কশ্যাং তু মরণাৎ মুক্তি / স্মরণাৎ অরুণাচলে, / দর্শনাদেব শ্রীশৈলে / পুনর্জন্ম না বিদ্যতে।
অর্থাৎ কাশীতে মরলে মুক্তি, স্মরণে মুক্তি অরুণাচলে এবং শ্রীশৈল দর্শনে জন্মান্তর মুক্তি। আজকে বলবো দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের দ্বিতীয় প্রকাশ শ্রীশৈলে মল্লিকার্জুনম স্বামীর কথা। অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ভারতের প্রসিদ্ধ শৈবতীর্থটি অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুল জেলার নন্দকোটুর তালুকে নান্নামালাই পর্বতের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হল মার্কাপুর ৮৫কিমি। সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হল হায়দ্রাবাদ থেকে শ্রীশাইলম অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (APSRTC) বাস ছাড়ে অথবা ট্যাক্সি নেওয়া। মন্দির কমিটির কটেজ এবং ধর্মশালা ভাড়া এখানে পাওয়া যায়।
নান্নামালাই পর্বতের ঘাট পেরিয়ে ঘণ অরণ্যের বুক চিরে কিছু দূরে গেলেই দেখা যায় কৃষ্ণানদী। জনশ্রুতি আছে, শ্রীশৈল পর্বতের উত্তর দিকে কৃষ্ণা নদীর অপর প্রান্তে গুপ্তবংশের রাজা চন্দ্রগুপ্ত পট্টানা রাজত্ব করতেন। একবার তার কন্যা চন্দ্রাবতী সখীদের নিয়ে কৃষ্ণা নদী পার হয়ে শ্রী শৈলে আসেন। এখানকার ঘন অরণ্য ও কলাবনের অপূর্ব সমাবেশে আকৃষ্ট হয়ে এখানেই বসবাস শুরু করলেন। একদিন চন্দ্রাবতী দেখতে পেলেন তার গাভীদের মধ্যে একটি ধবলা গাভী বট বৃক্ষ মূলে দাঁড়িয়ে মাটিতে দুগ্ধপাত করছে। চন্দ্রাবতী সঙ্গে সঙ্গে লোকজন ডেকে স্থানটি খনন করালে একটি শিবলিঙ্গ দেখতে পান। শিবলিঙ্গটিকে মাটি থেকে টেনে তুলতেই তার থেকে আশ্চর্য্য জ্যোতি নির্গত হতে লাগলো।

অভিভূত চন্দ্রাবতী শিবলিঙ্গটিকে সেখানেই প্রতিষ্ঠা করলেন। রাজা চন্দ্রগুপ্ত সেখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করিয়ে দিলেন। প্রত্যেক দিন বনের জুঁই পুষ্প দিয়ে তিনি শিবের পূজা করতে লাগলেন। স্থানীয়ভাবে তেলেগুতে জুঁইফুলকে মল্লিকা নামে ডাকা হয়। তাই এখানে শিব ঠাকুরকে মল্লিকার্জুনম বলা হয়।
চন্দ্রাবতীর পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শিব দর্শন দিয়ে বর প্রার্থনা করতে বললেন। চন্দ্রাবতী প্রার্থনা করলেন, শংকর ভগবান যেন চিরকালের জন্য শ্রী পর্বতে অবস্থান করেন। সেই থেকেই পর্বতস্বামী আজ অব্দি সেখানেই বিরাজ করছেন।
দাক্ষিণাত্য অভিযানকালে আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি মালিক কাফুর তরবারি দ্বারা এই শিবলিঙ্গকে বিকৃত করে বলে এর আরেক নাম বিকৃতাক্ষ। তবে মল্লিকার সঙ্গে অর্জুনের নাম কেন যুক্ত হয়েছে তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেননা। অনেকেই মনে করেন এখানে তৃতীয় পান্ডব অর্জুনের সঙ্গে কিরাতবেশী শিবের যুদ্ধ হয়েছিল এবং সেই যুদ্ধে সন্তুষ্ট হয়ে শিব অর্জুনকে পশুপাত অস্ত্র প্রদান করেন। তবে পুরান মতে এই যুদ্ধ হয়েছিল গাড়ওয়াল হিমালয়ের মানালি গ্রামে। সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত মহাদেবের বিশাল আয়তন ত্রিশুলটি আজও উত্তরকাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে রক্ষিত আছে।

আবার পুরাণমতে, শিব ও পার্বতী তাঁদের দুই ছেলে গনেশ ও কার্তিকের জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছিলেন। দুই ভাইয়ে সেই সময় তর্ক জুড়েছিলেন কে আগে বিয়ে করবেন সেই নিয়ে। শিব বলেন, যে আগে বিশ্ব প্রদক্ষিণ করে আসতে পারবে তারই আগে বিয়ে হবে। কার্তিক তাঁর ময়ূর বাহনে চেপে বিশ্ব প্রদক্ষিণে বেরিয়ে পড়েন। বুদ্ধি করে গণেশ শিব ও পার্বতীকেই সাত বার প্রদক্ষিণ করেন। কারণ, শাস্ত্রমতে নিজের পিতামাতাকে প্রদক্ষিণ করলে ভূপ্রদক্ষিণ করা হয়। শিব বুদ্ধি, সিদ্ধি ও ঋদ্ধির সঙ্গে গণেশের বিয়ে দেন। কার্তিক ফিরে এসব দেখে রেগে গিয়ে ক্রৌঞ্চ পর্বতে কুমারব্রহ্মচারী নামে বাস করতে চলে যান। শিব কার্তিককে শান্ত করতে আসেন। তা দেখে তিনি অন্যত্র চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেবতাদের অনুরোধে তিনি কাছাকাছিই থেকে যান। শিব ও পার্বতী যেখানে ছিলেন সেই জায়গাটি শ্রীশৈলম নামে পরিচিত হয়। শিব অমাবস্যায় ও পার্বতী পূর্ণিমায় কার্তিককে দেখতে আসতেন।
তবে, সাতবাহন রাজবংশের শিলালিপি থেকে জানা যায় মন্দিরটি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে বিদ্যমান ছিল। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা প্রথম হরিহরের সময় আধুনিক সংযোজন হয়ে মন্দিরের কাজ সমাপ্ত হয় রেড্ডি সম্রাজ্যের সময়। বীরশেরোমণ্ডপম (veerasheromandapam) এবং পাতালগঙ্গার ধাপগুলি নির্মিত হয়েছিল সেই সময়ে।

গোটা মন্দিরটি ২ হেক্টর জায়গা জুড়ে রয়েছে এবং প্রবেশের চারটি তোরণদ্বার আছে, যাকে স্থানীয় ভাষায় গোপুরাম বলে। গোটা অঞ্চলটিতে অসংখ্য মন্দির আছে যার মধ্যে মল্লিকার্জুন এবং ভ্রমরাম্বা মন্দির সবচেয়ে প্রাচীণ ও বিখ্যাত। মল্লিকার্জুনম মন্দিরটি পূর্বমুখী। কেন্দ্রের মণ্ডপে বেশ কয়েকটি স্তম্ভ রয়েছে, যেখানে নন্দীকেশ্বরের একটি বিশাল মূর্তি রয়েছে। অনেকই এখানে নারকেল ভেঙে পুজো দেন। এখানে উৎসর্গীকৃত নারকেলগুলির চতুর্দিকে সুতো জড়ানো থাকে, যার স্থানীয় নাম কার্তিক জ্যোতি। দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই আপাদমস্তক কালো পোশাক পরিহিত উগ্র শৈব কেরালিয়ান আয়াপ্পার দল। গর্ভগৃহের মন্দিরে রয়েছেন মল্লিকার্জুন স্বামী। মন্দিরের গর্ভগৃহের দরজাটি রুপোর। উপরে পূর্ণঘট এবং তারও ওপরে পদ্মকোরক হাতে নিয়ে বিরাজ করছেন এক দেবীমূর্তি।
পূজারীরা ভক্তদের আনা পুজোর সামগ্রী নিবেদন করছেন জ্যোতির্লিঙ্গকে। মল্লিকার্জুনের লিঙ্গ বিগ্রহ আকারে ছোট হলেও, কি অসম্ভব তার জ্যোতি! তাঁর দর্শনে দর্শনার্থীদের আনন্দে মন ভরে ওঠে। সন্ধ্যার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ আলোয় ঝলমল করে। মূল মন্দিরের উপরিভাগটি সম্পূর্ন সোনার পাত দিয়ে মোড়া।

এখানে দর্শনের পর দর্শনার্থীরা ভ্রমরাম্বা দেবীর মন্দিরে আসেন। ভ্রমরাম্বা বা ভ্রামরীদেবী ৫১টি শক্তিপীঠের এক দেবী। এটি অষ্টাদশ মহাশক্তি পীঠের অন্তর্ভুক্ত, ভগবান শিব তাঁর সঙ্গে ‘শম্বরানন্দ ভৈরব’ রূপে উপবিষ্ট আছেন। শ্রীশ্রীচন্ডিতে আছে, অরুন নামে এক দৈত্য যখন ত্রিভুবনে ভয়ঙ্কর অত্যাচার শুরু করে দেবী তখন শত শত ভ্রমরের রূপ ধারণ করে বিষাক্ত দংশনের মাধ্যমে অসুর সেনা সমেত অরুনাসুরকে বধ করেন। ভ্রমর বলতে চলতি ভাষায় ভীমরুল বোঝায়। ভ্রমরের রূপ ধারণ করায় তাঁর নাম হয় ভ্রামরী। সেই অসুরের শরীর থেকে নির্গত রক্ত স্রোতে সমস্ত মর্তভূমি ভেসে গেলেও শ্রীশৈলের চূড়াটি শুধু জেগে থাকে। সেই জাগ্রত চুড়ায় দেবী কালিকা মূর্তিরূপ ধারণ করে শ্রী শৈলশিখরে অনন্তকালের জন্য অবস্থান করতে লাগলেন।

ভ্রমরাম্বা বা ভ্রামরীদেবী
দেবীর গর্ভমন্দিরটি খুবই ছোট, নানা রকম নকশা আঁকা পিতলের দরজা। স্বর্ণ সিংহাসনে দেবি কালিকা মূর্তি। দেবীর মন্দিরের পিছনের দিকে দেওয়ালে একটি ছিদ্র আছে, সেখানে কান পেতে শুনলে ভ্রমরের গুঞ্জনের মত গুনগুন সুর শুনতে পাওয়া যায়। এ যেন দেবী মহিমার এক অনন্য প্রকাশ। দেবীর প্রণাম মন্ত্র : —
ওঁ নমো দেবি মহাবিদ্যে সৃষ্টিস্থিতিকারিণি ।
নমঃ কমল পত্রাক্ষি সর্বাধারে নমোহস্তুতে ।।

পাতালগঙ্গায় পুজার ডালি
পুরাণমতে সতী অঙ্গের প্রভাব রক্ষা করার জন্যই এখানে পর্বতের উচ্চস্থানে শিব জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে বিরাজ করছেন। শ্রীশৈলে সতী অঙ্গ যেখানে পড়েছিল সেই জায়গার নাম পাতালগঙ্গা। মল্লিকার্জুন মন্দির পাতালগঙ্গা পর্যন্ত সিঁড়ি নেমে গেছে। পুন্যার্থীরা অনেকেই পাতালগঙ্গায় স্নান করেন। বিশ্বাস করা হয় যে এখানে জ্যোতির্লিঙ্গের সামনে ধ্যানে বসলে স্বয়ং শিবশম্ভু জ্যোতির আকারে দর্শন দেন।
অসাধারণ প্রতিবেদন????????????????????????
Dhonyobad ????