সর্বশেষ খবর পাওয়া যাচ্ছে, মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল ভগত সিংহ কোশিয়ারি বিধানসভা ডাকার হুকুম দিয়েছেন। সেই নির্দেশ অনুয়াযী বুধবার বিধানসভা অধিবেশন ডেকে বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে মহারাষ্ট্র বিধানসভা সচিবালয়। এ নিয়ে উঠেছে নানা সাংবিধানিক বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ছাড়াই কি রাজ্যপাল ডাকতে পারেন বিধানসভার অধিবেশন? এদিকে রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে দেশের শীর্ষ আদালতে মামলা শুরু হয়েছে বুধবার সন্ধেবেলাতেই।
মহারাষ্ট্রের নাটকটা বেশ কয়েকদিন ধরেই চলছে। মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে-র দল শিবসেনার বেশ কয়েকজন বিধায়ক দলের তথা সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে বিজেপি-র নেতৃত্বে সরকার গড়ার বায়না ধরেছেন, বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে রয়েছেন একনাথ শিন্দে। এঁরা নিজের রাজ্য ছেড়ে প্রথমে গুজরাট, পরে আসাম, এবং অতি সম্প্রতি সম্ভবত গোয়ার হোটেলে আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দফায় দফায় বিস্তর শলাপরামর্শের পরে ওই রাজ্যের বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফড়নবিশ রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেন ও সম্ভবত বিধানসভা ডাকার পরামর্শ দেন। দেশের শাসকদলের অনুগত বলে যাঁর বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠে, সেই রাজ্যপাল কোশিয়ারি এর পরেই বিধানসভা ভোট ডেকে সরকারের গরিষ্ঠতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন ও নির্দেশিকা জারি করেন। কিন্তু এই নির্দেশিকার কি সাংবিধানিক বৈধতা আছে?

রাজ্যপাল ও বিধানসভার অধিবেশন
সরকার যখন চলছে, ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত ছাড়া রাজ্যপাল বিধানসভার অধিবেশন ডাকতে বা চালু অধিবেশন বন্ধ করতে পারেন না। সংবিধানের ১৬৩ ধারা অনুযায়ী ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তই এক্ষেত্রে চূড়ান্ত। বর্তমান ক্ষেত্রে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের ক্যাবিনেট বিধানসভা ডাকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
আবার খেয়াল রাখতে হবে, যাতে পরপর দুটি অধিবেশনের মধ্যে ছ’মাসের বেশি ফাঁক না হয়। সাম্প্রতিক মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিগত বিধানসভা অধিবেশন শেষ হয়েছিল চলতি বছরে মার্চের ২৫ তারিখে। তাই ছ’মাসের বেশি ফাঁকের প্রশ্নও এখন উঠছে না।
মনে রাখা দরকার, এটা সরকার চলাকালীন বিধানসভার অধিবেশন ডাকা বা না ডাকার প্রশ্ন। একটা বেশ আকর্ষণীয় উদাহরণ আমাদের হাতের সামনেই রয়েছে। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় রাজ্য বিধানসভার অধিবেশন ডাকেন। অধিবেশনের দিনক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা ছিল, ৭ মার্চ রাত দু’টোয়। রাত দু’টোয় বিধানসভা ডাকার সিদ্ধান্তে সবাই প্রথমে হকচকিয়ে যান। পরে জানা যায়, রাজ্য ক্যাবিনেটে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বেলা দু’টোয় অধিবেশন হবে, কিন্তু ওই সিদ্ধান্ত টাইপ করার ভুলে ইংরেজি 2 pm-র বদলে 2 am লেখা হয়ে যায়। রাজ্যপালও রাত দু’টোয় বৈঠক ডেকে দেন। সাধারণত এ ধরনের টাইপের ভুল হলে তা নিয়ে ঢাক-ঢোল না বাজিয়ে রাজ্যপাল ও সরকার কথা বলে মিটিয়ে নেওয়াই রীতি। তবে ধনখড়বাবু সরকারকে একটু বেকায়দায় ফেলার সুযোগটি হাতছাড়া করেননি। ফলে সরকারকে আবার, নতুন করে 2 pm লিখে সিদ্ধান্ত করতে হয় ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে। তখন রাজ্যপালও আগের বিজ্ঞপ্তি পাল্টে একই তারিখে দুপুর দু’টোয় অধিবেশন ডাকেন। এই বিরল ঘটনাটির উল্লেখ করা হলো এই দৃষ্টান্ত দিতে যে, ক্যাবিনেট সিদ্ধান্তে ভুল থাকলে সেই ভুল মেনে চলাই রাজ্যপালের পক্ষে ঠিক কাজ। তাহলে কি ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত ছাড়া রাজ্যপালের হাত পুরোটাই বাধা? না, একটি ব্যতিক্রম আছে।

রাজ্যপালের বিশেষ ক্ষমতা
যদি রাজ্যপাল মনে করেন চলতি সরকার বিধানসভায় সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে, তখন তিনি বিধানসভার অধিবেশন ডাকতে পারেন। এক্ষেত্রে ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত দরকার হবে না।
এহেন অধিবেশনে সরকারের উপর অনাস্থা প্রস্তাব বা সরকারের আনা আস্থা প্রস্তাবে ভোটাভুটি হতে পারে। তবে রাজ্যপালের এমন সব সিদ্ধান্তই আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে।
বর্তমান অবস্থায় মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল ভগত সিংহ কোশিয়ারির অধিবেশন ডাকা কি ঠিক? প্রশ্ন উঠছে এ কারণে যে, শিবসেনার দলত্যাগী ১৫ জন বিধায়কের বিধায়ক-পদ আর নেই, সে রাজ্যের ডেপুটি স্পিকার দলত্যাগ-বিরোধী আইনে তাদের বরখাস্ত করেছেন। এই নিয়ে বিরোধ সংক্রান্ত মামলা সুপ্রিম কোর্টে রয়েছে, যার ফয়সালা হয়নি। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার একই ক্ষমতা ভোগ করেন, এবং দলত্যাগ-বিরোধী আইনে তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, যদিও আদালতে যাওয়া যাচ্ছে।

মহারাষ্ট্র — কে গরিষ্ঠ?
যদি দলত্যাগ বিরোধী আইনে ১৫ জনের বিধায়ক-পদ না থাকে? তখন ২৮৮ আসন-বিশিষ্ট বিধানসভার চেহারা কী দাঁড়ায়? মোট বিধায়ক সংখ্যা কমে হয় ২৭৩, অর্থাৎ ১৩৭-এ গরিষ্ঠতা হয়।
সরকারের অংশীদার কংগ্রেস ও এনসিপির মিলিত-ভাবে আছে ৯৭ জন বিধায়ক। সিপিআইএম, এআইএমআইএম প্রভৃতি দলের ৫ সদস্য রয়েছে। সরকার সমর্থক বিভিএ, এসপি, পিজেপি, পিডাবলুপিআই ও নির্দলদের হাতে আছে ১৬ টি আসন। তাই শিবসেনা ছাড়াই সরকারের সমর্থক থাকার কথা ১১৮ জন। শিবসেনার ৫৬ বিধায়কের মধ্যে ১৫ জন বিধায়ক-পদ হারালে থাকে ৪১ জন। এর মধ্যে ২০ জনও উদ্ধবের পক্ষে থাকলে সরকারে গরিষ্ঠতা থাকার কথা।
বোঝাই যাচ্ছে, উদ্ধব ঠাকরে সরকার গরিষ্ঠতা হারিয়েছে, সেটা বলার মতো যথেষ্ট তথ্য নেই। তাছাড়া যে ১৫ জনের বিধায়ক-পদ খারিজ করেছেন ডেপুটি স্পিকার, যে মামলা সুপ্রিম কোর্টে রয়েছে, তাঁরা কী করবেন? যে তথাকথিত ৩৯ জন শিবসেনা বিধায়ক দলত্যাগ করেছেন, তাঁরা কি রাজ্যপালকে উদ্ধবের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন? মনে হয় দেননি। বিধায়ক-পদ খারিজ হওয়া বিধায়করা ভোট দেবেন কি দেবেন না? অন্য দলত্যাগীরা কি ভোট দিতে পারবেন? উত্তর স্পষ্ট নয়। তাই, উদ্ধব সরকার গরিষ্ঠতা হারিয়েছে, সেটা কোশিয়ারি-সাহেব বুঝলেন কীভাবে? রাজ্যপালের হিসেবটা কী? জোর করে অনাস্থা প্রস্তাব আনলে তো দলত্যাগ বিরোধী সাংবিধানিক সংস্থানটাই গোদাবরী নদীতে ভাসিয়ে দিতে হয়!