জয়নগরের মোয়ার খ্যাতি তার পাশের এলাকা মজিলপুরের খ্যাতিকে যে কিঞ্চিৎ ম্লান করে দিয়েছে একথা মানতেই হবে। কিন্তু দিনকাল আগে এমন ছিল না। জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে জয়নগরের মোয়ার সঙ্গে পাল্লা দিত মজিলপুরের মাটির পুতুল। এখন অবশ্য সেই খ্যাতির দিন গিয়েছে। এখন মজিলপুর স্রেফ জয়নগরের পাশে মুখ লুকিয়ে থাকা একটা সাধারণ এলাকা। অথচ মজিলপুরের পুতুলের ঐতিহ্য প্রায় ২০০ বছরের পুরনো।
সতেরো শতকে আদিগঙ্গার মজা গর্ভে জনবসতি গড়ে উঠেছিল বলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই জায়গাটার নাম মজিলপুর। মজিলপুরের পুতুল বলতেই মনে পড়বে মেলা আলো করে বিরাজ করা আহ্লাদী পুতুল, বাবু পুতুল, বেনেবউ পুতুল আর নানাধরণের পশুপাখির পুতুলের কথা। বাবু পুতুল তো নিছক পুতুল নয়, তার মধ্যে ধরা আছে বাংলার বাবুদের কৃত্রিমতা ও ঔদ্ধত্যের প্রতি মজিলপুরের পুতুল শিল্পীদের ব্যঙ্গ।

মজিলপুরে পুতুলশিল্প গড়ে ওঠার একটা ইতিহাস রয়েছে। এখানকার জমিদার দত্ত পরিবার এসেছিলেন ওপার বাংলার যশোর থেকে। তাদের এক পেয়াদার নাম ছিল কালীচরণ। কালীচরণের আরেকটা গুণ ছিল মাটির পুতুল ও দেবদেবীর মূর্তি বানানো। তারই উত্তরপুরুষ হরিনাথের হাত ধরে মজিলপুরের পুতুলের এক আলাদা ঘরানা তৈরি হল। শম্ভুনাথ দাসের আমলে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

এখন মজিলপুরে দেখা যায় একখোলা এবং দুখোলা ছাঁচের পুতুল। তাড়াতাড়ি বানানোর জন্য শিল্পীরা এই কাজ করেন। ছাঁচে বানানো পুতুল হলেও মজিলপুরের পুতুল অন্যান্য জায়গার পুতুলের থেকে আলাদা। তার গড়ন নিটোল এবং চোখ দুটিতে কালীঘাটের পটের প্রভাব স্পষ্ট। গোলগাল গড়ন এবং টানা টানা চোখ এই পুতুলের বৈশিষ্ট্য। এই চোখকে নিমপাতা, বাঁশপাতা এবং পটলচেরা চোখ বলা হয়। তবে হাতে বানানো পুতুলও আছে। যেমন লৌকিক দেবদেবী, মানিক পীর, আটেশ্বর, দক্ষিণেশ্বর, বনবিবি, দক্ষিণরায়, বারা ঠাকুর ইত্যাদি। এর পাশাপাশি রয়েছে রাধাকৃষ্ণ, কালীয়াদমন, জগদ্ধাত্রী, গনেশ জননী ইত্যাদি পুতুল।

শম্ভুনাথের ছেলে মন্মথনাথ পুতুল তৈরির জন্য পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। আড়াইশো বছর ধরে এই পরিবার পুতুল তৈরির এই ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে চলেছেন। কিন্তু এই পরিবারের সদস্যরা প্রয়াত হওয়ার পর তাদের আট পুরুষের এই ঐতিহ্যবাহী পুতুল শিল্পের অবস্থা কি হবে তা কেউ জানেন না। মেলা, রথ, ঝুলন, জন্মাষ্টমী উৎসবের সময় রাজ্যের নানা জায়গায় এই পুতুলের বিক্রি খুবই ভালো। কিন্তু উপযুক্ত কারিগরের অভাবে এই পুতুলের ঐতিহ্য বিপন্ন। শম্ভুনাথ দাস নতুন প্রজন্মকে এই পুতুল তৈরির কৌশল শিখিয়ে যেতে আগ্রহী। এব্যাপারে কোন প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিলে বাংলার এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পটি আবার সজীব হয়ে উঠবে।