| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রথযাত্রায় এই বঙ্গের দুই অবতার : কমলাকর পিপলাইয়ের তপস্যা ভূমি মাহেশ আজ মহাতীর্থ লিখেছেন প্রণবেশ চক্রবর্তী

Reporter
প্রণবেশ চক্রবর্তী / ১২৬৬ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১২ জুলাই, ২০২১

সাড়ে তিনশ বছরের ব্যবধানে এই বঙ্গে দুই অবতার পুরুষের আবির্ভাব। নবদ্বীপে আবির্ভূত হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। আর হুগলি জেলার কামারপুকুরে অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ। এই দু-জন অবতারের পবিত্র পাদস্পর্শে ধন্য স্থানগুলি আজ তীর্থভূমি রূপেই পূজিত।

তেমনই এক পবিত্র স্থান এই বঙ্গের জগন্নাথ ক্ষেত্র মাহেশ— যেখানে জগন্নাথ দর্শন করতে এসেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য এবং শ্রীরামকৃষ্ণ। কথায বলে, ‘গঙ্গার পশ্চিমকূল বারাণসী সমতুল।’ মাহেশও গঙ্গার পশ্চিমকূলে অবস্থিত এবং ‘মাহেশের রথ’ এই জনপদকে তীর্থে পরিণত করেছে। এই রথের কথা মনে হলেই মনে পড়ে যায় ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ‘রাধারাণী নামে এক বালিকা মাহেশে রথ দেখিতে গিয়াছিল।’ কয়েকশ বছর ধরে এরকম কত রাধারাণী মাহেশের রথ দেখতে এসেছিল, তার হিসেব মহাকালও দিতে অক্ষম। এই প্রতিবেদকও কিশোর বয়স থেকেই মাহেশের রথযাত্রার সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছিল নিজের আত্মগত তীর্থযাত্রার অখণ্ড সূত্র। কারণ, মাহেশে আছেন জগন্নাথ, ছিলেন তাঁর মা। তাই এখনও মাহেশ তাঁর কাছে স্মৃতির মণিকোঠায় এক বিরাট আকর্ষণ। মাহেশের জগন্নাথ মন্দির, জগন্নাথ ঘাট, জগন্নাথের মাসী বাড়ি, সদগোপ পাড়া লেন, বল্লভপুর— স্নানযাত্রার পর থেকেই সর্বত্র শুরু হয়ে যায় রথের আমেজ। স্নানযাত্রা এল মানেই রথ এসে গেল। নেহরু নগরের ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা।

এবার ফিরে তাকাই প্রায় ছ-শ বছর পিছনে, সেই অস্পষ্ট আলো-আঁধারিতে ঢাকা ইতিহাসের দিকে।

সংসার বিরাগী ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী মাহেশের গঙ্গাতীরে এক কুঠি বানিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের সাধন ক্ষেত্র। জঙ্গলে আকীর্ণ এবং নির্জন এই স্থানে কঠোর সাধনায় মগ্ন ছিলেন তিনি। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে প্রার্থনা জানাতেন, ‘জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।’

শোনা যায়, মাহেশে আসার আগে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী গিয়েছিলেন শ্রীক্ষেত্রে। নীলাচলে। তাঁর তীব্র বাসনা ছিল, একদিন দারুব্রহ্ম জগন্নাথকে নিজের হাতে ভোগ দেবেন। কিন্তু জগন্নাথের ওড়িয়া সেবকরা তাঁর এই মনোবাসনা পূর্ণ হতে দেননি। কারণ, এভাবে ভোগ দেওয়ার কোনও প্রথা পুরীর মন্দিরে সচল নয়। ব্যর্থমনোরথ ধ্রুবানন্দ তখন ঠিক করলেন, জগন্নাথের সেবা করার অধিকারই যখন পাওয়া গেল না, তখন এই জীবন রেখে আর কী লাভ? তিনি মন্দিরের অদূরেই অনাহারে প্রাণত্যাগ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সময়ে একদিন প্রভু জগন্নাথ তাঁর পরম ভক্তকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে বললেন, ‘তুমি মাহেশের গঙ্গাতীরে যাও, সেখানেই পাবে আমাকে।’ এসব ইতিবৃত্ত আজ কিংবদন্তী।

তাই সাধক ধ্রুবানন্দ মাহেশে গঙ্গাতীরের কুঠিতে বসে দিনরাত প্রার্থনা জানান, ‘কই, তোমার দর্শন তো পেলাম না প্রভু।’ শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘আন্তরিক হলে তিনি প্রার্থনা শুনবেনই শুনবেন।’ একদিন শুনলেনও। একদিন গভীর রাতে সেই নির্জন সাধন কুঠিতে ‘দারুব্রহ্ম’ রূপ ধরে দেখা দিলেন জগন্নাথ। প্রভু বললেন, ‘পাবে কাষ্ঠ তুমি, সুরধুনী নীরে কর গিয়া উত্তোলন। দারু কারুকর পাইবে সত্ত্বর যাহা হবে প্রয়োজন।’ তারপর এই ‘দারুব্রহ্ম’ রূপে এই মূর্তি তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করার আদেশ দিলেন প্রভু।

ওই সাধনার পরই একদিন প্রচণ্ড ঝড় জলের রাতে গঙ্গায় ভেসে এল তিন নিমকাঠ। ঠিক সময়ে পাওয়া গেল কাঠের উপযুক্ত মিস্ত্রিও। তৈরি হলেন জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম। তারপর নিজের পূর্ণকুটিরে ধ্রুবানন্দ প্রতিষ্ঠা করলেন সেই তিন বিগ্রহকে। অনেকের মুখেই শুনেছি, পুরী মন্দিরের জগন্নাথ বিগ্রহ প্রতি বারো বছর অন্তর নতুন করে তৈরি হয়। কিন্তু মাহেশের মন্দিরে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর তৈরি করা সেই বিগ্রহই আজ পর্যন্ত বিরাজ করছে। পরবর্তীকালে শেওড়াফুলির রাজা মনোহর রায় ধ্রুবানন্দের অবলুপ্ত সাধন পীঠে তৈরি করে দিলেন জগন্নাথ মন্দির। এটি বাংলা ১১৮০ সালের কথা। সেই মন্দিরও আজ অবলুপ্ত।

এতো গেল এক কাহিনী। এবার আমরা অন্য কাহিনীর কথা স্মরণ করতে পারি। মায়ের আদেশে চলেছেন নীলাচলের পথে। তাঁকে অনুসরণ করছেন দ্বাদশ ভক্ত। এই দ্বাদশ ভক্তের একজন হলেন কমলাকর পিপলাই— যাঁর বাড়ি ছিল মেদিনীপুর জেলার কাঁথির কাছেই খালিজুলি গ্রামে। জমিদার পরিবারের সন্তান তিনি।

এই যে দ্বাদশভক্ত, যাঁরা শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে নীলাচলের পথে অনুসরণ করেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককেই চলার পথে এক এক জায়গায় এক এক কাজের দায়িত্ব দিয়ে মহাপ্রভু শেষ পর্যন্ত একা একা নীলাচলে উপনীত হন। এই দ্বাদশ ভক্তই বৈষ্ণব সমাজে দ্বাদশ গোপাল নামে পূজিত এবং মহাপ্রভু যেখানে যে ভক্তকে পরিত্যাগ করেছিলেন, সেই স্থানকেই ভক্তরা ‘শ্রীপাঠ’ নামে অভিহিত করেন। মহাপ্রভু এই ভক্তদের বিয়ে করে সংসারী হওয়ারও নির্দেশ দিয়েছিলেন।

পুরীধামে যাওয়ার পথে ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য বৈদ্যবাটির গঙ্গায় পুণ্যস্নান করেন। যে স্থানে তিনি স্নান করেছিলেন, সেই স্থান আজ নিমাইতীর্থের ঘাট নামেই বিখ্যাত। তারপর এখান থেকে তিনি গেলেন মাহেশে ধ্রুবানন্দের আশ্রমে জগন্নাথ দর্শন করতে। তিনি যখন ধ্রুবানন্দের আশ্রমে যান তখন এই মহাতাপস ব্রহ্মচারী খুবই বৃদ্ধ এবং অসুস্থ। মহাপ্রভুর দর্শন পেয়ে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী যেন নবজীবন ফিরে পেলেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে জগন্নাথের সেবা পূজার একটা সুব্যবস্থা করে দিতে বিশেষ অনুরোধ জানান। মহাপ্রভু তখন দ্বাদশ গোপালের অন্যতম এবং পঞ্চম গোপাল নামে পরিচিত কমলাকর পিপলাই চক্রবর্তীকে আদেশ দেন শ্রীশ্রীজগন্নাথের সেবা-পূজার দায়িত্ব গ্রহণ করতে। ইনিই মাহেশের জগন্নাথ প্রভুর প্রথম সেবায়েত। জগন্নাথ মন্দিরের প্রস্তর ফলকে লেখা থেকে জানা যায়, তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন ১৪৫৫ শকাব্দে (বাংলা ৯৪০ সালে)। তাঁর তিরোভাব ঘটে ১৪৮৫ শকাব্দে (বাংলা ৯৭০ সালে)।

সেই থেকে শ্রীপাট মাহেশ কমলাকর পিপলাইকে ধারণ করে রেখেছে। মাহেশ থেকে মহাপ্রভু গেলেন পানিহাটি। কমলাকর রয়ে গেলেন মাহেশে।

শ্রীপাট মাহেশের রথযাত্রা উৎসব অতি প্রাচীন এবং সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। প্রকৃতপক্ষে এই রথযাত্রার প্রবর্তক কে, তা নিয়ে এখনও কিছু সংশয় আছে। কেউ কেউ বলেন, ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীই এই রথযাত্রার প্রবর্তন করেছিলেন, আর সেই জগন্নাথের রথযাত্রার প্রচলন করেছিলেন কমলাকর পিপলাই। সে যাই হোক, এই রথযাত্রার বয়স যে পাঁচশ বছরেরও বেশি, তা নিয়ে কারোর মনেই কোনও সংশয় নেই।

এবার ফিরে তাকাই সাড়ে তিনশ’ বছরের ব্যবধানে সংঘটিত আরেক পুণ্য কাহিনীর দিকে।

সেটা সম্ভবত বাংলা ১২৯০ সাল। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ। সেবার মাহেশে প্রতি বছরের মতোই মহা সমারোহে পালিত হচ্ছে রথযাত্রা উৎসব। উৎসব নয়, বলা ভালো মহোৎসব। সেদিন ছিল উল্টোরথ।

অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ ভোর থেকেই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে বসে শত কাজের মধ্যেও শ্রীশ্রীজগন্নাথ প্রভুর জন্য এক তীব্র ব্যাকুলতা নিজের অন্তরে অনুভব করছিলেন। ইতিমধ্যে ঠাকুরের বিশেষ ভক্ত সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের ভাই গিরীন্দ্রবাবু কোন্নগরের মনোমোহন মিত্রের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে। তাঁদের দেখেই শ্রীরামকৃষ্ণ যেন জগন্নাথ দর্শন, তথা রথযাত্রা দর্শনের জন্য আরও বেশি উদ্বেলিত হয়ে পড়লেন। কী এক তীব্র আকর্ষণ তাঁকে মাহেশের দিকে প্রতি মুহূর্তে আকৃষ্ট করে চলেছে। তখন দক্ষিণেশ্বর থেকে মাহেশে যেতে হত গঙ্গা দিয়ে।

তিনি গিরীন্দ্রবাবুকে পরম আদরে বললেন, ‘দেখ গো, আজ মাহেশের রথযাত্রা দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। একখানা নৌকা ভাড়া করো।’

শ্রীরামকৃষ্ণের আদেশ অনুসারে একটা ভাল নৌকা ভাড়া করা হল। তারপর জগন্নাথের নাম স্মরণ করে শ্রীরামকৃষ্ণ ভাইপো রামলাল সেবক লাটু (স্বামী অদ্ভুতানন্দ), মনমোহন, গিরীন্দ্র, গোলাপ মা, যজ্ঞেশ্বর, হরিপদ প্রমুখ ভক্তদের নিয়ে গিয়ে উঠলেন নৌকায়।

গঙ্গা দিয়ে নৌকা চলেছে মাহেশের দিকে। আর শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাবিষ্ট হয়ে ভক্তসঙ্গে বসে আছেন সেই নৌকায়।

এক সময নৌকা এসে ভিড়ল মাহেশের প্রাচীন জগন্নাথ ঘাটে। নৌকা থেকে অবতরণ করে ভক্তসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এলেন তাঁরই পরম ভক্ত বলরাম বসুর প্রপিতামহ কৃষ্ণরাম বসুর বাড়িতে। সেখানে তিনতলার উপর পরম সমাদরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল।

আরেক বিবরণ থেকে জানা যায়, (বিশ্ববাণী, আষাঢ় ১৩৯৭) যে, শ্রীরামকৃষ্ণ একবার বলরাম বসুর সঙ্গে মাহেশে এসে কৃষ্ণরাম বসুর ওই বাড়িতে উঠেছিলেন।

সে যাই হোক। দুপুরে সকলের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা করতে ভক্তিমতী গোলাপ মা হাত লাগালেন। তিনি মনের মতো করে খিচুড়ি রান্না করে শ্রীরামকৃষ্ণকে স্বয়ং ঈশ্বরজ্ঞানে সেবা করালেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ তখনই অসুস্থ, তাঁর গলায় ব্যথা। তাই গোলাপ মা যদিও পবিত্রচিত্তে সুন্দর করে ভোগ সাজিয়ে দিলেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ গ্রহণ করলেন নামমাত্র।

এরকম অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি কেন রথ দেখতে এলেন— তা নিয়ে ভক্তরাও চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে পড়লেন। খাওয়ার পর শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ নিভৃতে বিশ্রাম করলেন।

এদিকে দুপুর গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে। জগন্নাথ মন্দিরের সামনে জনাকীর্ণ পথে রথটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চারদিকে অসংখ্য ভক্ত সাগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন— কখন জগন্নাথ রথে আরোহন করবেন। কখনও কখনও অপেক্ষমান ভক্তরা অধৈর্য হয়ে পড়ছেন। ভক্তদের কণ্ঠে উচ্চারিত জগন্নাথের জয়ধ্বনি এবং নানাপ্রকার বাদ্যযন্ত্রের উচ্চনিনাদ— সব মিলিয়ে গোটা পরিবেশটা উন্মাদনায় আচ্ছন্ন। একটু পরেই সহস্র কণ্ঠের সম্মিলিত জয়ধ্বনির মধ্যে জগন্নাথ রথে আরোহন করলেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ কৃষ্ণরাম বসুর বাড়িতে বসে জগন্নাথ দর্শনের জন্য অধীর হয়ে উঠেছেন। এমন সময় দূর থেকে ভেসে এল জগন্নাথের জয়ধ্বনি এবং বাজনার শব্দ। ঘন ঘন ভেসে আসতে লাগল মন মাতানো হরিধ্বনি। শ্রীরামকৃষ্ণ ব্যাকুল ও চঞ্চল হয়ে উঠলেন। তাঁর হৃদয়ে প্রেমের বন্যাও যেন উথলে উঠল। আর ঘরে থাকতে নারাজ তিনি। একাই দৌড়ে গিয়ে সেই ভাবোন্মত্ত জনতার মধ্যে প্রবেশ করলেন।

তারপর?

তারপর রথের উপর স্থাপিত দারুব্রহ্ম জগন্নাথকে দর্শন করে তিনি এমনই ভাবাবিষ্ট হয়ে গেলেন যে, তখন তিনি পুরোপুরি বাহ্যজ্ঞানশূন্য। রথ দর্শন করে বা রথের রশি স্পর্শ করে যাঁরা পুনর্জন্ম এড়াতে সেখানে এসে দলে দলে ভিড় করেছিলেন, তাঁরা এবার রথ, রশি ও জগন্নাথকে ছেড়ে সচল জগন্নাথকে দর্শন করার জন্য ভিড় জমাতে লাগলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের জ্যোতির্ময় দেহ এবং ঈশ্বরীয় ভাব দেখে মহাভাগ্যবান গৌর প্রমুখ স্থানীয় গোয়ালারা হাতে হাত ধরে মণ্ডলাকারে দাঁড়িয়ে জনতার স্পর্শ থেকে শ্রীরামকৃষ্ণর দেহকে রক্ষা করতে লাগলেন।

আনন্দরূপ শ্রীরামকৃষ্ণ যেন স্বয়ং আনন্দ। জনতা তাঁর দিকে তাকিয়ে তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভাবাবিষ্ট। ইতিমধ্যে লাটু ও অন্যান্য সেবকরা সেখানে এসে পড়েছেন। তাঁরাও এসে শ্রীরামকৃষ্ণকে ঘিরে দাঁড়ালেন। ‘জগন্নাথ, জগবন্ধু তাঁহার আবেশ শ্রীরামকৃষ্ণ দেহে আশ্রিত— সেই অপূর্ব দর্শন আর কোথায় পাওয়া যাবে?’

সেবকরা সেই ভিড় থেকে মুক্ত করে তাঁকে কৃষ্ণরাম বসুর বাড়িতে নিয়ে যেতে চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু পথে ঘন ঘন ভাবের প্রবল / ঠাই ঠাই, শ্রী গোঁসাই অল অচল। তাই শেষ পর্যন্ত গোয়ালাদের সাহায্য নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে আনা হলো কৃষ্ণরাম বসুর বাড়িতে। সেখানে তাঁকে এনে শুইয়ে দেওয়া হল তুলসীতলায়।

আস্তে আস্তে তাঁর সমাধিভঙ্গ হল। এই ভাবের উপশম হতে পুরো দিনটাই কেটে গেল। তারপর এক সময় ভক্তসঙ্গে আবার নৌকোয় করে তিনি ফিরে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে।

শুধু একবারই নয়, শ্রীরামকৃষ্ণ এর আগেও কয়েকবার মাহেশে জগন্নাথ দর্শন, তথা রথযাত্রা দর্শন করতে এসেছিলেন, এমন ইঙ্গিত আমরা পাই অক্ষয় কুমার সেন রচিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথিতে।’ রামকৃষ্ণ পুঁথিতে বলা হয়েছে, ‘প্রতিবর্ষে শ্রীপ্রভুর প্রায় আগমন।’

মাহেশ আজ যথার্থই পবিত্র তীর্থ। ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর সাধনক্ষেত্র এই জনপদ, শ্রীশ্রীজগন্নাথের লীলাক্ষেত্র এই মাহেশ, কমলাকর পিপলাইয়ের তপস্যা ভূমি এই মাহেশ, ভগবান শ্রীচৈতন্যের পদধূলিতে ধন্য এই তীর্থক্ষেত্র এবং অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের লীলাভূমি এই জগন্নাথ ক্ষেত্র।

অতীত থেকে বর্তমানে এবং বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে এই রথযাত্রা— এই যাত্রার কোনও বিরাম নেই। যাত্রীদের অনন্ত স্রোতধারারও কোনও বিরতি নেই। তাই মাহেশ আজ মহাতীর্থ।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev