| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মৈমনশাহী কথকতা

Reporter
অমর মিত্র / ৩৬৫ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২০

খবরিয়ার সব জানে সুধীন্দ্র। তাকে তো সে নিজেই সৃষ্টি করেছে। তাকে নিয়ে মৈমনসিং-য়ের গাঙ পাড়ে, পাহাড়তলিতে, গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরছে। খবর দেবে কে? বুড়ি চিকন গয়লানিকে নিয়ে ভাবতে বসল সে। সুধীন্দ্র নয়, বাণেশ্বর খবরিয়া। বাণেশ্বর বোঝে বুড়ো গণৎকারকে নিয়ে খেলা করতে গিয়ে সে বিপদ বাঁধিয়ে বসেছে। তার সমুখে গাঁয়ের মানুষ, ছেলে বুড়োরা। সাতকাল গিয়ে এককালে পৌছোনো বুড়িরা। তারা মেনে নেবে না। চিকন গয়লানি মেয়ে ফুসলোনোয় ওস্তাদ। ঘরের বউকে পযর্ন্ত ফুঁসলে বের করেছে। ছেলেপুলের মা সব ফেলে বিবাগী হয়েছে শয়তানের হাত ধরে। আহা, তালুকদারের কচি মেয়েটা সবে ভ্রমরের গুনগুন শুনেছে, বসন্ত এসে সবে তাকে ঘিরে ধরেছে, তার ওষ্ঠে এখনও না পড়েছে চুম্বন, তাকে কেউ না করেছে আলিঙ্গন। আর তাকেই কিনা ত্রিলোচন গণৎকার কামনা করল। ছিহ! কেচ্ছা ব্যতীত আর কিছু জানেও না খবরিয়া? আর কোনো খবর জগতে নাই? ভালো খবর?

উঁহু, খবর তো শেষ হয়নি। বাণেশ্বর মনে মনে বলে, বুড়ি গয়লানি গুয়া পান খয়ের চিবুতে চিবুতে, লম্বা লম্বা পানের পিক ফেলতে ফেলতে চলল তালুকদারের বাড়ি। তার ভিটে থেকে তালুকদারের বাড়ি অনেকটা কিন্তু নাক বরাবর। সোজা পথের কোনো বাঁক নেই। কেন নেই, না গয়লানি জানত দিনে-রাতে কত বার সে ওই বাড়ি  যাবে আসবে যাবে, রাতেও হবে গমনাগমন। এই তালুকদারের ঠাকুদ্দা তখন বুড়ো, সে তখন দশ এগারো। বুড়ো তাকে ছাড়ত না। আহা, কোলে বসিয়ে  কত আদর তার। সে বুড়ো মরতে তার বেটা, এই তালুকদারের বাপ রাতের সময় ডাকত। আর তার ঘরের কাজ মিটিয়ে অমানিশিতে ফিরবে কী করে সে? আবার পরের ঘরের মেয়েছেলে নিয়ে রাতের বেলা তালুকদারের ঘরে পৌঁছে দেবে কী করে? সুতরাং পথ সরল করা। সোজা হেঁটে গেলে তালুকদারের গৃহ। সোজা হেঁটে এলে তার ভিটে। ঘোর অমানিশিতেও অসুবিধে হবে না। অন্ধ নাচার মানুষও ঠিক পৌঁছে যাবে। কিন্তু এই কথা তো জানত না গণৎকার, সে বলল, এত ঘুরপথ, তুমার কষ্ট হবে, কিন্তুক মু খুশি করে দিবো।

বুড়ি গয়লানি চোখ বুঁজে চলে যেতে পারে তালুকদারের ভিটে। তার এই সোজা পথ নিয়ে কত ঘোঁট যে কত বার পেকেছে। রাস্তা বন্ধ করে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছে তালুকদারই কত বার। তার যৌবনকালে তালুকদার কত বার তাকে বলেছে, এইরকম সোজা পথে আসা ঠিক না। লোকে সন্দেহ করে। পথে লুকোনোর জায়গা নেই, এত সরল সেই পথ। তালুকদারের প্রয়োজন পড়লে রাত-বিরেতে তার ভিটেয় এসে তো ঢুকত। বাড়ি থেকে এই পথে আসা মানে গয়লানির ভিটে। পথে বাঁক থাকলে লুকোনো যায়। এ পথে তা হবার উপায় নাই।  গয়লানি বলত, সোজা পথে অন্ধকারে ফেরা যায়। সে মেয়েমানুষ, যত তাড়াতাড়ি নিজ ভিটেয় পৌছোতে পারে, মঙ্গল। পথ ঘুরোতে দেবে না সে। দেয়ওনি।

জমি সব তালুকদারের। গয়লানি দুধের পরিবর্তে তালুকদারের জমি ভোগ করে। কোরফা প্রজা, চাকরান স্বত্ব। নিজের যৌবনকালে সে সাত কেঁড়ে দুধ দিত তালুকদারের ঘরে, পরিবর্তে সাত বিঘে জমি। এখন আর পারে না অত গরু পুষতে, দুইতে। দুই কেঁড়ে দেয়, দুই বিঘে জমি ভোগ করে। পাঁচ বিঘে তালুকদার ফেরত নিয়ে কুমোর আর কামারের ঘরে দিয়েছে। আর নিজের গোয়ালে গরু পুষেছে। দাসীরা দুয়ে দেয়। গয়লানির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। যৌবন গেছে আর গয়লানিও গেছে। অনেক দিন বাদে একটা খরিদ্দার এলো। তালুকদারের মেয়েকে যদি ফুঁসলোতে পারে, তার নামযশ হবে আবার, ডাক আসবে বার বার। গেরস্তের সংসার ভেঙে সুখ আছে।

তার খুব চেনা। ঘরের পর ঘর, বাহির মহল, ভিতর মহল…সব। তখন অপরাহ্ন বেলার ছায়া লম্বা হয়ে হেথা-হোথা শুয়ে আছে। বাগানে ঝিরিঝিরি বাতাস। তালুকদারের ভাগ্যবন্তী মেয়ে কমলা পুষ্পবনে অনুশ্রী-তনুশ্রী দুই সই নিয়ে ঘুরছে আর নানা কল্পনায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। বড়ো বড়ো গণক আসছে। তারা গণনা করবে, বলবে তার কেমন বর হবে। যে বলবে সবচেয়ে ভালো, তার কথামতো কাজ হবে। একটি পুরুষের জন্য সে বড়োই আকুল। রেশমি কাপড়ের আঁচল গা থেকে বার বার খসে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। যেন কোনও অবাধ্য পুরুষের হাত বার বার আকর্ষণ করছে তাকে। আহা পুরুষ, পুরুষ! জোয়ান পুরুষের কথা মনে এলেই কেমন শিহরন জাগে। কোকিল ডাকছে, ভ্রমর উড়ছে। ফুলের গন্ধ বাতাসে ভাসছে। তার খোপায় বকুল ফুলের মালা, গন্ধ ভাসছে তার, বাতাসে নিমের ফুলের গন্ধ, আমের বৌলের গন্ধ, উদাসী ভাব, গভীর শীত গিয়ে চাদ্দিকে যৌবনের তাপ…। ও সই, সে কেমন হবে সে?

যেমন যাঁচিস তুই তেমনি পাবি। অনুশ্রী বলে।

মুই যে কিসুই যাঁচিনে সই বকুলফুল।

বকুলফুল তনুশ্রী বলল, কাল সকালে আবার বকুল ফুলের মালা গাঁথব তোর জন্য।

আবার সেই মালা জড়িয়ে নিবি খোপায়, বহুদূর থেকে রাজপুত্তুর গন্ধ পাবে।

রাজপুত্তুর, না গয়লানি। ওই যে চিকন গয়লানি আসছে। একেবারে রাক্ষসীর মতো রূপ হয়েছে তার। ফোকলা মুখে হাসছে। বলছে, ও মেয়ে, ঢলানি যৈবন এয়েসে তুর গায়, বকুল ফুলের বাস মুরে ঠিক বুঝাই দিলো তু কুথায় আচিস।

অনুশ্রী মনে মনে বলল, মর মর তু গয়লানি, বকুল গন্ধে তু এলি!

কমলাও খুব রেগে গেল গয়লানিকে দেখে, মরণ! কার আসার কথা কে এলো? এই গয়লানি বুড়ি, তোর এক কেঁড়ে দুধ জল দিয়ে দুই কেঁড়ে হয়, কী জল মিশাস তুই, দই পাতা যায় না, ক্ষীর হয় না, বাবাকে বলে তোর ব্যবস্থা নেব।

গয়লানি বলল, ও মেয়ে, এমন ঢলো ঢলো রূপ তোর, কেমন পয়োধর, নিতম্ব… দিকে দিকে সাড়া পড়ি গেসে, তু কেন এমন বলিস।

এমন যৈবন যার, মধুর ভুবন,

দিন রাত ঘুরাঘুরি, স্বপন হপন

আসে আর যায় শুধু, পুরুষে ঘুমে,

ঘুম ঘোরে কত বার হেথাহোথা চুমে।

রসের কথা, বসন্তের কথা, যৌবনের কথা, কিন্তু কমলার মনে হলো ফোকলা মুখের ওই থুতু ছিটানো কথায় কোনও সুগন্ধ নেই, ইন্দুর মরেছে কোথাও বুঝি। সে বলল, যা যা, মুর সমুখ থেকে যা, তুর দুধে গো-চোনা পড়ে, চোখের মাথা খেয়েচিস তুই।

গয়লানি মাটিতে বসে পড়ে, বিড়বিড় করে বলে, আগে তো দুই কেঁড়েতে সাত কেঁড়ে হতো, কেউ কিসু কইতোনি, এখন মুর যৈবন গেসে, এখন মুর সব খারাপ।

এখন বয়স গেসে গাঙ ভাটিয়াল,

পাকা টক হয়, এমনি জঞ্জাল।

বিড়বিড় করতে করতে চিকন গয়লানি কাঁদতে থাকে, বলে আর দুধের বেসাতি করব না, মু রওনা হবো কামিক্ষ্যা কামরূপ, তন্ত্র নিব মন্ত্র নিব, দেখিব কী রূপ।

তার কান্নায় আর কামিক্ষ্যার কথা, তন্ত্রমন্ত্রের কথা শুনে কমলা নরম হয়। তাকে এই চিকন গয়লানি এককালে কোলে নিয়ে ঘুরেছে কত। ঝিনুকে দুধ খাইয়েছে। তেল মাখিয়েছে, স্নান করিয়েছে। চোখে কাজল দিয়েছে। তাকে অমন করে না বললেই হতো। চিকনের দেওয়া দুধ তো তার বিড়ালে খায়। কমলার পোষা বিড়াল আছে দুটো। তাদের দুটোর আবার বাচ্চা হয়েছে চারটে চারটে করে। সেই সব বিড়ালের জন্য, দুই কেঁড়ে দুধ বরাদ্দ করেছে সে। চিকনের দুধ খায় কোন মানুষ? সে অনুতপ্ত হয়ে বলল, কাঁদে না গয়লানিদিদি, আমার ভুল হই গেসে।

জানিরে কমলা জানি, এমন যৈবনকাল, এমনি হয় ভুল, মুই কিছু মনে করিনি, পুরুষমানুষ পেলে তোর সব কষ্ট যাবে, শয্যার পিপিড়া যাবে, এসে গেসে মা সে এসে গেসে, কী তার যৈবন!

কী যে বলো তুমি, চিকনদিদি। আপ্লুত হয়ে বলল কমলা, বসো বাগানে বসো।

আর কী। সবুজ ঘাসে পাছা পেতে বসল বুড়ি। বসল কমলা, অনুশ্রী-তনুশ্রী। তবে তারা কয়েক হাত দূরে। মনে হয়েছে বুড়ি আর কমলার কথা আছে। হায় হায়, গয়লানিকে চেনে না সই!

চিকন বুড়ি বলে, হ্যাঁরে কমলা হ্যাঁ, সময়ে সব লাগে, পুরুষের সিটাও লাগে।

ইসস, কী বলো দিদি তুমি? লজ্জায় মুখ নিচু করল কমলা।

উৎসাহিত চিকন বুড়ি বলল,

বিক্ষের মূল যেমন তেমনি সিধে,

কুমারী কন্যারে সে আদরে বিঁধে

ও, মাগো, চিকনদিদি কী কহ? চাপা গলায় বলল কমলা।

ও, তাইলে আর কইবোনি, থাক বরং। চিকন বুড়ি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।

আহা, মুই তা কহিসি? কমলার দুই গালে রাঙা আভা দেখা দিয়েছে। সে আরও শুনতে চায়। চিকন বুড়ি বোঝে ওষুধে কাজ হচ্ছে। সে কমলার গাল টিপে দিয়ে বলল, সকালে বিসনা ছেড়ে উঠা যে কী কষ্ট হবে, হাঁটা দুষ্কর হবে।

ইসস, কী যে বলো তুমি?

গালে বুকে পেটে দাঁতের চিহ্ন, দাগ মিলাতে পুন্নিমে থেকে অমানিশি।

কী যে বলো তুমি!

থাক বরং। বুড়ি যেন রসের খেলা খেলতে থাকে তালুকদারের কন্যা নিয়ে।

কমলা বলে, লজ্জা করে যে।

লজ্জায় কী হবে মেয়ে, লাজ থাকতে নয়, যা বলি ঠিক বলিরে, সময়কালে বিয়ে হওয়া দরকার, আর তুই হলি মা-বাপের একমাত্র মেয়ে, তোর জন্যি ঘরজামাই চাই, তালুক ছেড়ে কেন যাবি সবারে কেঁদে ভাসিয়ে, সকাল সন্ধে ঘরে দুয়ার দিয়ে থাকবি দুজনায়।

অনুশ্রী-তনুশ্রীর কানে যাচ্ছে, কিন্তু বলতে পারছে না কিছু। গয়লানি মোহ বিস্তার করছে আর তার ভিতরে ঢুকে পড়ছে কমলা। এই গয়লানির খ্যাতি কিসে তা কি তারা জানে না?  মাসি-পিসি, মা-ঠাকুমা বার বার বলে দিয়েছে চিকন গয়লানির ছায়া না মাড়াতে। নিজে বিয়ে না করে বুড়ি হয়ে গেল সে, কিন্তু কত সংসার যে ভেঙেছে। কত পুরুষকে খেলিয়েছে। কতজনকে উন্মাদ করে দেশ ছাড়া করিয়েছে। হায় হায় হায়, কমলা কি বুঝতে পারছে না চিকন গয়লানি কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে? এই যে এখন কমলাকে টেনে গিয়ে চিকন তার কানে কানে কী সব বলছে। কী বলছে তা একমাত্র খবরিয়া জানতে পারে। আর কেউ না। কিন্তু সে তো খবর বাসী করে বলে। বাসী না হলে খবর হয় না। বাসী হতে দিলে সব্বোনাশ হয়ে যেতে পারে। চিকন বলছে, রাজপুত্তুররে রাজপুত্তুর, কোনও গনৎকার তার খবর জানে না। নিজের চারদিকে গণ্ডি কেটে রেখেছে সে, তারপর এমন ছদ্মবেশ ধরেছে এমন যে গণৎকারের দপ্পনে সে ধরা পড়বে না। তাদের চোখ আর কানের সীমার বাইরে থাকে সে। যেমনি তার দেহ, তেমনি তার মন। যেমনি তার রূপ, তেমনি তার গুণ। তাকে সে রাজি করিয়েছে, এমন পাত্তর আর পাবে না তালুকদারের মেয়ে।

এমন পুরুষ সে, এমন যৈবন,

মেয়ে কানে শুন কেমন সে ধন

কমলা বলে, তুমার কথায় মুই কাঁপি গয়লানিদিদি, কিন্তুক মুর ভাগ্য গণতে কত সব গণৎকার খুঙ্গি ভরা পুঁথি নিয়ে এসেছে, কাল বাদে পরশু চাঁদের পক্ষ, তারা গণে দেবে পাত্র কেমন হবে, তার বাহিরে কিছু করা যাবেনি তো।

তুই একবার তার সনে দেখা কর মোর ভিটেয় এসে, নাক বরাবর সোজা সরল মুর ভিটে, পেত্থম দিনেই বুঝবি সে কেমন, গন্ধর্ব মতে বিয়ে দিয়ে দিবো, তুর জীবন সাত্থক হবে।

ভয় করল কমলার। কিন্তু আনন্দও হলো। মুখে রক্তাভা দেখা দিলো। বলল, না, সে আসুক।

সে আছে বুড়া বেশে, বিয়ার পর জুয়ান হবে। জড়ানো গলায় বলল গয়লানি, লোকে যেনে না চিনে, না সন্দেহ করে, তাই এই বেশ, আসলে তার অক্ষয় যৈবন।

তাইলে তারে দেখি কী করে?

গয়লানি বলে,

দেখা দিবে কন্দর্প তিনি, বিয়ার পর

আমিত্যু যৈবন তাঁর, এখন তো বুড়া নর।

কমলা বলে,

যৈবন আর রূপ না দেখি চিকন, কেমনে বুঝিব

আমিত্যু যৈবন যার, এখন বুড়া নর, কেমনে সহিব?

গয়লানি বলে, মালা বদলের পর জুয়ান হবে সে, মুর কথা শুন।

মুর কথা শুন কমলা, রহিবে ঘরজামাই

তারে রেখে তুই পাবি, কত শ্যামাই রামাই

পুরুষের পর পুরুষ পাবি, অদল বদল,

কামগন্ধে ভরি যাবে ভিতর মহল

কমলা বুঝল না, জিজ্ঞেস করে এর মানে কি চিকনদিদি, ও সই বকুলফুল, গোলাপফুল, ইদিকে আয়, চিকনদিদির কথা শুন।

উদের কেন, এ নিজেদের কথা, চিকন বলে,

কন্দর্প গন্ধব পুরুষ, অতুল যৈবন,

বারে বারে কত বলি, বিয়া হৈবন

ঘরজামাই রহিবে সে, এমনি বাসনা,

তালুকদারের কন্যা সে করিসে কামনা।

মুর ভিটা সোজা অতি, নাক বরাবর,

সেথায় বসিয়া আছে, ইহাই খবর।

অনুশ্রী জিজ্ঞেস করে, কত বয়স হইল তার, কেমন সে পুরুষ।

কমলা বলে, বুড়া হয়ে লুকাইসে, বিয়ার পর যৈবন পাবে, কহিসে গয়লানি।

তনুশ্রী এগিয়ে আসে,

কী কহিস গয়লানি তুই, কী বারতা আনিস,

বুড়া বর ঘরজামাই, কার জন্য কহিস?     

গয়লানি হাসতে চেষ্টা করে, আবার বলে,

বুড়া বর আশীব্বাদ, সেবা পেয়ে বাঁচে,

কচি বউ পায় কত, যতই না যাঁচে

আসলে সে গন্ধব্ব পুরুষ, বুড়া মনে লয়,

সময়ে যৈবন ফুটে, তেজময় হয়।

সোয়ামি বুড়া হয় যদি, আসিবে নাগর,

জুয়ান আসিবে কত, কামকেলির সাগর

যখন যেমন চায়, পাইবে গো সুন্দরী,

থৈ থৈ যৈবন যার, চম্পার রঙ ধরি।

কমলা বুঝে নেয়। বুঝে ফেলতেই বুড়ি গয়ালানির গালে চড়। ঝাঁপিয়ে পড়ল, ওরে ও, কুটনি বুড়ি, চিকন মাগি, তোর একদিন না হয় আমার একদিন, এতবড়ো সাহস তোর ফুঁসলাতে আসিস মুরে, ও মুখে কোলা ব্যাঙ ভরে দিবো মুই তালুকদারের মেয়ে।

মুর কথা শুনো গো কমলা…।গয়লানি বোঝাতে চায়।

কী বুঝাবি মাগি তুই, বল্মীক বিক্ষ। গরগর করে ওঠে কমলা, উই খেয়েসে তোর সব।

লাফ দিয়ে উঠে পড়ে গয়লানি। দাঁড়ায় না আর। তার অবশিষ্ট দাঁতের দুইটি পড়ে গেল, মুখে রক্ত দেখা গেল। কোনও রকমে উঠে সে দৌড় দিল ঘোমটা টেনে।

কে যায় কে যায় চিকন গয়লানি,

কী হলো তার, কেন ছুটে যায়?

জলে দুধ, দুধে জল, হায় হায় হায়।

সন্ধে হয়ে গেল ভাগ্যি। অন্ধকারে সে হাঁটতে থাকে নাক বরাবর। ভিটেয় তখন বুড়ো বসে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিম গাছের ডালে এক কালো পেঁচা এসে খবর নিচ্ছে, কী হলো গো কী হলো?

দুই

এবার খবরিয়া বানাবে। কী বানাবে, না তার খবর। কী হলো গণৎকার আর চিকন গয়লানির? গয়লানি সন্ধের অন্ধকারে নাক বরাবর ভিটেয় এসে পৌছোয় ক্ষিপ্ত হয়ে। বুড়োর কথায় নেচে তার সব গেল। ঘরজামাই হবি তুই, কাল সকালে তালুকদারের লেঠেল এসে ভিটে ভাঙবে, ঘর ভাঙবে, ঘর না থাকলে ঘরজামাই হবি কী করে বুড়া?

ত্রিলোচন টের পায়, গয়লানি ব্যর্থ হয়েছে তো বটে, কুপি জ্বালাতে জ্বালাতে গয়লানি বলে, ঘরজামাই হবি তো, কিন্তু ঘর থাকবে কি না ভগমান জানে, এই বুড়া বামুন, এই অমানিশিতেই তোর বিয়া হই যাবে, কচির কচি মেয়েমানুষ, কিন্তু মুই কী পাবো?

গণৎকার বুঝতে পারে না, কী হয়েছে আর কী হবে। হুতুম পেঁচা ডেকে ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। কৃষ্ণা চতুর্দশীর চাঁদ উঠবে শেষ রাতে। উঠেই বিলীন হবে। এই অন্ধকারে কি বিয়ে হয়, না হতে পারে? যদি হয়, তাহলে পেরেছে গয়লানি, পেরেছে। তালুকদারের মেয়েকে ভুলিয়েছে সে। গয়লানি বলে, শুভদিষ্টিতে বুড়ার মুখ দেখলে কনের কি বিয়ার সাধ হবে, তাই কিষ্ণ পক্ষের চতুদ্দশীর রাতেই হবে, কেউ কারও মুখ দেখবেনি, বসো ভিতরে গিয়া।

কনে কই? ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করে ত্রিলোচন।

আছে, গাছের সঙ্গে বেটাছেলের তো বিয়া হয় না, মেয়েমানুষের হয়, মেয়েমানুষের সব হয়, কচি মেয়ের বুড়ার সঙ্গে  বিয়া হয়।

ত্রিলোচন উঠে ভিতরে যায়। ঝুপসি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে। কী হবে, কী হবে না, তা নিয়ে তার কোনও ধারণা তৈরি হচ্ছে না। খবরিয়া নেই, সন্ধে নামার আগেই যেন ফুস হয়ে গেছে। ত্রিলোচনের মাথা কাজ করছে না। না হলে জানা যেত কী হয়েছে তালুকদারের বাড়িতে। রাজি হয়েছে, না হয়নি সে? আহা সেই মেয়ে আর তালুকদারের বাড়ির সুখের দৃশ্য সে স্বপ্ন দেখছিল বিকেলে দিনের আলোয়। দিবাস্বপ্ন মুছে গেল আঁধার নামতে। তখন তার ভিতরে ঝিমুনি এলো, ঝিমোতে ঝিমোতে মাথা বিকল হলো। এখন বিকল মাথা নিয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

দিনভর করি কী, বকুলমালা গেঁথেসিলাম, শুকাই গিসে, কিন্তু তাই দিয়াই বিয়া হবে। বাইরে থেকে গয়লানির গলা ভেসে আসে।

সেই কণ্ঠস্বরে আশায় ভুলেছে গণৎকার। শুখা মালা আর ছেঁড়া মালা যাই হোক, তালুকদারের কন্যা পেলেই হলো। ঘরজামাই হতে পারলেই হলো। কিন্তু যাই হবে সবই তো খবরিয়া খবর করবে। আর খবর করা মানে খবর বানানো। গণৎকার যা ভাবুক, বাণেশ্বর তার নিজের মতো করে খবর করেছিল । কী খবর?

খবরিয়ার খবর হলো, বুড়ি চিকন গয়লানি সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে মালা দিয়েছিল বামুনের গলায়। সারা জীবন তার বর হয়নি, সুযোগ পেয়ে বামুনকে ধরল। এস বাউন, তুমার চাঁদমুখ দেখি।

সে কই, ও বামনি, সে কই? গণৎকার জিজ্ঞেস করে অন্ধকারে।

চিকন গয়লানি বলে, সে এখন গয়লানির বেশে এয়েসে, রাজপুত্তুর যেমন বুড়া নর হয়েসে, যুবতী কনিয়া তেমন বুড়ি নারীবেশে আইসে।

গণৎকার জিজ্ঞেস করে, কখন সে যুবতী হবে?

চিকন গয়লানি তার হাত ধরে, তুমু যবে যৈবন পাবে নাথ, মুই তবে হবো যুবতী নারী।

অন্ধকারে রেড়ির তেলের কুপির আলোয় গণৎকার দেখল মালা হাতে চিকন গয়লানিকে। গয়লানি সেই শুখা মালা পরিয়ে দিয়ে ত্রিলোচনের হাত ধরল, রাতিই পলাতি হবে, তালুকদারে লেঠেল পাঠাবে আরু কিছু বাদে তার কানে সব গেলে।

তুমি গয়লানি না তালুকদারের কনিয়া কমলা? গণৎকার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে। কী যে হচ্ছে তা সে বুঝতে পারছে না। জগতে কী না ঘটতে পারে আর চিকন গয়লানি যে কতকিছু ঘটাতে পারে? সে বলছে, আসল গয়লানি কমলা সেজে তালুকদারের গৃহে আছে, আর কমলা চিকন গয়লানি হয়ে এসেছে গণৎকার ত্রিলোচনের দয়িতা হয়ে, নাথ এসো, চুমা দাও।

বুড়ো গণৎকার বলে, যুবতী হও তবে।

চিকন বলে, হেথা নয়,

মুর বাপ তালুকদার, রাগিয়া আগুন,

দূর দেশে চলো নাথ, রহিসে ফাগুন।

সেই বুড়ি গয়লানি, কী হইবে তার,

এই রাতি চলো নাথ, হই পগার পার।       

বামুন গণৎকার তবু জিজ্ঞেস করে,

কেমনে হইলো ইহা, কেমনে হইলো,

কমলা চিকনরূপ, কেমনে পাইলো?

চিকন গয়লানি বলে,

কী তুমি কহ নাথ, রাজার পুত্তুর,

কামিক্ষ্যার মন্ত্র ইহা, না জানে শত্তুর

যেমনে হইসো তুমি, এক বুড়া নর,

তেমনি হইসি আমি, শুনো বিদ্যাধর। 

আর কী, সেই রাতেই গাইদুটি আর বামুনকে নিয়ে সে পগার পার। পগার তো ছিল না, কিন্তু দুটো মাঠ আর সোমাই—সোমেশ্বরী গাঙ পার হয়ে সুসুঙ্গা দুর্গাপুর হয়ে দক্ষিণে জঙ্গলবাড়ি নগরে গিয়ে পৌঁছোল। সেই জঙ্গলবাড়িতে দেওয়ান ঈশা খাঁর রাজত্ব। দিল্লির আকবর বাদশার সঙ্গে টক্কর মারতে পারে, এমন ভুঁইয়া ঈশা খাঁ। সেখানে গিয়ে বামুন, বামনি আশ্রয় নিলো গাইসমেত। বামুন গণৎকার যেমন যৌবন পায় না, শিশ্ন লুটায়ে থাকে, তাই বুড়ি আর ফিরে না পায় যুবতীর রূপ। বামুন গণৎকার বোঝে তাকে ঠকিয়েছে গয়লানি। কিন্তু আর উপায় নেই। বামুন তুমি যৌবন পাও, বুড়ি যারে দেখছ সেই গয়ালানি হয়ে যাবে পূর্ণ যুবতী। বামুন বোঝে তাকে খাঁচায় পুরেছে গয়লানি।  হলো বামনি, শোনো কথা। বামুনের যে কী হয়েছিল, গয়লানি বলেছিল, যদি সে তার কথার অন্যথা করে, তবে দেওয়ানের হাতে তুলে দেবে। শূলে চাপিয়ে মারবে তাকে। তবে ওই কমলার ক্ষতি করে সে বামুনের প্রাণ জুড়াবে, সেই কথাও বলল। প্রতিহিংসায় জ্বলতে লাগল গয়লানি, এখন লোচনী বামনি। বামুন ত্রিলোচনের এক লোচন সে। বুড়ি হয়ে সোয়ামি জুটেছে, সংসার হয়েছে, আর কী চায়?  ভুঁইয়া ঈশা খাঁর রাজত্বে বামুনের খুব মান। বামুন তার পুঁথিপত্র নিয়ে বসে গেল। লোকের ভূত-ভবিষ্যৎ বলতে লাগল। প্রতিবেশীরা সিধে দিয়ে যায়। বামুনের সেবায় পুণ্য হয়। বামুন মা, বামুন মা করছ তুমু কী? আহা গয়লানি বামুন মা হলো। এ জীবনে এমন সুখ আর হবে?

এ হলো পরের কথা। আসল কথা হলো তালুকদারের কন্যার বিবাহ। কী হলো খবরিয়া, বলো। বামুনের কথা শুনতে আর ভালো লাগছে না।

খবরিয়া বলে, শুনো, রূপে-গুণে কমলার মতো কেউ ছিল না মৈমনসিং পরগনা জুড়ে। কতবড়ো সেই পরগনা, উত্তরে গারো পাহাড়, পুবে ব্রহ্মপুত্র, তা পার হয়ে রাঙামাটি, ফুলবাড়িয়া, মুক্তাগাছা, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ, তা ছাড়িয়ে মেঘনার কূল, পশ্চিমে সিলেট-সুনামগঞ্জ। এতদাঞ্চলে এমন রূপ আর ছিল না। পূর্ণিমার চাঁদ। কমলা চিকন গয়লানির কথা সব বলেছিল তার মায়ের কাছে। তালুকদারের কানে গিয়েছিল কথা। পরদিন সকালে পাইক পাঠিয়ে দেখেছিল, ভিটে পড়ে আছে, চিকন গয়লানি নেই। কিছুই নেই, শুধু কোকিলটি তার অভ্যাসে কুহু কুহু, কে এলো, কে এলো… ডাক দিয়ে গয়লানিকে সতর্ক করেই যাচ্ছিল। ভিটের পিছনে আশশ্যাওড়া গাছটির ডাল শূন্য। কচি পাতাও নাই, ঠ্যাংঠেঙে কঙ্কালসার।

পরদিন শুক্লপক্ষের শুরু। গণনা আরম্ভ হলো।  নানা দেশের গণকঠাকুর তাঁদের পুঁথিপত্র নিয়ে হাজির। এক একজন দশ-বারোটা করে খুঙ্গি এনেছে সঙ্গে। তার সাতটায় যদি পুঁথি থাকে, বাকি পাঁচটা খালি। তালুকদারের সিধে নিয়ে যাবে। ধুতি, উড়নি, চাদর, শাড়ি, শীতের কম্বল…সব নিয়েই ফিরবে। সঙ্গে ভৃত্য এসেছে তাই। গণকঠাকুর বুড়ো হলেই তার প্রতি বিশ্বাস বাড়ে। কুব্জ আর নুব্জ দেহ, মুণ্ডিত মস্তক, মস্তকের পিছন দিকে লম্বা টিকি। তার ঘাড় নড়ে, কন্যার ভবিষ্যতের ছবি অনুধাবন করে। তাতে টিকি নড়ে। সে বলল, কন্যা রূপবতী, অপূর্ব এক সুন্দরী, পূর্বজন্মে বুঝি ছিল অপ্সরা উবর্শী কেউ। না, তাদের রূপও এই কন্যার নিকট ম্লান। তরুণ এক রাজপুত্র এই মেয়ের বর হবে। না যদি হয়, মু গণনা ত্যাগ করি দিবো।

সকলে কমলাসুন্দরীকে তাদের সমুখে এক সিংহাসনে বসিয়ে রেখে তাকে দেখে ভবিষ্যৎবাণী রচে। এক-একজন কত সময় নেয়। সুন্দরীকে নিরীক্ষণ করে তাদের সুখ। অবশেষে ভবিষ্যৎ ব্যক্ত করে। হেঁপো রুগি এক গণক কমলাসুন্দরীর রূপ বর্ণনা করে,

যুগল ভ্রূ, কেশবতী, প্রশস্ত কপাল,

মুক্তাদন্তী গৌরী কন্যা, ণ্ডদেশ লাল

ধনকুবের পাত্র হবে, মস্ত সদাগর,

পতি গরবে সুখী হবে, সুখের সাগর।

দক্ষিণ দেশে বিয়া হবে, দক্ষিণে যাবেন,

নিদ্রান্তে দুয়ার পাশে, কিঙ্করীদের পাবেন।

উঁহু, না। আর এক বুড়ো গণক গণনা করে বলল, পায়ের আঙুল দেখো, এই মেয়ের কখনোই দক্ষিণদেশে বিয়ে হবে না, উত্তরদেশে যাবেন ইনি চতুর্দোলায় চেপে।

কেন হবে তা? বলছি, পায়ের আঙুলগুলি পদ্মের কোরকের মতো।। হেঁটে যান যখন, পদতল ভূমিতে লগ্ন হয়ে থাকে, ইনি যখন চলাচল করেন, পথও চলে সঙ্গে, পথিপার্শ্বের বৃক্ষাদি অগ্রসর হইয়া আসে,  ইহাই প্রমাণ করে, ইনি উত্তরদেশে যাবেন বিবাহের পর।

কত গণক, তাদের কতরকম গণনা। কেহ বলে, রাজরানি হবেন ইনি, কেহ বলে সাত ছেলের মা হবেন ইনি। কেহ বলে, কন্দর্পকান্তি স্বামী হবে এঁর, কেহ বলে, হবে হবে, সব হবে। তালুকদারের এক ঘরজামাই হবে। তা শুনে আর একজন বলল, মোটেই না, ঘরজামাই কেন হবে? সে ফাঁড়া কেটে গেছে। রাজার পাটরানি হবে কমলাসুন্দরী। স্বামীর ভালোবাসা পাবে সে। কতরকম ভালো কথা, মধুর বাক্য উচ্চারিত হলো। তালুকদার খুশি হলো। ব্রাহ্মণ গণকের দল খুশি হয়ে ফিরল।

খবরিয়া গিয়েছিল জঙ্গলবাড়ি নগরে, ঈশা খাঁর রাজত্বে। সে না গেলে তো হবে না। সে গিয়েছে বলেই তো চিকন গয়লানি আর ত্রিলোচন গণৎকার যেতে পেরেছে। বলতে গেলে সে-ই তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে সেথায়। কেননা, সে-ই তো নিজের মতো করে সমস্যার উদ্ভাবন এবং সমাধান করে থাকে। কাহিনি বানিয়ে খবর করে। সে গিয়েই তো খবরের জন্ম দেয়। বুড়ো গণৎকারের ভিতরে ঘরজামাই হওয়ার বাসনা সে-ই জাগিয়ে দিয়ে অতঃপর তার সমাধান করেছে। গয়লানি আর গণৎকারের কথা শেষ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল বাণেশ্বর খবরিয়া। ওই খবর নিয়ে আর কত ধুয়ে খাবে সে? লোকে কত শুনবে বুড়ি গয়লানির কথা? যতই তার কাহিনি সে আকর্ষণীয় করে তুলুক, গয়লানির তো যৌবন গেছে। তার কিস্‌সা কত শুনবে লোকে? কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না খবরিয়া। যাই হোক, বুড়ো আর লোভী গণৎকারের যে শেষ পযর্ন্ত গয়লানি লাভ হলো, এই কাহিনিতেই কাহিনি শেষ হতে পারে না। কাহিনি তো আরম্ভ হয়েছে সবে। লোকে জানতে চায় কমলাসুন্দরীর কথা। বাণেশ্বর খবরিয়া  জঙ্গলবাড়ি থেকে এলো সুসুঙ্গা দুর্গাপুর। এলো সে কতদিন বাদে। সেই রাজ্যে নবীন রাজা জানকীনাথের রাজ্যাভিষেক ঘটেছে সবে। জানকীনাথ ক্ষত্রিয় সেনাপতি সোমেশ্বর সিংহের বংশধর। সোমেশ্বর সিংহ নাকি সোমেশ্বরী নদীর সন্তান ছিলেন। নগরের উপান্তে সেই সোমেশ্বরী নদী। নদী যেন প্রজাকুলের চোখের জল বয়ে উত্তর থেকে নেমে এসে দক্ষিণ দিকে বয়ে যাচ্ছে। নগরে এখন দুঃখ পাখির ডানার ছায়া ব্যাপ্ত হয়ে আছে।

নগরে আনন্দ নেই কারও ভিতরে। খবরিয়া শুনল রাজা নিঃসঙ্গ হয়ে গেছেন আচমকা পিতা ও মাতার মৃত্যুর পর। পর পর, দুই অমাবস্যায় দুজন। রাজ্যের প্রজাকুলও খুব শোক পেয়েছিল। রাজার মুখেও হাসি নেই। এই সময় খবরিয়া প্রবেশ করল সেই নগরে। তারা বলে, এমন কিছু খবর দাও যাতে চিত্ত শান্ত হয়, শোক প্রশমিত হয়। খবরিয়ার কাজ এইটাও। সে যেমন মানুষের উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে, তেমনি তা প্রশমিতও করে। তার কথায় মানুষ হাসে, কাঁদে। হাসি-কান্না সে-ই তৈরি করে। খবরিয়া তখন বলে, শুনো তাহলে, আসল কথা তো তালুকদারের কন্যা কমলাসুন্দরীর।

কমলাসুন্দরী! কোন কমলা? শ্রীহট্ট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের কমলা না লক্ষ্মীপুরের কমলা? কত কমলার কথা জানে তারা। খবরিয়া তুমু কোন কমলার কথা কহো?

তালুকদারের মেয়ে কমলার কথা, সে বড়ো সুন্দরী, যেন এক লক্ষ্মী প্রতিমা। কেমন সুন্দরী কহো। বাণেশ্বর খবরিয়া বলে, শুনো সুন্দরী কমলার কথা, যেমন সুন্দর চায় পুরুষ তেমনি সুন্দরী সে। যেমন গুণ চায় পুরুষ, তার ভিতরে তেমন গুণ।

তাই, মুদের রাজার বিয়া হয় নাই,

কেমন সে রূপবতী, কহ খবরিয়া,

কেমন সে গুণবতী, কহ খবরিয়া

খবরিয়া বলে, রূপ আর কহি কী, তালুকদারের কন্যার বিবাহযোগ, পাত্র সন্ধানে আছে তালুকদার, গণৎকার আসছে কত, কত কথা বলে যাচ্ছে,

পাটরানি হবেন তিনি, কমলাসুন্দরী,

গিহেতে লক্ষ্মী তিনি, কমলাসুন্দরী। 

খবরিয়ার কথা ভীড় করে শুনতে লাগল নগরের মানুষ। কত কত লাভ হলো তার। কত ধামা ফল-ফলারী, চিড়া গুড়, চাউল, বস্ত্র, উড়নি, খড়ম, পাদুকা, মুদ্রা…। সব গুছিয়ে রাখার জন্য সে একটা লোককে বরাত দিলো। বরাতি লোকটি এক পেটিকা সামগ্রী নিয়ে পালিয়ে গেল। নতুন বরাতি এলো সব গুছিয়ে রাখতে। তাকে চোখে চোখে রাখল নগরের মানুষ। খবরিয়া অনেক দিন বাদে খবর করে সুখ পাচ্ছে। মানুষের মন কোনও কোনও খবরের জন্য হয়তো মুখিয়ে থাকে। সুসংবাদ চায়।  সুসংবাদ নিয়ে এসেছে খবরিয়া। রাজ্যের মানুষ চায় দুঃখ আর শোকের চূড়ান্ত অবসান।  কমলাসুন্দরীর কথা নিয়ে ঘটক গেল রাজার বাড়ি। রাজার মন্ত্রী শুনল সেই কন্যার রূপ আর গুণের কথা। মন্ত্রী সেই কথা নিয়ে গেল তরুণ নৃপতির কাছে। নৃপতি জানকীনাথ বলল, কমলাসুন্দরীকে দেখতে যাবে।

খবরিয়া সেই খবর তখন তৈরি করতে থাকে মনে মনে। কাহিনি নিয়ে রওনা হবে সে গারো পাহাড় পেরিয়ে দূর গাঁয়ে। কমলাসুন্দরীর সঙ্গে জানকীনাথের বিবাহ সংবাদ নিয়ে ঘুরতে থাকে।

মৈমনশাহী উপাখ্যান এমনি রচি।

ধান দিও, কলাই দিও, কদলিপুষ্প কচি।।

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৮ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev