘাটে অনুষ্ঠিত হয় কুম্ভমেলা। শিপ্রা নদী এখানে উত্তরগামিনী।
আর্যভট্ট সূর্যসিদ্ধান্ত বলে, উজ্জয়নীর ভৌগলিক অবস্থানে অনুযায়ী অক্ষরেখা এবং কর্কটক্রান্তি রেখা মিলিত হয়েছে এখানে। এই শহরকে বলা হয় ভারতের গ্রিনউইচ। এই বিশেষ অবস্থান শিবমাহাত্ম্যের কারণ বলে অনেকই মনে করেন।

প্রকৃতিপ্রেমিক কালিদাসের প্রাণপ্রিয় উজ্জয়িনীতে কলকাতা থেকে সরাসরি আসতে গেলে নিকটতম বিমানবন্দর ইন্দোর। হাওড়া থেকে শিপ্রা এক্সপ্রেস ও অন্যান্য ট্রেনেও আসা যায়। এক সময় রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী নগরী। তার দরবারে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখায় নবরত্ন যোগদানের জন্য উজ্জয়িনী হয়ে উঠেছিল সারা ভারতের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ। কালিদাসের অতি প্রিয় নদী শিপ্রার শাখা নদী গন্ধবতীর তীরে অবস্থিত মহাকাল শিবের মন্দির।
মহাকাল জ্যোতির্লিঙ্গের আত্মপ্রকাশ প্রসঙ্গে শিব পুরাণে (জ্ঞানসংহিতা ৪৬ অধ্যায়) উল্লেখ আছে, পুরাকালে অবন্তীর নগরে এক বেদপ্রিয়, শিবভক্ত ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তাঁর দেবপ্রিয়, প্রিয়মেদ, সুবৃত ও সুব্রত নামে চার পুত্র ছিল। তারা সকলেই ছিলেন শিবভক্ত এবং ধর্মনিষ্ঠ। তাদের পূজার পুণ্য প্রভাবে একসময় অবন্তি নগরী হয়ে উঠেছিল ব্রহ্মতেজময়।

সেই সময় রত্নমালা পর্বতে দূষণ নামে ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত এক অসুরের আবির্ভাব ঘটে। আশীর্বাদের অহংকারে বলদৃপ্ত অসুর ব্রাহ্মণদের উপর অত্যাচার এবং নগরী ধ্বংস করতে থাকেন। তখন ভীত ও নিগৃহীত অবন্তীবাসিরা শিব ভক্ত ব্রাহ্মণের শরণাগত হলেন প্রতিকারের আশায়। ব্রাহ্মণেরা সকলকে অভয় দিয়ে পরিত্রাণের আশায় শিবের পূজোয় মগ্ন হলেন। এমন সময়ে উপাসনাক্ষেত্রে অসুর দূষণ এসে তার সঙ্গীদের আদেশ দিলেন সেই উপাসনা ভন্ড করে ব্রাহ্মণদের বধ করতে। আদেশ শেষ না হতেই সেই মুহূর্তে শিবপূজার স্থানে সৃষ্টি হলো একটি গর্ত। তারই মধ্যে থেকে মহাকাল স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে আশ্রিতদের রক্ষা করে বধ করলেন অসুরকে। এরপর ব্রাহ্মণ ও সকল ভক্তদের প্রার্থনায় স্থায়ীভাবে অনন্তকাল ধরে তাঁর শক্তি পার্বতীকে নিয়ে অবন্তিনগরেই থেকে গেলেন। একই সঙ্গে গর্তস্থিত শিবপ্রসিদ্ধি লাভ করলেন মহাকালেশ্বর নামে।
মহাকালেশ্বরের মূল মন্দিরে যাওয়ার পথে লক্ষ্মী আর নৃসিংহের বিগ্রহ, গণেশ মূর্তি, মঙ্গলেশস্বর মহাদেব, সংকটমোচন হনুমান, ভৈরব মন্দির পরে।
পাথরের দেওয়াল বিশিষ্ট মহাকাল মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজা রুপোয় মোড়া।ভিতরে ব্রহ্মা-বিষ্ণু গনেশ, নন্দীর সাদা পাথরের ছোট ছোট মূর্তি রয়েছে। গর্ভমন্দিরের ঠিক মাঝখানে একটু পিঙ্গল বর্ণের মহাকালেশ্বর অনাদি জ্যোতির্লিঙ্গ। পিতল আর রূপোয় বাঁধানো, গৌরীপট্ট-এর মধ্যেই অবস্থান করছেন প্রায় আড়াই ফুট উঁচু মহাকাল মহাদেব। মহাকালেশ্বরের মূর্তিটি দক্ষিণমুখী অর্থাৎ যার মুখ দক্ষিণ দিকে। এই মূর্তিটির বিশেষত্ব হলো ‘তান্ত্রিক শিবনেত্র’ প্রথাটি কেবলমাত্র দেখা যায় এই জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে।ভূগর্ভস্থ কক্ষের পথ পিতলের প্রদীপ দ্বারা আলোকিত, এটি মন্দিরের একটি স্বতন্ত্র প্রথা। মন্দিরের পাঁচটি তল আছে। মন্দিরের চূড়া শাস্ত্রে উল্লেখিত পবিত্র বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত।

বিশ্বপ্রেমিক মহাকাল দর্শন, স্পর্ষ, এমনকি আলিঙ্গনেও বাবার আপত্তি নেই। তীর্থযাত্রী আর ভক্ত জনের উদাত্ত কণ্ঠের ধ্বনিতে গর্ভ মন্দিরে আকাশ বাতাস অনুরণিত হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে.. “জয় বাবা মহাকালেশ্বর দেবজি কি জয়।”
এই মন্দিরের প্রসঙ্গ ফিরিস্তা নামে মুসলমান ইতিহাসে উল্লেখিত হয়েছে, ‘সোমনাথের সমতুল্য মহাকাল মন্দির’ বলে। মন্দিরের বড় সোনার স্তম্ভগুলি ছিল মনিমানিক্যখচিত। গর্ভ গৃহে সামান্য আলো জ্বালিয়ে দিলেই হীরের প্রতিফলনে উজ্জ্বল হয়ে উঠতো মন্দিরের অভ্যন্তর। ১২৩৫ খ্রিস্টাব্দে দাসবংশীয় সুলতান শাসুদ্দিন ইলতুৎমিস সমস্ত মনিমানিক্য লুণ্ঠন করে মন্দির চত্বর ধ্বংস করে। এর প্রায় পাঁচশো বছর পর পেশোয়ার দেওয়ান রামচন্দ্র বাপু পুরোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপর নির্মান করেন মহাকাল মন্দির। এই মন্দিরের সংস্কাররের নেপথ্যে বহু অবদান রযেছে রঞ্জি সিন্ধিয়ার। ভারতের স্বাধীনতার পর উজ্জয়িনী পৌরসংস্থা এই মন্দিরের ভার নেয়। বর্তমানে এটি একটি কালেক্টরয়েটের অধীনে রয়েছে।
মহাকালকে উজ্জয়িনীর রাজা মনে করা হয়। প্রচলিত এক কাহিনী অনুযায়ী, উজ্জয়িনীরতে এক রাজা রাত কাটানোর ফলে তার সমস্ত রাজত্ব হাতছাড়া হয়ে যায়।

সেই থেকেই মহাকালের নগরীতে কোন রাজার রাত কাটানোর আদেশ ছিল না। মহাকালের শরণে থাকার জন্য সিন্ধিয়া রাজবংশ নিজেদের জন্য কালীদেহ নামে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। উজ্জয়িনী এলে এই প্রসাদেই বাস করতেন সিন্ধিয়া বংশের সদস্যরা। তবে রাত কাটানোর নিষেধাজ্ঞা আজও পালিত হয়ে আছে।
মহাকালেশ্বর মন্দির করিডর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম পর্বে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শিবের আনন্দ তাণ্ডব রূপের একশো আটটি কারুকাজ করা স্তম্ভ, শক্তির দুশোটি মূর্তি ও ম্যুরাল রয়েছে। মূল ফটক থেকে মন্দিরের মাঝে রয়েছে ৯৩ টি শিবের মূর্তি। মন্দিরের বাইরে পুজোর উপাচার, খাবারের দোকান ইত্যাদি আছে।
শিব পুরাণ মতে ভস্ম সৃষ্টির সার। শিব সর্বদা সৃষ্টির সারকে ধারন করেন নিজ অঙ্গে। মহাকাল মন্দিরে সকাল-সন্ধ্যে মন্ত্রোচ্চারনে অনুষ্ঠিত হয় ভস্ম আরতি। আরতি দেখার জন্য লম্বা লাইন পড়ে ভক্তদের। মন্দিরে শিবের ভস্ম আরতী করা হয় ঘুটে, শমী, অশ্বত্থ, পলাশ, বড়, অমলতাস ও কুল গাছের কাঠ একসঙ্গে পুড়িয়ে।

মহাকাল মন্দিরের কাছেই হরসিদ্ধি মাতার মন্দির। এই মন্দিরের সামনে রুদ্রসাগর নামে এক বৃহৎ সরোবর ছিলো। কিংবদন্তি বলে, এখানে স্বর্ণকমল ফুটতো। স্বর্ণকমল অর্থে সোনার কমল নয়, পদ্মের বর্ণ সোনার মতো।
রুদ্রসাগর শুকিয়ে এখন চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে। হরসিদ্ধি মাতা হলেন ৫১ পীঠের অন্তর্ভুক্ত এক দেবী। এখানে দেবীর বাম কপোল পড়েছিলো। ইনি বিক্রমাদিত্যের আরাধ্যা দেবী। হরসিদ্ধি মাতার মন্দিরে এক অখণ্ড জ্যোতি সুপ্রাচীন কাল থেকে এখনো জ্বলছে। হরসিদ্ধি তান্ত্রিকদের সিদ্ধপীঠ।
উজ্জয়িনী থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বেই অবস্থিত কালিদাসের সাধণভূমি। তার আরাধিত কালী এখানে গড়কালি নামে প্রসিদ্ধ। কথিত আছে, লঙ্কা থেকে অযোধ্যা যাওয়ার সময় ভগবান শ্রীরামচন্দ্র লক্ষণ ও জানকী সহ অবন্তী রাজ্যে এলে এই দেবীর আরাধনা করেন।
ষোড়শ শতকে দক্ষিণের নানা তীর্থ পর্যটন করে আচার্য বল্লভ উপস্থিত হলেন উজ্জয়িনী নগরে। এখানে মহাকাল দর্শন ও পুণ্যতোয়া শিপ্রা তটে কিছুকাল অবস্থান করে তিনি প্রচার করেন নিজস্ব মতবাদ, ভক্তিবাদ। তাই তাঁর ভক্ত সম্প্রদায়ের কাছে উজ্জয়িনী যেমন ‘বল্লভ বৈঠক’ নামে পরিচিত তেমনি তাদের চোখে এই শান্তি পরম পবিত্র, দর্শনীয় বটে।
পূণ্যভূমি ভারতবর্ষের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গর কাহিনী ভক্তের ভক্তিরস বৃদ্ধি করবে।
ইতিহাস ও সম্পূর্ণ বিবরন বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা আপনার অসীম জ্ঞানে পরিচয়
সবার ভালো লাগবে। সত্যম শিবম সুন্দরম*
আপনার মতামত আমাকে ঋদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে। ধন্যবাদ।