“আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী জোছনার জন্য বসে আছি।
কাল রাতেই গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নার মায়া আচ্ছন্ন করেছে।
যে জ্যোৎস্না দেখামাত্র গৃহের সমস্ত দরজা খুলে যাবে…
ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে বিস্তৃত প্রান্তর।
প্রান্তরে হাঁটব হাঁটব আর হাঁটব…
পূর্ণিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে।
চারদিক থেকে বিবিধ কন্ঠ ডাকবে ― আয় আয় আয়।”

সে আহ্বানের মায়ায় কোন্ডিভিটা গ্রামের সাধারণ নরনারী দলে দলে চলেছেন বৌদ্ধবিহারে। সকাল সকাল স্নান সেরে, শুভ্রশুচিবস্ত্র পরে। আজ যে ভগবান তথাগতর আবির্ভাব, বোধিলাভ আর মহাপরিনির্বাণের দিন!
সারিবাঁধা, সুশৃংখল ভক্তদের কারো হাতে বুদ্ধের প্রিয় শ্বেতপদ্ম। কেউ করপুটে ধরে আছেন নীল শালুক ফুল। কেউ ভগবানকে নিবেদন করবেন গাছের আম। কেউ কপিলাগাইয়ের ঘনদুধ দিয়ে রেঁধেছেন পরমান্ন। কারোর হাতে মধুভান্ড। ঐ যে দরিদ্র, নুব্জ মানুষটি চলেছেন সবথেকে ধীরে, তাঁর হাতে একটি মাটির কলসীতে শুধুই জল। তিনি জানেন প্রসন্নচিত্তে, স্মিত হেসে ভগবান নিশ্চয়ই সেটি গ্রহণ করবেন।

কতদূর থেকে শোনা যাচ্ছে ঢোলের দ্রিমি দ্রিমি আওয়াজ। পাহাড়ে পাহাড়ে ধ্বনিত হচ্ছে সে ভাবমন্দ্র ধ্বনি। সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ, — ‘নমো তসস ভগবতো অরহতো সম্মা সম্বুদ্ধসস’।
বিহারের শ্রমণরা আজ অতি প্রত্যুষে তাঁদের মন্দিরকে ফুল ও অন্যান্য সাজসজ্জা দিয়ে সাজিয়েছেন। বিহারের প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে, চৈত্যের কোণায় কোণায় জ্বলে উঠেছে মঙ্গলদীপ। আজ ভেসাক উদযাপনের দিন। ভিক্ষুরা তথাগতর নাম গাইতে গাইতে রঙিন পতাকা দিয়ে সাজাবেন গোটা বিহার-চৈত্যকে। এই পতাকা উত্তোলনের জন্য ভোরের আগেই একত্রিত হয়েছেন কত ভক্ত! আজকের এই পবিত্রতম দিনে চৈত্যে শ্রমণদের সঙ্গে সাধারণ বৌদ্ধভক্তরা পঞ্চশীল, অষ্টশীল, সূত্রপাঠ, সূত্রশ্রবণ, সমবেত প্রার্থনা করবেন।

চৈত্যের দক্ষিণ প্রাচীরে গতকালই ভিক্ষু প্রজ্ঞামিত্র তাঁর সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে কঠিন পাথর কুঁদে পদ্মপাণির একটি বৃহৎ মূর্তি সম্পন্ন করেছেন। পাশে বৌদ্ধজীবনের নানা ঘটনাল্লেখ। দীর্ঘ ছ-মাসের কঠিন পরিশ্রমলব্ধ এ সৃষ্টি।
সে অদ্ভুত ভাস্কর্য দেখে সবাই ধন্য ধন্য করছেন। প্রজ্ঞামিত্র লাজুক মানুষ। কাষায় চীবর পরা ভিক্ষুদের ভীড়ে তিনি যে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছেন কে জানে!

দু-হাজার বছর আগে আজকের দিনে মুম্বাইয়ের আন্ধেরী ইস্টের কোন্ডভিটা বৌদ্ধগুহায় এমনটা কল্পনা করা যেতেই পারে। মহারাষ্ট্রের ইতিহাস অতি প্রাচীন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এর নাম এসেছে মহাকান্তারের অপভ্রংশ থেকে। অশোকের শিলালিপি মহারাষ্ট্রকে উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রিক হিসেবে।
পাহাড়ের কঠিন ব্যাসল্ট শিলার এই ঊনিশটি বৌদ্ধগুহা কোন্ডভিটা নামে পরিচিত।

মহাকালি গুহা তার অন্য নাম।এখন অনেকটাই ভগ্নস্তূপে পরিণত। একসময় কোন্ডভিটা গ্রামের নামেই তার পরিচয় ছিল। বহুকাল আগে বৌদ্ধ শ্রমণরা এখানে প্রতিমোক্ষ পালন করে তথাগতের সাধনভজন অর্চনা করতেন। গুহাগুলির মাঝে একটি চৈত্য বা উপাসনা গৃহ আছে। উপাসনা গৃহের মধ্যস্থলে আছে একটি স্তূপ। চৈত্যের দেওয়ালে পদ্মপাণির মূর্তি, জাতকের কাহিনী খোদিত। শিলালেখতে রয়েছে বুদ্ধের উপদেশ। পেয়জলের সুচারু ব্যবস্থা স্পষ্ট দেখা যায়। হয়তো রাজানুগ্রহে, ধনী ভক্তদের কৃপায় ভিক্ষুরা দিনযাপন করতেন এখানে। পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে সত্য আর শান্তির পথের দিকনির্দেশ করতেন। দৈনন্দিন ধর্মাচরণের উপদেশ দিতেন।

না, অজন্তা বা এলিফ্যান্টা গুহার মত সৌন্দর্য, মহিমা, খ্যাতি কিছুই কোন্ডভিটা গুহার নেই। এক মেঘলা দিনে সেখানে গিয়ে দেখি শান্ত পাহাড়ের গুহার উল্টো দিকে ছুটে চলেছে ব্যস্ত শহর। আকাশকে স্পর্ধা দেখাচ্ছে গগনচুম্বী অট্টালিকা। অশ্বত্থ, সোনাঝুরি, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়ার ছায়ায় স্নিগ্ধ হয়ে আছে কোন্ডভিটার ভগ্ন ইতিহাস। কোকিল, দোয়েল, মৌটুসি, চড়াই, ছাতারে পাখির কলরবে মুখর প্রাচীন পবিত্র ভূমি।
দিদি, অপূর্ব সুন্দর হয়েছে লেখা ও ছবি দুটোই।
ভালোবাসা রীণা। শুভ রাত্রি
বড়ই নিমগ্ন এক লেখা!
তোমার লেখা পড়ি, শিখবো কতকিছু .. এই ভেবেই .. এই লোভেই ..
যা দেখি,যা মনে আসে লিখে ফেলি । তোমাদের ভালো লাগলে উপরি পাওনা।