সম্পর্কের ভাঙা গড়ার খেলাটা বড় অদ্ভুত। যতই তাকে রঙিন কাগজে মোড়কবন্দি করতে চাওয়া হোক, ভিতরের চাপা রাগ, দুঃখ, হতাশা, না পাওয়ার যন্ত্রনা কতদিক থেকে যে বেরিয়ে আসে, তার হদিস অনেক সময় নিজের কাছেও থাকে না।জীবনে অনেক পাওয়া না পাওয়ার হিসেব যে কত ভাবে চলে বোঝা দায়। খুব ছোট ছোট কারণে বেরিয়ে আসে আগ্নেয়গিরির মত ভলকে ভলকে। যেমন আজই একচোট হয়ে গেল বাজার থেকে ফেরার পর। অঞ্জু বাজারের ব্যাগটা সুমিতের হাত থেকে নিয়েই নাক সিঁটকে বলল, “ঐ আবার! আবার এনেছ তুমি ইলিশ মাছ? জানো না, এই মাছটা আমি সহ্য করতে পারি না? গন্ধে বমি আসে আমার। তবু তুমি বর্ষা শুরু হলো কি না হলো ইলিশ আনতে শুরু করে দেবে। আমি পারব না, বলে দিলাম রাঁধতে। তুমি যাকে দিয়ে পার রাঁধাও।” দুপদুপিয়ে চলে গেল অঞ্জু। সুমিত পেছনে পেছনে বোঝাতে বোঝাতে এগোল। অবশ্য বোঝানোতে কতটা কাজ হবে সে নিজেও জানে না। তবু প্রিয় মাছের অমর্যাদা তো হতে দেওয়া যায় না, যেখানে এ মাছের দাম সোনার দামের কাছাকাছি। সুমিত জানে অঞ্জু ইলিশ খায় না, এমন কি গন্ধ ও সহ্য করতে পারে না, তবু নিজের ভালবাসা চেপে রাখতে পারে না। বাজারে গেলে এই রূপোলি মাছ দেখলেই নিজেকে ধরে রাখার ক্ষমতা তার হারিয়ে যায়। নয় নয় করে পনের বছর একসঙ্গে ঘর করা অঞ্জুর সঙ্গে। বিয়ের পর যে চার বছর মা বেঁচে ছিলেন এই অশান্তি একদিন ও হয়নি, কারণ, মা ছিলেন রান্নাঘরের কত্রী। অঞ্জুকে রান্নাঘরে ঢুকতেই হত না। সুতরাং ইলিশের গন্ধে তার বমি পাবার সম্ভাবনা ও ছিলনা। ওর জন্যে আসত কাটা পোনা। সুমিত বুঝতে পারে না কেউ কি করে ইলিশ ফেলে কাটা পোনার ঝাল দিয়ে ভাত খেতে পারে! আর মেয়েটা ও হয়েছে তেমনি! সেও মায়ের দেখাদেখি ইলিশের নাম শুনলেই নাকে হাত চাপা দেয়, আশ্চর্য!রান্নাটা আবার একেবারেই সুমিতের আয়ত্তের মধ্যে নয়। মা কোনদিনই রান্নাঘরে পুরুষ মানুষের আসা যাওয়া পছন্দ করতেন না। ফলে বাবা বা সুমিত শুধু পছন্দসই রান্না খেয়েছে আর হয় তারিফ, নয় নিন্দে করেছে। মা সবটাই হাসিমুখে নিতেন। খারাপ বললে ও, ভাল বললেও। শুধু খুব ভাল হয়েছে বললে আর নিজের টুকু ও না রেখে ওদের খাইয়ে দিতেন। এটাই স্বাভাবিক অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছে সুমিতের। মা চলে যাবার পর যে অঞ্জুর স্ত্রী স্বাধীনতা এতটা মাথাচাড়া দেবে সেটা বিয়ের সময় ভেবে দেখার অবকাশ ছিল না। তার ওপর এই ইলিশ মাছের গন্ধ নিয়ে এত বাড়াবাড়ি সহ্য হয় না আর।
রোজ পড়াতে আসতেন তুহিনদা। পড়াশোনা, খেলাধুলায় তুখোড়। দেখতেও অনেকটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত। কথা বলার ধরণ ও খানিকটা সেরকম। ভীষণ ভদ্র, বিনয়ী। সব বাড়ির বাপ মায়েরা এরকম একটি পুত্রের আকাঙ্ক্ষা করেন। সবার কপালে তো জোটে না, যেমনটা জুটেছে মুখার্জি জেঠু জেঠিমার। দু দুটো ছেলে যেন হীরের টুকরো। যে দেখে সেই বলে, “হ্যাঁ, কপাল বটে মুকুজ্জে গিন্নীর!” পড়াতে আসতেন, কিন্তু কোন ফিজ নিতেন না। বাবা দিতে গিয়েছিলেন ক’বার। উনি নেননি। তাতেই বুকের কাঁপন আরও বেড়েছিল। অঞ্জু আর সুমি দুই তুতো বোন একসঙ্গে পড়তে বসত দু দিকের চেয়ারে, মাঝে তুহিনদা। অঙ্ক আর ভৌতবিজ্ঞান দেখিয়ে দিতে আসতেন। কতটা পড়া হত জানা নেই, তবে রাতে দু বোনের শুয়ে শুয়ে তুহিনদাকে নিয়ে আলোচনার শেষ ছিল না। ঘুমোতে যাবার আগে দু’জন মিলে একটা চিন্তায় মগ্ন হয়ে ভাবতে থাকতো, তুহিন কাকে পছন্দ করে? অঞ্জু না সুমি? নাকি তাদের কাউকেই নয়! তুহিনদা ভীষন ইলিশ মাছের ভক্ত ছিল। তাদের দুবোনকে বিনা পয়সায় পড়িয়ে যেত বলে মা কাকীমা দুজনেই ইলিশ মাছ ভেজে গরম গরম দিয়ে যেত তুহিনদার সামনে। গন্ধে জিভে জল আসত দু বোনের ই। তুহিনদা এই একটা জিনিসে কখনো না বলতেন না। তারপর মাধ্যমিকে স্টার পাবার পর অনেক অভিনন্দন জানিয়ে একদিন চলে গেল তুহিনদা। সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে। দিন কাটতে লাগল নিজের মতো করে। শুধু অঞ্জুর ইলিশে বড় ঘেন্না এসে জমা হলো। প্রথমে খেতে আপত্তি, তার পর দেখেই বিতৃষ্ণা, তারপর গন্ধে বমিভাব। ওর জন্যে শেষের দিকে ভেন্ন হয়ে যাওয়া সংসারে অঞ্জুর বাবা আর চট করে ইলিশ আনতেন না।
ঝগড়ার জের রাতে এসেও কমার কোন লক্ষণ নেই। মাছের কোয়ালিটি অনুযায়ী রাঁধতে ও পারেনি, চেষ্টা ও করেনি। এ নিয়ে দু চারটে বাগবিতন্ডার পর সুমিত আর কথা বাড়ায় না। রাতে শুয়ে একটা মীমাংসার ঝোঁকে অঞ্জুর গায়ে হাত দিতেই সাপের মত ফোঁস করে ওঠে সে। হিসহিস করে বলে, “ছোঁবে না! একদম ছোঁবে না আমাকে। বদমাশ। ইতর লোক একটা!”
মাথাটা ভয়ংকর গরম হয়ে গেল সুমিতের। মনে হলো দেয় এক ঘা। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে পেছন ফিরে শুয়ে পড়ল। এক ধরণের মানুষ আছেন, যাঁরা খুব দুঃখ, খুব অশান্তির পরেও বালিশে মাথা রাখলেই ঘুমিয়ে পড়েন। সুমিত সেই দলে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুমিতের গাঢ় নিশ্বাসের আওয়াজে ঘর ভারি হয়ে উঠল। অঞ্জুর চোখে ঘুম নেই। সত্যিই তো এরকম অশান্তি করা তার উচিত ছিল না। কিন্তু ওই ইলিশ মাছের গন্ধ কেন যে তাকে এত উতক্ত করে সে বুঝতে পারে না।
শেষ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল সুমিতের। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে তার। ক্ষীণ একটা গলার আওয়াজ আসছে ডিভানের তলা থেকে। আর একটা ছটফটানির আওয়াজ, যেমন জ্যান্ত মাছ জল থেকে ওঠার পর করে, ঠিক সেই রকম! সুমিত বিছানায় উঠে বসে দেখে পাশে অঞ্জু নেই। গোটা ঘর একটা আঁশটে গন্ধে ভাসছে! অঞ্জু! অঞ্জু! করে বার তিনেক ডাকার পর ডিভানের তলায় ছটফটানির আওয়াজ বেড়ে গেল। সুমিত তাড়াতাড়ি উঠে সাদা আলো জ্বেলে ডিভানের নীচে হামাগুড়ি দিয়ে বসে দেখে একটা রূপোর মত ঝকঝকে ইলিশ! সদ্য জল থেকে তোলা এমন নধর! কিন্তু এখানে এল কি করে? হাত বাড়িয়ে মাছটা ধরতেই কানে এল অঞ্জুর গলা। কিন্তু খুব ক্ষীণ, আর সরু! “শিগ্গির আমাকে জলে নিয়ে যাও, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, শিগ্গির! আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না!” মানেটা কি! অঞ্জু ইলিশ মাছ হয়ে গেছে! এটা সম্ভব! এটা হতে পারে? কিন্তু ভাবার সময় নেই। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা প্লাস্টিকের গামলায় জল ভর্তি করে মাছটা জলে রাখতেই আওয়াজ এল,” আহ্! বাঁচলাম। thank you! “সুমিতের মানসিক অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সে অবাক হতেও ভুলে গেছে। তার মানে সত্যিই অঞ্জু এখন একটা ইলিশ মাছ! এর পরেই ভাবনা এল, রিঙ্কুর কি হবে? রিঙ্কু তাদের একমাত্র কন্যা। সবে ক্লাস সিক্স। সে কি বুঝতে পারবে যে তার মা এক রাতের মধ্যে ইলিশ মাছে রূপান্তরিত হয়েছে! আচ্ছা রিঙ্কু তো গেল, অঞ্জুর বাবা, মা, ভাই… এরা সবাই বিশ্বাস করবে যে অঞ্জু ইলিশ মাছ হয়ে গেছে! পাড়ার লোক, বাড়ির কাজের মাসি এরা, এরা সবাই বিশ্বাস করবে যে একটা জলজ্যান্ত মানুষ রাতারাতি ইলিশ মাছ হয়ে গেছে! কেউ বিশ্বাস করবে?মনে মনে একটা বিজাতীয় অনুভব ও এল। দ্যাখ এবার মজা! ইলিশ রাঁধবো না রাঁধবো না করে এখন নিজেই ইলিশে পরিণত হয়েছে। এবার গন্ধ লাগছে না?
একটা বড় প্লাস্টিকের গামলায় রাখতে হয়েছে অঞ্জুকে। সাধারণ মাছের থেকে সাইজে বড় বলে। কিন্তু এটা সম্ভব হলো কি করে! এমন কান্ড কেউ মানবে? রিঙ্কু ঘুম থেকে উঠে মাকে খুঁজে না পেয়ে খুব চিৎকার শুরু করেছিল। সুমিত ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজেদের ঘরে এনে দরজা বন্ধ করে ওকে দেখাল ইলিশ মাছটাকে।
“কি বাবা! আমি তো মাকে খুঁজছি। আমার ম্যাথস করে দেবে বলেছিল মা, তুমি ইলিশ মাছ দেখাচ্ছ কেন? আর ঘরের মধ্যে মাছ রেখেছ কেন? ইস! কি দুর্গন্ধ!” চলেই যাচ্ছিল রিঙ্কু। সুমিত ওর হাতটা ধরে টেনে বসাল।
“আবার কি বলবে?” স্পষ্টতই বিরক্ত রিঙ্কু।
“চিনতে পারছিস? তোর মা। কাল রাতের পর এরকম হয়ে গেছে।” সুমিত ধীরে ধীরে বলে।
“আর ইউ ক্রেজি! মা ইলিশ মাছ হয়ে গেল!” রেগে চলে যেতে গেল রিঙ্কু।
গামলা থেকে ক্ষীণ স্বরে ভেসে এল অঞ্জুর গলা।
“চলে যাস না মম, আমি সত্যিই তোর মামমাম।” ধড়াস করে বসে পড়ে রিঙ্কু। তারপর ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে।
“কাঁদিস না সোনা।”
প্রথমে অবাক তারপর আরও কেঁদে বলতে থাকে রিঙ্কু,
“তুমি কি করে আমায় ম্যাথস করাবে? কে আমায় খাইয়ে দেবে? চুল বেঁধে দেবে? আমি কি করে বন্ধুদের বলবো যে আমার মাম ইলিশ মাছ হয়ে গেছে!” কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল রিঙ্কু।
কলিংবেলের আওয়াজ শুনে ঘরের দরজা দিয়ে সুমিত মেন দরজা খুলে দেখল মায়াদি, কাজের মাসি। সাংঘাতিক মানুষ। এর কথা ওকে, ওর কথা একে লাগালাগি করে বেড়ায় সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে। ঢুকেই বলল, “বৌদি কই গো? ওঠেনি এখন ও?”
“না, ওর শরীর খারাপ। তুমি ওকে ডেকো না। আগে চা করো।” সুমিত বলে দিয়ে বাথরুমে ঢোকে। মাথার জট ছাড়াতে হবে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হবে। কিন্তু কি করে? মায়াদি ওদের খুচখাচ রান্না ও করে থাকে মাঝেমধ্যে। তাই ওকে দিয়ে আপাততঃ চালিয়ে নেওয়া যাবে কিছুদিন। কিন্তু তার পরে? চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে দিতেই মায়াদির চিৎকার কানে আসে।
“ও মা গো! তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়েছে? শোবার ঘরে কেউ মাছ রাখে? আর বৌদি ই বা কোথায়?”
তড়িঘড়ি বেরিয়ে আসে সুমিত, মুখ না মুছেই।
“আরে! তুমি শোবারঘরের ঢুকলে কেন দিদি?”
“মানে! ঝাঁট দেবো না? কি যে বলেন তার কিছু ঠিক নেই গো! আর এই যে এত্ত বড় একটা জিয়ন্ত মাছ, আর সেটা কিনা ইয়াব্বড় একটা ইলিশ, সেটা কাটবে কে শুনি? আমি ছাড়া বৌদির ক্ষেমতা আছে ও মাছ কাটার? আমি ঝাঁট দিয়েই আগে ও মাছ কুটতে বসবো হ্যাঁ। তবে অন্য কাজে হাত দেব।” কথাটা শেষ হবার আগেই রিঙ্কু সাঁ করে ছুটে এসে পাগলের মত গলার শির ফুলিয়ে চিৎকার করতে থাকে, “না, তুমি ওই মাছ কাটবে না। ওটা মাছ নয়, আমার মামমাম। তুমি হাত দেবে না ওতে।” বলে শাসিয়ে এক চোখ জল নিয়ে আবার ঘরে চলে যায়। মায়াদি ঝাঁটা ফেলে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে আবার ঝাঁটা তুলে নেয়। সুমিতের কানে আসে মায়াদি বলছে, “গন্ডগোল, বিস্তর গন্ডগোল! ছোট মেয়েটার ও মাথাটা গেছে গো! আহা! বৌদিটাই বা কোথায় গেল? দাদাবাবু যে বলল তেনার শরীর খারাপ! তা সে কই? গন্ডগোল। বিস্তর গন্ডগোল।”
সুমিত বুঝতে পারল, গোটা পাড়ার কেউ জানতে বাকি থাকবে না আর। মায়াদি রান্নাঘরে যেতেই ফোন লাগল সুমিত শালাকে। শ্বশুর শাশুড়ি বুড়ো হয়েছেন, হঠাৎ করে এরকম কিছু শুনলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তাই শালা।
“ভাই দীপু, খুব বিপদে পড়ে গেছি। একটু আসতে পারবে?”
“কেন সুমিত দা? কি হয়েছে? এখন ও অফিস যান নি?”
“না ভাই, তুমি চলে এসো, আর হ্যাঁ। বাবা মায়ের সাথে কোন আলোচনা করতে যেও না, পারলে কুমকুমকে নিয়ে এসো।” কুমকুম শালার বৌ। ফোন কেটে দিল সুমিত। দেখা যাক কোন রাস্তা বেরোয় কি না।
আধ ঘণ্টা হয়ে গেল শালাবাবু সস্ত্রীক এসেছেন। এসে অবধি দুজন প্লাস্টিকের গামলার সামনে বসে আছে। মুখে চিন্তার আঁকিবুকি। ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে অঞ্জু। সুমিত সে কথা স্পষ্ট বুঝলেও ওরা কিচ্ছু বুঝতে পারেনি। রিঙ্কু এসেও ওদের কনভিন্স করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওরা কেমন যেন ভ্যাবলা ব’নে গেছে। অনেকক্ষণ পরে সস্ত্রীক বলে ওঠে, “আপনাদের শরীর আই মিন মানসিক কিছু সমস্যা হচ্ছে জামাইবাবু। আমার চেনা ডাক্তার আছে একজন, মানস ঘোষ, দেখাবেন? আমি নাম লিখিয়ে রাখবো। আজ আর অফিস যাবার চেষ্টা করবেন না। আমি দেখছি কি করা যায়। দিদি রাগ করে বোধহয় কোন বান্ধবীর বাড়ি গেছে। ওর মাথা গরম জানেন ই তো। তাবলে বিয়ের এত বছর পরে কেউ এরকম কান্ড কারখানা করে!”
শালাবাবু চলে গেল জ্ঞান দিয়ে। এর মধ্যে প্রতিবেশী দুজন খোঁজ নিয়ে গেছে রিঙ্কুর। খুব ভদ্রভাবে বলেছে,” কোন দরকার লাগলে বলবেন, আমরা সবাই পাশে আছি। কোন চিন্তা করবেন না।”
বিকেলে আজ মায়াদি ডুব মেরেছে। কারণটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বৌদি কে দেখতে পেল না বলে নাকি বাপ বেটি দুজনেরই মাথার গন্ডগোল ভেবেছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সারাদিন ধরে অঞ্জু প্রায় কিছুই খায়নি। কয়েকটা ভাতের দানা, মুড়ি জলে ফেলে দিতে তারই দু একটা ঠুকরে খেল। দুপুরে অনেকক্ষণ মেয়েটা গামলার পাশে বসে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে আর কেঁদেছে। এখন সত্যিই খুব ভয় ভয় করছে সুমিতের। যদি আর না ফেরে অঞ্জু! কেন যে ইলিশ মাছ আনতে গেল। ওই নিয়েই রাগারাগি আর তারপর এই কান্ড। এখন কি করে যে আবার আগের সংসার ফিরে আসবে কে জানে? ওর এত অপছন্দের মাছ না আনলেই ভাল ছিল। দোষটা শুধু তারই। আর কি আশ্চর্য, তারা দুজন ছাড়া আর কেউ অঞ্জুর কথা শুনতেই পাচ্ছে না! এটা কেন হচ্ছে সেটাও বোধগম্য হচ্ছে না সুমিতের। এরকম থাকলে কতদিন আর বাঁচানো যাবে অঞ্জুকে।
রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে রিঙ্কুকে সঙ্গে নিয়ে আজ শুল সুমিত। এমনিতে রিঙ্কুর ক্লাস ফাইভ থেকে একা শোবার অভ্যেস তৈরী করা হয়েছে। কিন্তু বেচারা মায়ের জন্য যেভাবে ভেঙে পড়েছে ওকে একলা রাখতে সাহস হলো না সুমিতের। অনেক রাত। বাইরের জানালা দিয়ে আকাশের টুকরো ছবি চোখে পড়ছে। মেঝেতে গামলায় অঞ্জু মাঝে মধ্যেই ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করছে। ইলিশের কি ঘুম আসে? কে জানে!
“এই জানো! তোমাকে একটা কনফেশন দেবার আছে। অনেক আগেই দেওয়া উচিত ছিল, পারিনি। আমি আসলে তোমাকে মনে মনে অপছন্দ করতাম, আমার চোখে তুহিনদা ছাড়া আর কোন পুরুষের অস্তিত্ব ছিল না। জানি বোকামো। তাও, নিজেকে রোধ করার ক্ষমতা আমার ছিল না, তাই নিজের ওপরেই রাগ হতো সবথেকে বেশি। তুহিনদা হয়তো আমার সম্বন্ধে কোনোদিনই কিছু ভাবেনি। আমরা দু-বোন ওকে নিয়ে স্বপ্ন বুনেছি। বোন সামলে নিতে পেরেছে, আমি পারিনি। তাই ইলিশ মাছের ওপর ঘৃণা, রাগ দেখিয়ে নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করতাম। ঘৃণা সত্যিই এসেছিল, তাই বোধকরি ভগবান শাস্তি দিলেন, আমিই ইলিশ মাছে রূপান্তরিত। এভাবে তো বেশিদিন বাঁচবো না, হয় আমাকে মোহানায় ছেড়ে দিতে হবে নয় মরতে হবে। আমি নদীতে সন্তানের জন্ম দিতে আসি, আমার আসল টান যে সমুদ্রের দিকে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে তোমাকে, রিঙ্কুকে আমি সবথেকে বেশি ভালবাসি। সমুদ্রের দিকে যাওয়ার নেশা আমার নেই। আমার নদীই ঘর। শুনছো?
সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে দু-কাপ চা করে এনে অঞ্জুকে ঠেলে তুলে সুমিত বলল, “এই নিন ম্যাডাম, আমার হাতের স্পেশাল চা। ভাত চাপিয়ে দিয়েছি। তুমি ধীরে সুস্থে উঠে রান্নাঘরে যেও। গোটা গায়ে ব্যথা নিয়ে অঞ্জু চা নিল। সামনের গামলায় চোখ গেল, সরিয়ে নিল। সামনের আয়নায় নিজেকে পুরো মানবী রূপে দেখতে পেল। পাশে ছোট্ট রিঙ্কু অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আহা, ঘুমোক। সুমিত চা খেয়ে দাড়ি কামাচ্ছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। তার মানে কি ও কাল রাতে কিছু শোনেনি? যাক বাবা, বাঁচা গেল। তবে বোধহয় এই স্বীকার করার প্রয়োজন ছিল। মনের মধ্যে কতোদিন একটা সাগর পুষে রাখা যায়?
অসম্ভব সুন্দর গল্প। অঞ্জুর মনে জমে থাকা যে কষ্ট ওকে ইলিশবিমুখ করেছিল ইলিশরূপী অঞ্জু ওকে সেই কষ্ট থেকে মুক্তি দিল। সার্থক নামকরণ।
অনেক ধন্যবাদ আর শুভেচ্ছা জানাই
অনেক দিন পর এক নিঃশ্বাসে একটা গল্প পড়লাম। খুব ভালো লাগলো।
প্রাপ্তি আমার। অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা