এটা মানতেই হবে হিন্দুত্বের প্রশ্নে শিবসেনার অবস্থান বিজেপির তুলনায় অনেক দৃঢ়। এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের বহু কর্মীও বাল ঠাকরেকে তার কট্টর হিন্দুত্ববাদী অবস্থানের জন্য শ্রদ্ধা করতেন। সাধারণের মনে একটা বিশ্বাস আছে যে, বিজেপি ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা লোটার জন্য নরম হিন্দুত্বের কথা বলে। বাজপেয়ী-আদবানিদের আমলেই এর সূচনা। আসল হিন্দুত্ববাদী হলেন শিবসৈনিকরা। একটু প্রবীণ মানুষরা মনে করতে পারবেন কাশ্মীরে পন্ডিতদের হত্যা আটকাতে জনসঙ্ঘের ব্যর্থতা, স্বাধীনতা সংগ্রামে আর এস এসের বেইমানি এমন নানা বিষয় নিয়ে শিবসেনা আর এস এসের সমালোচনা করতো। বালা সাহেব নিজেই বহুবার স্পষ্ট জানিয়েছেন শিবসেনার হিন্দুত্ব হল প্রকৃত হিন্দুত্ব। বালা সাহেবের ভাষায় তার নাম বহুজনবাদী হিন্দুত্ব। তাঁর ঠাকুরদা সমাজ সংস্কারক প্রবোধাঙ্কর ঠাকরে ছিলেন তার প্রবক্তা। ক্ষমতার রাজনীতি এবং আদর্শ থেকে বিচ্যুতি অবশ্য শিবসেনাকে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরিয়ে এনেছে। তবুও আদর্শের প্রশ্নে তারা বিজেপির তুলনায় অনেক সৎ।
আজকের ভারতে বিশ্বাস নয়, ভোটের রাজনীতির পাটিগণিতের সঙ্গে হিন্দুত্বকে মেলানো হয়। বিজেপি এই অপকর্মটি করে। হিন্দুত্বের ধুয়া তুলে নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক সংহত করে তারা। ছড়ায় মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ। এ খেলায় হিন্দুত্বের রাজনীতি আরেক ভাগীদার শিবসেনাকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে বিজেপি। তারা এতদিন শিবসেনাকে সঙ্গে নিয়েছিল স্রেফ দল ভারী করার জন্য। এখন সেই প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাই তারা নিজেরাই হিন্দুত্বের রাজনীতির একক দাবিদার হয়ে উঠতে চায়।

বালা সাহেবের শূন্যস্থান কেউ পূরণ করতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর পর দল দুর্বল হয়েছে। বালা সাহেবের ছিল দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধবের তা নেই। তার আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা দলকে দুর্বল করেছে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়েছে বিজেপি। বালা সাহেবের আমলে শিবসেনার ছিল নানা ধরণের কর্মসূচি। তার দাপটে উত্তপ্ত হত মহারাষ্ট্র। উদ্ধব সে রাস্তায় না হেঁটে দল চালাচ্ছেন কর্পোরেট ধাঁচে। এখন দল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তা হয়ে উঠেছে এনসিপির ওপর নির্ভরশীল।
বিজেপির এখন আর শিবসেনাকে দরকার নেই। তাই উদ্ধবের গুরুত্ব কমেছে। বিজেপি দখল করতে চাইছে মহারাষ্ট্রের শিবসেনার হিন্দু ভোট ব্যাঙ্ক। নিজেদের হিন্দুত্বের রক্ষাকর্তা প্রমাণ করতে হলে এছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। একসময় বিজেপি-শিবসেনা নামটি একসঙ্গে উচ্চারিত হত। এখন তারা শিবসেনাকে বাদ দিতে চায়। তাই মহারাষ্ট্রের মসনদ থেকে শিবসেনাকে যেকোন উপায়ে সরাতে চায় তারা। এই খেলাটি বুঝতে শিবসেনার কিঞ্চিৎ দেরি হয়েছে।
শিবসেনা এ কথা একেবারেই বুঝতে পারেনি তা নয়। ২০১৪’র লোকসভা নির্বাচনের পরে তারা বুঝতে পারছিল নরেন্দ্র মোদি দ্রুত উঠে আসছেন এবং তিনিই ভাগ বসাবেন হিন্দু ভোটে। সঙ্গত কারণেই উদ্ধব কট্টর হিন্দুত্বের বদলে জোর দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের স্বার্থকে রক্ষা করার রাজনীতির ওপর। রাজনীতিগতভাবে এতে কোন ভুল নেই। একটা আঞ্চলিক দল তো তাই করবে। বিজেপি এতে নিজেদের বিপদ বুঝতে পেরে শিবসেনার হিন্দুত্বের রাজনীতির ভিতটা নড়বড়ে করে দিতে সক্রিয় হল। সঙ্গে পেল একনাথ শিন্ডের মত দলত্যাগীদের। হিন্দুত্বের বদলে উন্নয়নের রাজনীতি দিয়েই এর মোকাবিলা করতে হবে শিবসেনাকে। শুধু ধর্ম নয়, তাদের আরও মাটির কাছে, মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে।