কলকাতার রাস্তায়, মাঠে চোখেপড়ে বকুল, নিম, কদম, শিরীষ, আম, জাম, কাঁঠাল, দেবদারু বট, অশ্বত্থ এবং আরও কতকী গাছ। আর কলকাতা যখন হাতে-পায়ে বাড়তে বাড়তে প্রায় সুন্দরবন ছুঁতে চলল, তখন তার পিন কোডের ভেতর ঢুকে পড়ে সুপারি, বাঁশ, আঁশফল, লিচু, ফলসা — আরও নানারকম সবুজের মায়া।
ইদানীং বনবিভাগ, কলকাতা পুরসভা থেকে গাছ বিতরণ করে ও গাছ বসিয়ে মানুষকে সবুজে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফুটপাথে পাওয়া যাচ্ছে ফুলের গন্ধ। তারই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাখিদের কলতান।

মানুষ তার নিজের অজান্তেই যে পরিবেশ ধ্বংস আর বৃক্ষ নিধনের খেলায় মেতেছে, তার খেসারত দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকেই। হিসাববিহীনভাবে জঙ্গল কাটার ফলে ভূমিক্ষয়, বন্যা আর না নেমে আসা বৃষ্টি সভ্যতার শিকড় ধরেই টান দিয়েছে। প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী ভৌত পরিবেশ ঠিক রাখতে গেলে প্রাণীদের তুলনায় অন্তত ৯০ গুণ গাছপালা থাকা উচিত। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গাছপালা যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি করে থাকে তা হলো —
১) বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমতা ঠিক রাখে।
২) নাইট্রোজেন চক্র বজায় রাখে।
৩) পরিবেশকে ধূলোবালি মুক্ত করে।
৪) শব্দদূষণ আটকায়।
৫) বন্যা ও খরা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখে।
৬) জমির ক্ষয় রোধ করে।
৭) জলদূষণ হতে দেয় না।
কলকাতায় যে হারে মানুষ বেড়েছে, সেই হিসেবে খোলা জায়গা, পার্ক বাড়েনি। লণ্ডনের মতো আধুনিক শহরে মাথাপিছু খোলা জমির থাকার হিসেব দুশো পঞ্চাশ বর্গফুট। ঝড় মাঝে মাঝেই কলকাতার বনস্পতিদের মৃত্যু ডেকে আনে। ডালপালা ছড়ানো প্রাচীন মহীরুহটির মুখ থুবড়ানো দশা থেকে অরণ্যের হাহাকার বুকে বাজে। এ ছাড়া বিগত ৪-৫ দশক আগে ময়দান অঞ্চলে পুরনো গাছ কেটে ফেলার স্মৃতিও আছে। এই তো পঞ্চাশ বছর আগের স্মৃতি — একের পর এক বৃক্ষ-প্রপিতামহরা মানুষের শিকার হয়েছে। এছাড়া বিগত দু’বছর আগেই কলকাতার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে আমফান ঝড়। সেই ঝড়ে শুধু কলকাতাতেই ১৫ হাজার গাছ নষ্ট হয়েছে। তার পরিবর্তে কলকাতা পুরসভা বৃহৎ কলকাতা জুড়ে ৫০ হাজার গাছ লাগিয়েছে ঠিক কথা, কিন্তু সেই ক্ষতে কি প্রলেপ দেওয়া গেছে?

এছাড়া কলকাতা পুরসভা বর্তমানে গাছ প্রতিস্থাপন করে উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সাহায্যে এর ফলেও অনেক মৃতপ্রায় গাছ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তাদের শুকনো ডালে উঁকি দিয়েছে সবুজ কিশলয়। এই সব কাজ সম্ভব হতো না যদি এই শহরের মেয়র ফিরহাদ হাকিম সবুজায়নের প্রতি এতটা যত্নশীল হতেন। তিনি বারবার বলেছেন, “পরিবেশ রক্ষা না করতে পারলে মানুষের জীবন থাকবে না। কলকাতা পুরসভার এত কর্মকাণ্ডের মধ্যেও আমি মনে করি গাছ লাগানো, প্রকৃতি বাঁচানো এবং পরিবেশ নিয়ে যে লড়াই তার জন্য সচেতনতা বাড়ানো সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তার কারণ প্রকৃতি মানুষকে জীবন দান করে। পরের প্রজন্মের জন্য সবুজ প্রকৃতি রেখে যেতে হবে আমাদের। তাই প্রকৃতি তথা পৃথিবীকে বাঁচানো আজ একান্ত প্রয়োজন।পরিবেশ দূষণ আজ আমাদের কাছে ভয়াবহ এক সমস্যা হয়ে উঠেছে। কলকাতা পুরসভা পরিবেশ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আশা রাখছি কলকাতা ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন’ সিটি হিসেবে খুব তাড়াতাড়ি গড়ে তুলতে পারব। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্ন এটি।”
গাছ মানুষকে দেয় বর্ষণ, দূষণমুক্ত বায়ু, ছায়া, শীতলতা, কাব্য, ফল, ফুল। এটুকু মনে রাখার সময় বোধহয় এসেছে। প্রতিটি অঞ্চলে যেখানে একটু মাটি আছে, সেখানেই উড়িয়ে দেওয়া যাক সবুজ পতাকা। আমরা দৃষ্টিনন্দন ছায়ায়, শীতলতায়, সবুজে ফিরে যাই।

কোনও বর্ষার বিকেলে শহরের কোনও পার্কে কাঠগোলাপ গাছটি যখন অকাতরে ফুল এবং গন্ধ বিলিয়ে অক্লান্ত থাকে, শরৎ আসি কি না আসি সময়ে গঙ্গার ধারে শিউলি গাছটি, তার হলুদ বোঁটাওয়ালা সাদা ফুল অকৃপণভাবে ঝরে পড়ে, কিংবা ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালে এই বর্ষায় যখন কাঞ্চন ফোটে — জীবন আর মৃত্যুকে পাশাপাশি রেখে, তখন মনে হয় আমাদের শহরে প্রাণ আছে।