আজ মাকড়ি সপ্তমী তিথি। বসন্ত পঞ্চমী বা সরস্বতী পুজোর দু-দিন পরে আজকের দিনটিও বড় পবিত্র। শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম প্রধান শিষ্য, আচার্য অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মতিথি।
ঐ দিনটি মাকড়ি সপ্তমী বা বিশেষভাবে কান বেঁধানোর দিন বলে পঞ্জিকাতে কেন ধার্য করা হয়েছে জানা নেই। তবে মাঘের শীত এবং শীতের শিশির যে সদ্য বেঁধানো কচি কানের ঘা শুকোনোর উপযুক্ত সময়, সেটা নিশ্চিত।
এহেন মাকড়ি সপ্তমীর দিনে এক পঞ্চমবর্ষীয় বালিকার বাড়িতে বড় আয়োজন। বাড়ির প্রথম একমাত্র কন্যা, তার কর্ণবেধ অনুষ্ঠান।

পুরোহিত মহাশয় সূর্য পূজার আয়োজন করছেন। মেয়েটির দিদিমণি (ঠাকুমার মা), ঠাকুমা-ঠাকুরদা, বাবা-মা অতিথিদের আপ্যায়নে রত। আহ্লাদী পঞ্চমবর্ষীয়াটিও গদগদ। তাকে ঘিরেই অনুষ্ঠান, আবার সাজুনে মেয়ের কানে গহনা পরারও প্রবল ইচ্ছা। মামাবাড়ি থেকে নতুন পোশাক, নতুন বাসন, ছোট্টছোট্ট লাল পুঁতি দেওয়া দুটি ছোট সোনার মাকড়িও এসেছে। সেটি দিয়েই কান বেঁধানো হবে।
যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে সময় সোনা অথবা রূপোর ছুঁচলো মাকড়ি দিয়ে অথবা ছুঁচ আগুনে পুড়িয়ে জীবাণুমুক্ত করে সুতো সহযোগে কান বিঁধনো হত। ডিস্পেনসারীতে কান বিঁধনোর আগে একটু ইথার দেওয়া হত ব্যথা উপশমের জন্যে। ছুঁচ-সুতোর পরের পর্যায়টি ছিল শুকনো নিমকাঠি। তারপরে যার জুটত, তার কানে সোনার দীর্ঘশ্বাসের মত দুটি পাতলা মাকড়ি। কানবালা, ঝুমকো, পাশা, কানফুল এসব যৌবনের জন্যে তোলা থাকত বা বলা ভালো বিয়ের পর। মফস্বল শহরে সে সময় বিউটি পার্লারের অস্তিত্বই ছিলনা বন্দুক দিয়ে কান ফোটানো তো দূরস্থান!

সেদিনের কর্ণচ্ছেদের অনুষ্ঠান শুরু হল জবাফুল, দূর্বাঘাস, চাল ইত্যাদি মাটির খুরিতে সাজিয়ে সূর্যের দিকে যথাসম্ভব হাত উঁচু করে অর্ঘ্য নিবেদন করে। পুজো সম্পন্ন হবার পর বালিকার ন-ঠাকুমা এগিয়ে এলেন। এর আগে তিনি অনেক বালিকারই কানে গয়না পরানোর ভার নিয়েছেন। তাই পারদর্শী ঠাকুমার হাত দিয়েই মেয়েটির কর্ণছেদ হবে। প্রথমে লাল ওষুধ বা মারকিউরোক্রোমের দুটি দাগ দিয়ে কানের লতিতে চিহ্নিত করা হল। মেয়েটির একহাতে দেওয়া হল কলা, একহাতে সন্দেশ। কলার কামড়ের সঙ্গে একটি কান বেঁধানো হবে। যখন সন্দেশে কামড় দেবে তখন অপর কানটি।

সব আয়োজন সম্পূর্ণ তো হল, কিন্তু হা হতোস্মি! কানের লতিতে এতটুকু মাকড়ি গেছে কি না গেছে, কাঁদুনে মেয়ে হাত পা ছুঁড়ে, চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করল। যেন মাকড়ি তার কানভেদ করে সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছে গেছে! এক কানে সোনার মাকড়ি অর্ধপ্রবেশ করে ক্ষান্ত রইল। হাতের কলা, সন্দেশ কোথায় ছিটকে পড়ে পিঁপড়ে ভোগ্য হল। সব দোষ গিয়ে পড়ল বেচারী ন-ঠাকুমার ওপর। তিনি অপ্রস্তুত। একরত্তি মেয়ের কান্নায় মেয়ের ঠাকুর্দা, বাবা বড়ই অসহায় বোধ করতে লাগল। মেয়ের ঠাকুমা বিমর্ষ হয়ে পড়ল এত আয়োজন পণ্ড হল দেখে। মেয়ের শান্ত অথচ রাগী মা-টি অবশ্য চুপচাপই ছিল আর রাগে ভেতরে ভেতরে গজরাচ্ছিল। সবাই না থাকলে সে দিত দু-ঘা বসিয়ে এরকম আউপাতালি মেয়ের পিঠে। সে মাকড়ি অর্ধবিঁধিত অবস্থায় কানে ঝুলেই রইল। সেখানে কারোর হাত দেবার জো ছিল না। সেটি কখন ঘুমন্ত কন্যার কান থেকে বালিশে স্থানান্তরিত হয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কর্ণবেধ সেদিন বালিকার চিৎকারে কর্ণভেদ অনুষ্ঠান হয়ে গেল!

উপসংহার : আহ্লাদী মেয়েটির তরুণী মা দ্বিতীয় বার সন্তানসম্ভবা ছিল তখন। মেয়েটির বাবা প্রসবকালে তাঁর স্ত্রীকে বলে দিয়েছিলেন, এবারে মেয়ে হলে হাসপাতাল থেকেই যেন কান বিঁধিয়ে আনা হয়। আদুরে মেয়ের সফল কর্ণচ্ছেদ অবশ্য সফল হল বেশ কিছুদিন পরে। শ্যাম কম্পাউন্ডার দাদু, বালিকাটিকে কোলে বসিয়ে, গল্পচ্ছলে সেই কঠিন কাজটি অতি সহজে সম্পন্ন করলেন কোনো তিথি নিয়ম ছাড়াই। আর ভবিষ্যত জীবনের জন্যে সে মেয়ের কানদুটি পরিপক্ক হয়ে গেল সোনা এবং শোনা দু-য়ের ক্ষেত্রেই।
তোমার লেখায় সব সময় নতুন চমক। আমরা তোমার গুণমুগ্ধ পাঠক হা করে বসে থাকি তোমার থেকে লেখা পাবো বলে।
যেন কোন এক সুদূর অতীত থেকে একটা ছবি ভেসে এল।
চিত্রভানু,মন্দিরা দুজনকেই অফুরন্ত ভালোবাসা