“ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো” ও “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে” জাতির জনক বাপুজির যে ডাকে একদিন সারা দেশের আসমুদ্র হিমাচল দেশের ও সারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ অহিংস স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংরেজ শাসনের কবল থেকে মাতৃভূমিকে উদ্ধার করেছিল। সেই মহান আন্দোলনের তিরাশিতম বর্ষ এবার। সারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ অহিংস আন্দোলনের বিরাশিটি বছর কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ভুলতে বসেছি সেই মহান আন্দোলনকে। স্বাধীনতা পেয়ে ভুলে গেছি আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অমর সংগ্রামীদের। বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে বিপ্লবতীর্থ কাঁথি মহকুমার কাঁথি থানার মহিষাগোট গ্রামের স্বদেশ প্রেমের গৌরবময় অধ্যায়ও। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে ব্রিটিশ পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে গুলি খেয়ে ছয় শহিদের রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছিল মহিষাগোট গ্রামেরই মাটি। অহিংস ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে কাঁথি থানার মহিষাগোট গ্রামের শহিদ হওয়ার ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের “বীরোচিত এবং গৌরবময় অধ্যায়” বলে উল্লেখ করেছিলেন স্বয়ং জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ৮৩ বছর কাটতে না কাটতে বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছে স্বদেশেপ্রেমের সেই গৌরবজ্জ্বোল ইতিহাসের ঘটনা। মহিষাগোট গ্রামের সেই বীরোচিত ঘটনাকে ভুলতে বসেছে মহিষাগোট এলাকার বর্তমান প্রজন্ম।

দেশের স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪৮সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে মহিষাগোটের ছয় শহিদের স্মৃতিতে একটি বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্যে অচিন্ত দাস জানা নামে এক বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি নিজস্ব কয়েক বিঘা জমি দান করাই শুধু নয়,মহিষাগোট শহিদ স্মৃতি বিদ্যামন্দির নামে একটি স্থাপন করে বিদ্যালয়ের একটি কক্ষও নিজস্ব টাকায় তৈরি করে নিজেও বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার কাজে যুক্ত হন। প্রথমে মাধ্যমিক পরে উচ্চ মাধ্যমিকে পরিনত হয়। মহিষাগোট শহিদ স্মৃতি বিদ্যামন্দিরে অচিন্ত্যবাবু নিজস্ব অর্থ ও উদ্যোগে প্রথম ঘর বা শ্রেণিকক্ষ তৈরি করে দিয়েছিলেন সেটাও আজকের ভগ্নদশা। কোন ক্লাস ই করা যায়না। ফলে ভগ্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে প্রথম শ্রেণি কক্ষটি। বিদ্যালয়ের সহ শিক্ষক কৌস্তুভকান্তি প্রধানের অভিযোগ , “অতীতের স্মৃতি বিজড়িত ভগ্ন শ্রেণিকক্ষটি মেরামত করার জন্য শিক্ষা দফতর থেকে বিভিন্ন দফতরে বহুবার আবেদন নিবেদন করেও কোন কাজ হয়নি। কৌস্তুভবাবুর আরও অভিযোগ, “যে কোন দিন যে কোন মুহূর্তে শ্রেণিকক্ষটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়লে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।” মহিষাগোট শহিদ স্মৃতি বিদ্যামন্দির আর মহিষাগোট গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসের একধারে আজ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের শহিদ স্মৃতি মঞ্চ নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতা লাভের পর রাজ্যের রাজ্যপাল কৈলাশনাথ কাটজু মহিষাগোট শহিদ স্মৃতিমঞ্চের আবরণ উন্মোচন করেছিলেন। আজও সেখানে কান পাতলে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাসের চুপ কথা জানান দেয় ১৯৪২ সালের সেই গৌরবজ্জ্বোল ঘটনার কথা। ‘৪২ সালের ৮ আগষ্ট মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ডাক দিলেন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের।

৯ আগষ্ট থেকে স্বাধীনতার মুক্তি পেতে সারা দেশের সঙ্গে উত্তাল হল অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলাও। কাঁথি মহকুমায় মাসাধিক কাল চলা সেই অহিংস আন্দোলনে কেঁপে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তি। আন্দোলন দমনে পুলিশ নির্বিচারে ধরপাকড় করা ছাড়াও অবাধ লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা চালাতে থাকে। ২০ সেপ্টেম্বর কাঁথি থানার পিছাবনিতে ব্রিটিশ পুলিশ কয়েকজন কংগ্রেস কর্মীকে সন্দেহের বশে গ্রেফতার করলে আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দেয়। স্থানীয় জনতা সমবেত হয়ে ধৃত কংগ্রেস কর্মীদের ছেড়ে দিতে পুলিশের উপর চাপ সৃষ্টি করলে পুলিশ ধৃতদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পুলিশ বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিলেও পুলিশ আবার ব্যাপক অত্যাচার চালাতে পারে আশঙ্কা করে জনসাধারণ কাঁথি মহকুমা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মহিষাগোটে কাঁথি-রামনগর রাস্তার উপর একটি বড় খাদ কাটে যাতে পুলিশের গাড়ি মহিষাগোট পার হয়ে গিয়ে ব্যাপক অত্যাচার চালাতে না পারে। পুলিশের অত্যাচারের হাত থেকে নিস্তার পাবে স্থানীয় জনসাধারণ। একদিন পার হতে না হতেই ২২সেপ্টেম্বর মহকুমা শাসক একদল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী নিয়ে এসে কাটা খাদ ভরাট করার জন্য স্থানীয় জনগনের উপর চাপ দিতে থাকেন।

স্থানীয় জনসাধারণ সম্মিলিত ভাবে পুলিশী অত্যাচার ও জবরদস্তি করে বিনা মজুরিতে কাজে বাধ্য করার প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। দু’পক্ষের বাক বিতন্ডার মধ্যেই মহকুমা শাসক লাঠিচার্জের নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। উপস্থিত নিরস্ত্র জনগনকে লক্ষ্য করে ৩৫ রাউন্ড গুলি চালায়। গুলিতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয় ও আহত হন চব্বিশ জন। আহতদের পা ধরে টানতে টানতে রাস্তায় এনে ট্রাকে তুলে কাঁথি হাসপাতালে পাঠায়। রাস্তায় দুজনের এবং হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়। পরে আরও একজন আহতের মৃত্যু হয়। মোট ছ’জন শহিদ হন। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রথম ছয় শহিদ হলেন কাঁথি থানার তাজপুর গ্রামের যামিনী কান্ত কামিলা, পাতাপুকুরিয়া গ্রামের অনন্ত কুমার পাত্র ,আদমবাড় গ্রামের কুঞ্জবিহারী শীট, বেলতলিয়া গ্রামের অনন্ত কুমার দাস ও রামনগর থানার দক্ষিণ শীতলা গ্রামের সর্বেশ্বর প্রামাণিক ও ঘোল গ্রামের রমাপ্রসাদ জানা। মহিষাগোটের ছয় শহিদ আর চব্বিশ জন আহতের রক্তধারা মেদিনীপুরের বুকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে গণ সংগ্রামের শপথ। মহিষাগোট গ্রামের এই ঘটনাকে মহাত্মা গান্ধী স্বয়ং স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘বীরোচিত’ ও ‘গৌরবময়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সময়ের আবর্তনে আজ মহিষাগোট গ্রামই ভুলে যেতে বসেছে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনে’ শহিদের রক্তে রাঙানো সেই বীরোচিত ও গৌরবময় অধ্যায়কে।

স্বাধীনতা পেয়ে ভুলে গেছি আমরা আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অমর সংগ্রামীদের। আমরা নাকি এগোচ্ছি? দেশ নাকি ডিজিটাল ইন্ডিয়া হয়ে উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। এ কেমন এগোনো? যেখানে আমরা ভুলে যাই নিজেদের গৌরবোজ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামের সোনালি ইতিহাসকে। সম্মান দিতে পারিনা জীবিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। ধিক্কার জানাতে ইচ্ছে করে নিজেদের মানসিকতাকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা ধার করে জাতির জনক বাপুজি আর দেশের মৃত্যুঞ্জয়ী স্বাধীনতা সেনানীদের প্রণাম জানিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে- তোমরা আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছো কিন্তু আদৌ দেশপ্রেম দিতে পেরেছো কি?
অসাধারণ তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।
সমৃদ্ধ হলাম।