প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ষড়যন্ত্র করে সত্তর বছরের এক বৃদ্ধকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে ছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। ষড়যন্ত্রের বলি হওয়া সেই বৃদ্ধের নাম মহারাজ নন্দকুমার। আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে আজকের দিনে ১৭৭৫ সালের ৫আগষ্ট কলকাতার খিদিরপুরের কাছে প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েক হাজার সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে মহারাজ নন্দকুমারকে ফাঁসি দিয়ে পরাধীন ভারতে সর্বপ্রথম ফাঁসি দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ব্রিটিশ প্রশাসন। বহু ঐতিহাসিকদের মতে, মহারাজ নন্দকুমারকে ষড়যন্ত্র করে জালিয়াতির মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছিল। নন্দকুমারের ফাঁসিকে বহু ঐতিহাসিক ‘আইনি হত্যা’ বলেও উল্লেখ করে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ও তৎকালীন বিচারপতি এলিজা ইম্পেকে সংঘটিত ‘আইনি হত্যার’ অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী বলে উল্লেখ করেছেন। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে মীর জাফরের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুনজরে পড়ে ক্ষমতার উচ্চ শিখরে উঠে আসা নন্দকুমারকে শেষমেষ ষড়যন্ত্রেরই শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছিল। কী ট্র্যাজিক পরিণতি।

১৭০৫ সালে বর্তমান বীরভূম জেলার নলহাটি থানার ভদ্রপুর গ্রামে মহারাজ নন্দকুমার এক ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নন্দকুমারের বাবা পদ্মনাভ রায় নবাব আলিবর্দি খাঁ’র আমলে তিনটি পরগনার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন। বাবার কাছ থেকে রাজস্ব সংক্রান্ত কাজ শিখে নন্দকুমারও রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। বাংলার নবাব মীরজাফরের আমলে মীরজাফর নন্দকুমারকে মহিষাদল পরগনার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে নন্দকুমারকে ‘মহারাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন দিল্লির মোঘল সম্রাট শাহ আলম। পলাশীর যুদ্ধের পর বর্ধমান, নদীয়া এবং হুগলির রাজস্ব আদায়ের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহারাজ নন্দকুমারকে ১৭৬৫ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসের স্থলাভিষিক্ত করে বর্ধমান,নদীয়া এবং হুগলির দেওয়ান নিযুক্ত করে।

১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর-জেনারেল হয়ে এলে নন্দকুমার তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। এই দুর্নীতির অভিযোগটিকে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস- সহ বাংলার সুপ্রিম কাউন্সিলের বহু সদস্য সমর্থন করেন। তবে হেস্টিংস কাউন্সিলের আনীত সমস্ত অভিযোগ নাকচ করে দেন। এরপর ১৭৭৪ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন ।ঔপনিবেশিক ভারতের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পের অধীনে তার মামলা চলে। এলিজা ইম্পে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের বাল্যবন্ধু। মামলায় নন্দকুমার দোষী সাব্যস্ত হলে ১৭৭৫ সালের ৫ই আগস্ট কলকাতায় তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।পরবর্তীকালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পে-সহ হেস্টিংকে ‘আইনি হত্যা’-র অপরাধে অভিযুক্ত করে বুর্ক এবং পরে মেকলে নামে দুই পার্লামেন্ট সদস্য তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুললেও এই মামলার তদারকিতে থাকা স্যার জেমস স্টিফেন অভিযুক্ত হেস্টিংসের পক্ষেই সওয়াল করে বলেন যে, “বিচারপতি এলিজা ইম্পে ন্যায় ও সততার সাথেই মামলাটির নিষ্পত্তি করেছেন।”

ইতিহাস গবেষকদের মতে, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর দিল্লির সিংহাসনে বসে সমগ্র বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা দখল করে নিজের অধিকারে আনেন। আকবরের সময়েই জমিদারি প্রথা চালু হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে তমলুকের জমিদারির মধ্যে তমলুক পরগনার অন্তর্গত ছিল বাসুদেবপুর এলাকা। ১৭৪০ সাল নাগাদ তাম্রলিপ্ত বা তমলুকের রাজা ছিলেন নরনারায়ণ রায়। নরনারায়ণের মৃত্যুর পরেই তাম্রলিপ্ত রাজপরিবারে পারিবারিক বিবাদ শুরু হয়। পারিবারিক বিবাদের জেরে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবারে তাম্রলিপ্তের রাজার কয়েক বছরের খাজনা বকেয়া পড়ে থাকায় মুর্শিদাবাদের নবাব ১৭৫৭ সালে তমলুকের জমিদারির দায়িত্বভার দিদার আলি বেগকে দেন। দিদার আলি বেগ তমলুকের জমিদারির ভার নেওয়ার ফলে তমলুকের রাজবংশ সাবেকি রাজবাড়ি ছেড়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি গড়ে আশ্রয় নেন। দিদার আলি বেগ ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৭ সাল পর্যন্ত টানা দশ বছর তমলুকের জমিদারি পরিচালনা করেছিলেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের পরে মীর জাফর বাংলার নবাব হন। ১৭৬৫ সালে ইংরেজ কোম্পানী বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানি ভার পায়। এ সময় বাংলার শাসন কর্তা হয়ে এসেছিলেন লর্ড ক্লাইভ। তমলুক রাজ পরিবারের সেই দুঃসময়ে রাজা নরনারায়ণের মহিষী রানি সন্তোষীপ্রিয়া, রাজা কৃপানারায়ণ রায়ের মহিষী কৃষ্ণপ্রিয়া যুক্তভাবে তাঁদের জমিদারি ফিরে পাওয়ার জন্য কোম্পানীর কাছে আবেদন জানালে তাঁদের এই কাজে তত্ত্বাবধানও করেছিলেন মহারাজ নন্দকুমার ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ। মহারাজা নন্দকুমার ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের প্রচেষ্টায় রাণী সন্তোষপ্রিয়া ও রাণী কৃষ্ণপ্রিয়া ফের তমলুকের জমিদারি ফিরে পান। নন্দকুমার ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের এই উপকারের পুরস্কার হিসেবে তমলুকের দুই রানি মহারাজা নন্দকুমারকে ছ’খানি ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহকে আটটি গ্রাম উপহার দেন। মহারাজা নন্দকুমার পান তালুক বাসুদেবপুর। এই বাসুদেবপুর তালুক ই আজকের পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমার ব্লক ও বিধানসভা কেন্দ্র। একসময় নন্দকুমার ব্লক নরঘাট বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ২০১১ সাল থেকে নন্দকুমার নামেই বিধানসভা কেন্দ্র হয়েছে। নরঘাট বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক ও অধ্যাপক ব্রহ্মময় নন্দ বলেন,” মহারাজা নন্দকুমার এই বাসুদেবপুর তালুকের মধ্যে দু’টি শিব মন্দির তৈরি করা ছাড়াও একটি হাট যা এখন নন্দকুমার বাজার হিসেবে পরিচিত ও একটি দিঘিও খনন করিয়েছিলেন। যা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ‘দেওয়ান পুকুর’ নামে পরিচিত।” মহারাজা নন্দকুমার সেই সময় কাঁথিতেও একটি দিঘি খনন করেছিলেন। সুনীল কুমার ঘোষের ‘কাঁথি পুরাবৃত্ত’ বইতে জানা যায়, চাকলা হিজলির আমিন পদে নিযুক্ত থাকার সময় কাঁথির পানীয় জলের কষ্ট দুর করতে কুমারপুর মৌজায় একটি সুবৃহৎ জলাশয় খনন করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে যা ‘নন্দকুমার পুষ্করিণী’ হিসেবে পরিচিত।

নন্দকুমার হাট বা বর্তমান মহারাজা নন্দকুমার বাজার সংলগ্ন এলাকাতেই নন্দকুমারের নামে বাসুদেবপুর মহারাজা নন্দকুমার হাইস্কুল ও প্রাথমিক স্কুল। ২০০৭ সালে নন্দকুমারের নামে মহারাজা নন্দকুমার মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হওয়া ছাড়াও ২০০৩ সালে তমলুক-দিঘা রেলপথ প্রকল্পেরম ভারতীর রেল মহারাজা নন্দকুমারের নামে ‘নন্দকুমার রেল স্টেশন’ নামে একটি রেল স্টেশনের নামকরণ করে।

তাম্রলিপ্ত সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মিলনীর সম্পাদক সন্দীপ চক্রবর্তীর কথায়, মহারাজা নন্দকুমারের স্মৃতিতে মহারাজা নন্দকুমার বাজার ব্যবসায়ী সমিতির উদ্যোগে নন্দকুমার বাজারে মহারাজা নন্দকুমারের আবক্ষ মূর্তি বসানো ছাড়াও বাসুদেবপুর মহারাজা নন্দকুমার হাইস্কুলে ও নন্দকুমার ব্লক ও পঞ্চায়েত সমিতির অফিসের সামনে নন্দকুমারের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবছরের মতই পাঁচ ই আগস্ট মহারাজ নন্দকুমারের আড়াইশো তম প্রয়াণ দিবসে সন্দীপ চক্রবর্তী, প্রাক্তন বিধায়ক ব্রহ্মময় নন্দ, নন্দকুমার পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি সুকুমার বেরা, প্রাক্তন অঞ্চল প্রধান ভবেশ বর্মন, তাম্রলিপ্ত সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলনী ও নন্দকুমার বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যরা মহারাজ নন্দকুমারের মূর্তিতে ধূপ সহ পুষ্পার্ঘ, মাল্যদান ও মহারাজ নন্দকুমারের স্মৃতির প্রতি একমিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়েই বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের ট্র্যাজিক নায়ক মহারাজ নন্দকুমারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
????????????????