সেটা ১৯৯৩। তখন মালদা জিলা স্কুলে পড়ি। এইচ্ এস পাশ করেই কলেজে ভর্তি হওয়ার চোরা স্রোত বইতে শুরু করেছে। অন্যদিকে চোরা সঙ্কটও উঁকি দিচ্ছে। কথায় বলে অর্থচিন্তা চমৎকারা। জিলা স্কুলের হোস্টেলেই লুকিয়ে টিউশন পড়াতাম। জানাজানি হওয়ায় শেষের দিকে কিছুদিনের জন্য হোস্টেল ছেড়ে টিউশনি ধরে রাখি। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় বলেছেন, দারিদ্র মানুষের অন্তদৃষ্টি খুলে দেয়। আমারও তৃতীয় নেত্র সক্রিয় হয়ে উঠে। সেখানে মালদা কলেজের হাতছানি আরও তীব্রতা লাভ করে। টিউশন করে পড়া চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে নিঃসঙ্গ মায়ের নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করার বোঝা হাল্কা করার ক্ষেত্রে জেলার ঐতিহাসিক কলেজটির আবেদন আমার কাছে সবে ধন নীলমণি হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে তার আবহসঙ্গীতে মন আনচান শুরু হয়ে গিয়েছিল। যাত্রার কনসার্ট শুনে ছোটার মতো পৌঁছে গিয়েছি কলেজ প্রাঙ্গণে। অবিরাম অনুষ্ঠানের আলোকচ্ছটায় আমার মনশ্চক্ষে কলেজের উৎসবমুখর প্রকৃতি আপনাতেই রবাহূত অতিথির পদ থেকে সরিয়ে ঘরের লোকের আহবানে সবুজ হয়ে ওঠে। সেবছরে কলেজের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষের সূচনা হয়েছিল। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, মালদহ কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৪-এর ১৫ জুলাই। জেলার ‘গৌড়দূত’ পত্রিকার ২৯ জুন সংখ্যায় (১৯৪৪) এজন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানানো হয়েছিল, ‘১৫ জুলাই হইতে কলেজ খুলিবে।’

সেই কলেজের ইতিহাস তখনও আমার অজানা, কিন্তু তার ঐতিহাসিক ব্যক্তিটির সম্পর্কে তীব্র কৌতূহ্ল জেগে উঠেছিল। তিনি দুর্গাকিঙ্কর ভট্টাচার্য, মালদা কলেজের কিংবদন্তি অধ্যক্ষ। তাঁর পরাক্রমশালী ঋজু ব্যক্তিত্বের সোপান বেয়েই মালদা কলেজের বনেদিয়ানা গড়ে উঠেছে। তাঁকে আমি দেখিনি, কিন্তু তাঁর পরশ পেয়েছি লেখায়। কলেজের ম্যাগাজিনের জন্য ছাত্রছাত্রীদের নেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে জানিয়েছেন, অন্যকোনো মনীষী বা মহামানব নন, তিনি লেলিনের সঙ্গে দেখা করায় উৎসাহী। সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ থেকে গান্ধীজির নামও বলা হয়েছিল। তাঁর সেই বলিষ্ঠ প্রত্যয়ী সাক্ষাৎকার আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। যেখানে শিক্ষার সহবতে আপসের দড়ে সড়্গড় হওয়ার কথা উঠে আসে, সেখানে স্বকীয় মনীষায় মেনে না চলার সৎসাহস বিরলপ্রায়। দুর্গাকিঙ্কর সেই বিরল ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন। ব্যক্ত করার সোপান বেয়ে ব্যক্তি হয়ে উঠার আধারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আপনাতেই প্রকাশমুখর।

ব্যক্তিই যেখানে স্বকীয় ব্যক্তিত্বের পরশে প্রতিষ্ঠানের আলোয় পরিণত হয়, সেখানে তার আবেদন এমনিতেই উৎকর্ষমুখর হয়ে ওঠে। আমারও হয়েছিল। কেননা তাঁর সাজানো বাগানের সৌরভ আমাকে ক্রমশ আমোদিত করেছিল। যে-কলেজ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে ধারণ করে নিজেই ইতিহাস সৃষ্টি করে চলে, তার আকর্ষণ তো জেলার ছাত্রছাত্রীদের কাছে অপরিসীম হবেই। উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষার পরেই প্রয়োজনের আয়োজনে সামিল হয়ে মালদা কলেজের সদরে হাজির হয়েছিলাম। এ যেন স্বপ্নপূরণের দোরগোড়া।

সেই কলেজই আরও ২৫ বছর পর ৭৫ও অতিক্রম করে চলেছে । অথচ তার দেহে জরার চিহ্ন নেই, ললাটে নেই বলিরেখা, প্রাণে তার নবযৌবনের সজীবতা। আমাকেও দিয়েছিল নিশ্চিত সাহারা। অথচ তা নাও হতে পারত। ইতিহাস কিন্তু তাই বলে। মালদা কলেজের পূর্বনাম ঠিক হয়েছিল ‘আদিনা ফজলুল হক কলেজ’। সেটি শিবগঞ্জের দাদনচকে হওয়ার কথা ছিল। ভাগ্যিস সেটি মালদহ কলেজ হয়েছিল। তা না হলে আমার জীবনও তো পাল্টে যেত, পড়শিকেও আর পেতাম না। কেননা ইতিহাসনন্দিত জেলার ভালে বিজয়তিলকের মতো তার উজ্জ্বল উপস্থিতি যে আমার অহঙ্কার, আমার জেলার অসপত্ন অলংকার।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
বেশ ভালো লাগলো।অন্যত্র এই কথা লেখক লিখেছিলেন মনে হয় (ফেসবুকেই)।
বেশ ভালো লাগলো আপনার স্মৃতিকথা জানতে পেরে…. ভালো থাকুন স্যার ????
মালদা জেলা মানে মালদা কলেজ। মালদা কলেজ দুর্গা কিংকর ।। আপনার এই নস্টালজিয়া খুব ভালো লাগলো ❤️❤️