বয়েস যতই বাড়ুক না যাদের মনের বয়স বাড়ার কোন লক্ষণ নেই তারা শীতকাল এলেই খুশি হয়। শৈশবে শীত এলে রঙিন সোয়েটার, রঙিন মোজা, রঙিন মেলা, চিড়িয়াখানার পশুপাখিদের রঙিন বর্ণময় হাতছানি। শৈশবের শীত আর কৈশোরের শীত আলাদা। কৈশোর এলেই শীতকাল মানে চড়ুইভাতি। সে নিজের বাড়ির উঠোনে হোক, বা ছাদে, বা বাগানে। একদল বন্ধু মিলে নিজেরা উনুন তৈরি করে মাংস ভাত বা নিদেনপক্ষে ডিমের ঝোল ভাত। না, বাড়ির কোন মা কাকীমার হস্তক্ষেপ তাতে থাকবে না। থাকবে না কোন খবরদারি। নিজেরা নিজেদের মতো করে রান্নাবান্না করে খাওয়া দাওয়া। সে যেমনই হোক।
এই যে মাটির উনুন তৈরি করে চড়ুইভাতি, এটা হত ষাটের দশকের শেষে। সত্তরের পরের পর্বে তোলা উনুন, স্টোভের ব্যবহার শুরু হল। সঙ্গে আশা, লতা, কিশোরের পুজোর গান মাইকে তারস্বরে বাজত। কিন্তু কানে একটুও লাগত না। কারণ গানের কথা, গানের সুর, গায়কী সবই ছিল অসাধারণ। বরং যত জোরে বাজত, ততই আরও দূর দূর সে গানের রেশ পৌঁছে কোন এক ছাদের আলসেয় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েকে আরও উদাস করত। বা “বেশ করেছি প্রেম করেছি” আশা ভোঁসলের এই গানের সঙ্গে তার মন অসম্ভব কোন একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেলত, যেটা কোনোদিন বাস্তবায়িত হবেনা।
“ডাক দিয়ে বলে রাবণ/যেমন আউস তেমনি আমন।”

অগ্রহায়ণ মাসে বাড়ির কোন একটি ছেলে স্নান সেরে ধুতি পরে একটি কুশকাঠি পুঁতে দেবে বাড়ির সারগাদায় আর একটি পুঁতবে নিজেদের জমিতে। আর মুখে বলবে — “ডাক দিয়ে বলে রাবণ /যেমন আউস তেমনি আমন।” নতুন ধানের আবাহনী। ক্ষেত্রলক্ষ্মীকে আমন্ত্রণ জানানো বাড়ির পুরুষের কাজ। সেই রাবণের আমল থেকে শুরু বোধহয়। বাড়ির কোন নারীর এই আবাহনে অংশ নেবার কথা জানা যায় না। আমাদের দেশের বাড়িতে আমার ঠাকুমা আমার সেজদাকে দিয়ে এটি করাতেন। এই ডাক পেলে তবে ক্ষেত্রলক্ষ্মী ধানে সম্পদে ভরাবেন। তারপর নতুন ধানে নবান্ন পালন। নতুন চাল ও নতুন গুড় দিয়ে পরমান্ন।
ষাটের দশকের গোড়ায় অনেক বাড়ি ছিল, যেখানে একটি রেডিও ছিল বিলাসিতার নামান্তর। তাই অনুরোধের আসর শোনার জন্য দুপুরবেলা সমস্ত মেয়ে মহিলার এক বাড়িতে জড়ো হওয়া যে বাড়িতে শুধু একটি রেডিও আছে। শীতের দুপুর মানেই মহিলামহল। রোদে পিঠ করে বসে উল কাঁটা দিয়ে একটার পর একটা সোয়েটার বোনা, কারো হাতে আসন আর ছুঁচ। ফোঁড় তুলে দেদার নক্সা। একটি আসনেও মেয়েরা বসত না কিন্তু। সব পাট করে গোছানো থাকত বাড়ির পুরুষদের জন্য। মেয়েদের জন্য বরাদ্দ ছিল ওই পিঁড়ি। শীতে সেটাও অবশ্য খারাপ নয়, হিম ঠান্ডা মেঝের থেকে।
তারও আগের দশক ধরলে রোদে পিঠ দিয়ে কেউ একজন রামায়ণ বা মহাভারত সুর করে পড়ত, মা জেঠি কাকিরা কাঁথায় ফোঁড় দিতে দিতে শুনতেন। গ্রামে শীত পড়ত জব্বর। কিন্ত বেশির ভাগ মহিলার গায়ে একটি চাদরও জুটত না। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের কথাই বলছি। একটা শাড়িকে চারভাঁজ করে চাদরের আকারে গায়ে আদর করে জড়িয়ে নেবার আর এক নাম শীতকাল।
শীত মানেই শুধু আনন্দ নয়। দুঃখও ছিল। এখনও আছে। তবে তখনকার মানুষ ওসব গায়ে মাখতেন না। তাই দুঃখের মধ্যেই সুখবোধ নিহিত থাকত। যেমন ওই পাশের বাড়ির রেডিওর অনুরোধের আসর বা দুপুরের নাটক বা মাইকের ভেসে আসা গানের কলি। ওতেই মুগ্ধতা। ওতেই বেঁচে থাকা।

শীতের দুঃখ, সুখ না ঘেঁটে এবার আসা যাক রসে। মানে খেজুর রস। যেটি না থাকলে শীত বৃথা কেটে যেত। কোন রসবোধ থাকত না। গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, যার য’টি খেজুর গাছ, সেগুলি গুনতি করে জমা নিত পাসুইকর। চুক্তি হত গাছ প্রতি কয়েক কেজি গুড় আর এক আধ কলসি রস গাছের মালিক পাবে, বাকি সব রস পাসুইকর নিয়ে যেতে পারবে। না কোন টাকা পয়সা নেওয়া হতো না তখন। বিকেলে ‘খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন’ করে খেজুর গাছের পাতার গোড়ার দু-পাশ থেকে চেঁছে নিয়ে ত্রিভুজের মত করে কেটে ঠিক মাঝখানে একটা কঞ্চির সরু নল ঢুকিয়ে দেওয়া হত কলসি পর্যন্ত। সারা রাত ধরে রস ফোঁটা ফোঁটা করে কলসি ভরে উঠবে। সেই রস ভোরে পেড়ে নিয়ে গুড়ের কারিগরের কাছে জমা হবে। অনেক সময় রস যে নামায়, সেইই গুড় তৈরি করে।
আমাদের দেশ বর্ধমান। সেখানে দেখেছি হাড়িপাড়ায় খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে গুড় তৈরি করা হত। সমস্ত রস একটি বিরাট কড়াইয়ে ঢেলে একটা মস্ত ডাবু হাতা দিয়ে নেড়ে নেড়ে প্রথমে তৈরি হবে নলেন গুড়। অর্থাৎ ঝোলা গুড়, যেটি পিঠেতে বা রুটিতে মাখিয়ে খাওয়া হয়। এখন আবার কোলকাতায় শুরু হয়েছে আইসক্রিমে গুড় ঢেলে দেওয়া। সেটিই এখন কেতা। গ্রামের মানুষ দেখলে নিশ্চয়ই হাসবেন। কিন্তু কেতা আছে বলেই না কোলকেতা।
ওই ঝোলা নলেন গুড় রাখা হবে ছোট ছোট কলসিতে। মুখটি মুকুটি দিয়ে আটকানো থাকবে, তারপর যাবে বাজারে, শপিং মলে।
এবার গুড় নাড়তে নাড়তে ক্রমে রঙ পাল্টে সোনালী বর্ণ ধারণ করবে, তখন মাটিতে ছোট ছোট বাটির আকারে অনেক গর্ত করে রাখার ওপরে নতুন বা কাচা কাপড় পেতে দিয়ে ডাবু হাতা করে গুড় সেই মাটির মধ্যে ঢেলে দেওয়া হবে। তার ওপর আবার একটা কাপড় চাপা দিয়ে দেওয়া হবে যাতে ধুলোবালি না পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জমে উঠবে সোনালী পাটালি। ঠিক বাটির মতন। আরও বড় পাটালির জন্য ব্যবহার করা হয় বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র। তবে আমার বড় পাটালির থেকে ছোট ছোট বাটির মত গুড় বেশি পছন্দের।
এত গেল গুড় কাহিনী। রসের আরও একটি মাহাত্ম্য আছে। যেটি ভোরবেলা না নামিয়ে দুপুর পর্যন্ত গেঁজিয়ে নামানো হয়। তাল গাছের রস থেকে যেটি আরও ভাল হয়, খেয়ে ব্যোম হয়ে থাকা যায়। সেটির নাম তাড়ি। খেজুর রসেও গেঁজিয়ে ওরকম কিছু একটা তৈরি হয়, যেটির নাম অধমের জানা নেই। নলেন গুড়ের থেকেও গেঁজানো রসের স্বাদ বেশি কিনা সেটা এ জন্মে আর জানা হলনা। পরের জন্মে দেখা যাবে। যদি ততদিন একটিও খেজুর বা তালগাছ অবশিষ্ট থাকে তো।

এবার শীতের আসল মজা পিঠেপুলির কথায় আসা যাক। মনে পড়ে, শৈশবে মা জেঠিমারা পৌষসংক্রান্তির দিন রাত থাকতে উঠে রান্নাঘরে পিঠে তৈরি করতেন। সমস্ত পিঠে ওই একদিনই হত। এখন যেমন ছোট ছোট পরিবারে অল্প অল্প করে সারা শীত জুড়ে পিঠে, পাটিসাপটা, মটরশুটির কচুরি চলতেই থাকে, তখন কিন্তু যা হবে একদিনেই হবে। কারণ বড় পরিবারে অনেক লোকজন। রোজ কোন জিনিস নিয়ে মেতে ওঠা সম্ভব ছিলনা। তাই যেদিন হতো সেদিন সত্যিকারের পার্বণ হয়ে উঠতে সময় নিত না। সেদ্ধ পিঠে, ভাজাপিঠে, দুধপুলি, আস্কেপিঠে, গুড়পিঠে, রসপিঠে, সরুচাকলি এগুলো বিশুদ্ধ বর্ধমানের পিঠে। এছাড়া ছানার মালপোয়াও বাড়িতে তৈরি করা হয় এই শীতকালেই। কি মুখের ভিতরটা রসে টইটুম্বুর হল কিনা!
আবার প্রথম যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেটাতে ফিরে আসা যাক। ওই বয়েস যাদের বাড়েনা তাঁরা শীতে কাবু হয়ে ও কাবু হন না। তাঁদের ঠান্ডা লাগলেও তাঁরা এই শীতে কুলফিমালাই খাবেন। আইসক্রিম চেটে চেটে খাবেন। আর এই শীতে যারা বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণ পাচ্ছেন না, বা পেয়েছেন, তাঁরা যখন দূর থেকে শুনতে পান “পাল্কিতে বউ চলে যায় হায়রে! শরমে মন ভরে যায়!” তখন বাড়ির লোকজনকে লুকিয়ে ঠিক একটু ধিনিক ধিনিক নেচে নেন। বয়স কি শীতকালে বেশ একটু কমে যায় না?
গূঢ় (গুড়) তথ্য সহায়তা : পার্থসারথি ভট্টাচার্য