মানুষ হিসেবে মহানায়ক উত্তমকুমার বিরাট বড় মনের অধিকারী ছিলেন। তাঁর জীবনের সেই অংশ নিয়ে খুব লেখালেখি বোধহয় আমাদের চোখে পড়ে না! তার নেপথ্যে নিশ্চয়ই কোন কারণ ছিল মনে হয়।
উত্তমকুমার বাঙালির হার্টথ্রব অভিনেতা। তার জীবন ছিল সংগ্রামী। সংগ্রামী জীবন থেকে উত্তরণের সরণীতে উঠতে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। সামান্য কেরাণীর চাকরী থেকে অভিনয় প্রতিভা ও নায়কোচিত চেহারার কারণে এক সময় সিনেমা-থিয়েটারের মহানায়কের আসন লাভ করেন অনেক টানাপোড়েনের মাঝ দিয়ে। আমরা তার অভিনয়ের প্রতিভাকে দেখেছি, কিন্তু তার দয়ালু হৃদয়ের কথা দেখার চেষ্টা করিনি।
দানশীলতা উত্তমকুমারের জীবনের একটা বড় দিক ছিল৷ তিনি আত্মপ্রচার না করে গোপনে কত দান করেছেন সেই হিসেব যদি কারও কাছে থাকত তাঁর নামের পাশে অনায়াসে ‘দানবীর’ বিশেষণ জুড়ে দেওয়া যেত বলে উত্তমকুমারকে খুব কাছ থেকে দেখা একদা আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকার চিফ সাব এডিটর রবি বসু লিখেছেন তাঁর ‘সাতরঙ’ বইয়ের পাতায়৷
গরিব ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়ার সময় আর্থিক সঙ্কটে পড়ে মহানায়ক উত্তমকুমারের শরণাপন্ন হলে তিনি কখনও ফিরিয়ে দিতেন না, তবে সবটাই ছিল ভীষণ গোপনীয়।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উত্তমকুমার বেশি দূর এগোতে পারেন নি বলে তাঁর জীবনে বেশ বড় মাপের একটা আক্ষেপ ছিল৷ হয়ত সেই কারণে তিনি ঠিক করেছিলেন কখনো কোনও ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়ার সময় আর্থিক সঙ্কটে পড়ে যদি তাঁর শরণাপন্ন হয় তবে তিনি তাদের বিমুখ করবেন না৷ তবে সবটাই ছিল ভীষণ গোপনীয়, দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের আর্থিক সাহায্যের বিষয়টা নিজে হাতে সামলাতেন উত্তমকুমারের প্রবল বিশ্বস্ত সুনীল চৌধুরী৷
ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে উত্তমকুমারের প্রাথমিক শর্ত ছিল যেন কোনওভাবে তাঁর নাম প্রকাশ না হয়, এই বিষয়ে তিনি ছিলেন প্রবল সচেতন৷
দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে নগদ টাকা দিতেন না মহানায়কের কাছে পৌঁছে যেত তাদের বুকলিস্ট, বই কিনে নিজের লোক দিয়ে তাদের কাছে বইগুলি পাঠিয়ে দিতেন৷ অবশ্য সেই সাহায্য পেতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের একটা চিঠির দরকার হত৷
কিন্তু সেবার এক ব্যতিক্রমী ঘটনা উত্তমকুমারের হৃদয়কে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল৷ মেদিনীপুর থেকে ক্লাস সেভেনের একটি ছাত্র এসেছে উত্তমকুমারের ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে, বই কেনার টাকা নেই, তাঁর কাছে আবার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চিঠিও নেই৷ সব শুনে সুনীল চৌধুরী বললেন —হেড মাস্টারের চিঠি ছাড়া তো সাহায্য দেওয়া যাবে না, তুমি তাঁর চিঠি নিয়ে এসো৷
ছেলেটি বলল সে মেদিনীপুর জেলার একটা গ্রামে থাকে, তাঁরা খুব গরিব, আর একবার গাড়ি ভাড়া করে আবার আসার মত টাকা তাঁর কাছে নেই৷ এইসব কথা উত্তমকুমারের কানে যাচ্ছিল, তখন তিনি বললেন সুনুদা ছেলেটিকে ভেতরে আসতে বলতো৷ উত্তমকুমার যে বিরাট মাপের অভিনেতা সেটা ছেলেটি জানত৷
কিছুটা ভয়ে-ভয়ে সে উত্তমকুমারের সামনে এল৷ উত্তমকুমার ছেলেটির কাছে জানতে চাইলেন— তুমি তোমার মায়ের কাছ থেকে গাড়িভাড়া চেয়ে এনেছো বলছিলে৷ তোমার বাবা কোথায়?
ছেলেটি বলল, আছেন তবে তাদের সঙ্গে থাকেন না৷
তিনি কোথায় থাকেন জানতে চাইলে ছেলেটি মহানায়ককে বলল, তিনি আর একজন মাকে বিয়ে করেছেন, আর তাঁর মা বাবার কাছে তাঁকে যেতে দেবেন না৷ তাদের সংসার কিভাবে চলে উত্তমকুমারের এই প্রশ্নের জবাবে ছেলেটি বলল মা অন্য লোকের বাড়ি ধান সেদ্ধ করেন, ধান ভেনে দেন৷ উত্তমকুমার আবার ছেলেটির কাছে জানতে চাইলেন তোমার স্কুলের মাইনে কে দেয়?
ছেলেটি বলল তাঁর স্কুলে মাইনে লাগে না, কারন সে প্রতিবছর প্রথম হয়৷ ছেলেটি আরও বলল আগে মা সবার থেকে চেয়ে বই কিনে দিতেন, কিন্তু এবার ক্লাস সেভেন, বইয়ের দাম অনেকটা বেশি, সেজন্য তাঁর গাঁয়ের ভূষণকাকা কাকা বলেছেন উত্তমকুমারের কাছে যেতে৷
উত্তমকুমার আবার ছেলেটির কাছে জানতে চাইলেন সে তাঁর ঠিকানা কিভাবে পেলো? জবাবে ছেলেটি বলল আপনার ঠিকানা তো সকলেই জানে৷
এসব শুনে উত্তমকুমারের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি কেমন বদলে গেলো, তাঁর চোখ দুটো ছলছল করছে৷ তিনি ছেলেটিকে বসতে বলে ভিতরে গেলেন৷ মিনিট দশেক পর চোখে-মুখে জল দিয়ে তিনি একটি খাম ছেলেটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন এতে টাকা আছে, সাবধানে নিয়ে যেও৷ তোমার মায়ের হাতে দিয়ে বলবে বই কিনে দিতে৷ তোমাকে আর হেড মাস্টারমশাইয়ের চিঠি আনতে হবে না, পরের বছর পাশ করার পর দেখা করে যেও৷
সাংবাদিক রবি বসু তাঁর ‘সাতরঙ’ বইয়ে এই কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন, তিনি লিখেছেন ‘ছেলেটিকে তিনি কত টাকা দিলেন তা আমি বলতে পারব না৷ তবে খামটির হৃষ্টপুষ্ট চেহারা দেখে আন্দাজ করতে পারি যে অন্তত হাজার টাকা তো হবেই’৷ পাঠক একটু অনুধাবন করুন বুঝতে পারবেন সেই সময়ের হাজার টাকা আজকের দিনে কত টাকা হতে পারে পারে৷বাকিটা আপনারা বিচার করুন৷
অভিনেতা উত্তমকুমার কত বড় মনের মানুষ ছিলেন তাঁর জীবনের এই মহৎ দিকটা কেন জানিনা তেমন ভাবে কোথাও আলোচনা হয় না! নাকি আমাদের চোখে পড়ে না!
তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা : সাতরঙ, রবি বসু
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক। লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।