কতটা মনের জোর থাকলে একথা বলতে পারেন একজন মুখ্যমন্ত্রী, যে, একটি ভোট ও যেন নষ্ট না হয়, তিনি জানেন, তিনি জিতেই আসবেন, কিন্তু আত্মতুষ্টিতে ভোগেন না একদম। ইনি হলেন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী।
সবই আপনাকে করতে হবে। কোনো কিছুই বাদ দেওয়া চলবে না। সারা বাংলা তাকিয়ে আছে আপনার দিকে। আপনার জয় হলে সারা বাংলা জিতে যাবে।
কোন দল প্রার্থী দিলো আর কোন দল দিলো না, কোন দল কি ভাবছে — তা একান্তই তাদের ব্যাপার। এখানে প্রার্থী আপনি। বাংলার নিজের মেয়ে। আর কোথাও কোনো প্রশ্নের সুযোগ নেই। কোন দল কি করতে পারবে শেষ পর্যন্ত, আর কারা কি পারবে না আমাদের তা জানার দরকার নেই। আমরা চাই আপনি আসুন। জানাই আছে শেষ পর্যন্ত আপনিই আসবেন। বিধানসভা ভোটের সময় কম চেষ্টা তো করা হয়নি, যাতে আপনার দল হেরে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় তো আপনারই হয়েছে। অনেক যন্ত্রণা, অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করে তো আপনিই জয়ী হয়েছেন। এবারও আপনার জয় হবে। বাংলার মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করে। তারা জানে কেউ থাকুক না থাকুক, আপনি পাশে আছেন বাংলার মানুষের।
বিধানসভায় ২১৩টি আসনে তৃণমূল জয়ী হয়েছিল — এবারে দেখা যাক। অন্য দলের লোকেরাও তো বিধানসভা ভোটের পর বহুবার বহু ভাবে আপনার ছাতার তলায় ফিরে আসতে চেয়েছে, এখনও চাইছে, এর থেকে কি প্রমাণিত হয় না যে, আপনার কাছে বিরোধী পক্ষের অনেকেই আসতে চায়, শুধু নানা কারণে সরাসরি বলতে পারছে না, ঘুরিয়ে বলছে।
নির্বাচন কমিশন ৩০শে সেপ্টেম্বর ভোটের দিন স্থির করে দিয়েছে। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আপনার প্রতিপক্ষ তো বুঝতে পারছেন আপনার ক্ষমতার কথা।
বঙ্গভঙ্গ নিয়ে কিছুদিন চললো। কি লাভ হলো? বাঙালিরা আবেগ প্রবণ হয় তো একটু বেশি। কিন্তু বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু তো আছেই। হয় তো এই বঙ্গভঙ্গের কথা বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চাপে রাখার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার। কত কিছুই তো হলো — এনআরসি, সিএএ, ৩৫৬ ধারা, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি কতরকম ভাবে কত কিছুর প্রচেষ্টা। তবুও শেষ রক্ষা তো হয় নি। হতে পারে নি। বাঙালিদের যতটা বোকা ভাবেন ওরা ততটা বোকা তো এরা নন ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা’র কি দাম তা সবাই জানে।

বিধানসভা ভোটের জয়লাভের পর থেকেই লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে আরও কঠিন। সংঘাত চলছে প্রতিদিন কারণে এবং অকারণে। এক বলিষ্ঠ নেত্রী হিসেবে প্রতিদিন তা সামলে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ভালো করেই জানেন, বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচন এক জিনিস নয়। এবারের বিধানসভা নির্বাচন তো একেবারেই আলাদা বিষয় ছিলো। সে পর্ব চলে গেছে। তবে তিনি বসে নেই। বিরোধী জোটকে, কিভাবে কেমন করে সফল করে তোলা যায়, সেদিকে তার সজাগ দৃষ্টির আভাস আমরা পাচ্ছি। কংগ্রেস এমন একটি দল — যার উপস্থিতি সব রাজ্যেই কম বেশি আছে। তাই এদের সঙ্গে নিয়েই লড়াই করার কথা তিনি বার বার বলছেন। ‘চেয়ার আজ আছে কাল নেই’ — একথা তিনিই বলেছেন।
সকলে মিলে কাজ করলে, সে কাজ সফল হতে বাধ্য। সকলেই যেন রাজনীতি করতে এসে ভুলে না যান — তারা সবাই কিন্তু দেশের মানুষের জন্য মাঠে নেমেছেন বা নামতে যাচ্ছেন। তাই নিজের দলের স্বার্থ যেমন দেখা প্রয়োজন, সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণকেও যেন তারা ভুলে না যান। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গেলে জনগণের মঙ্গলসাধনের চিন্তা যেন সবার আগে স্থান পায়।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ আমার ভারত। বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন দলগুলিকে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ নিয়ে চিন্তা করার দিন সমাগত। তবেই না সম্পূর্ণ হবে সার্বিক উন্নতির চেষ্টা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এই জোট বাধার চেষ্টা যেন সার্বিকভাবে সফল হয় এই শুভকামনা রইলো।
এপর্যন্ত তার সবকটি প্রকল্প জনমুখী এবং সফল। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, দুয়ারে সরকার, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সবই তো জনগণের জন্য। জনগণ কিভাবে এইসব সুবিধা গ্রহণ করছেন — সেটা আমরা সবাই তো দেখতে পাচ্ছি। আমার বাড়ির পরিচারিকা তার দেশের বাড়ি চলে গেলো, কারণ তার গ্রামে দুয়ারে সরকারের তারিখ পড়েছে। তার অনেকগুলো কাজ খুব সহজেই করে নেওয়া যেতে পারে। জিজ্ঞাসা করতেই জানা গেল তাদের মতো অনেকেই গ্রামে গিয়ে তাদের বকেয়া কাজগুলো গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। তাদের খুশি দেখে ভালোই লাগছিল, মনে হলো সরকারের এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার প্রয়াস তো সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। ঠাণ্ডা ঘরে বসে রাজনীতি করার নেত্রী কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন। তিনি জনগণের জন্যই কাজ করেন। একথা তিনি বার বার প্রমাণ করে দিয়েছেন, মহিলারা তো বটেই, রাজনীতির ময়দানে বহু মানুষ তাকে মনে রাখবে শুধু এই জন্যে।
মমতাকে বিপদের দিনে সকলেই কাছে পেয়ে যান, যত দূরই হোক, যেভাবেই হোক তিনি ঠিক পৌঁছে যান। এই যে পাশে থাকার একটা ইচ্ছে, এটাও তো জনসাধারণ নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন।

আমি কলেজ স্ট্রীটে এর মধ্যে একদিন গিয়েছিলাম। ‘মা ক্যান্টিন’ দেখলাম। শুধু যে দিনমজুর বা দোকানি, বা অতি সাধারণ গরিব মানুষ খাচ্ছেন তা নয়, এদের থেকে অবস্থা ভালো এমন লোকেরাও খাচ্ছেন। এই যে সামান্য আহারটুকু তারা মাত্র ৫ টাকার বিনিময়ে পাচ্ছেন, একি কম কথা? মমতা জানেন লোকের পেটের যে খিধে, তা সবটাই দূর করা হয় তো সম্ভব নয়। কিন্তু চেষ্টা করে কিছুটা তো কমানো যেতেই পারে। এটুকু দেওয়া যে কম না, সেটা বোঝেন তারাই যারা ৫ টাকায় খেয়ে তৃপ্তি পাচ্ছেন।
কোভিডের কথাও তো আমরা জানি। এক নিরলস সংগ্রাম চলছে সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। মানুষ তার প্রয়োজনে পাচ্ছেন স্বাস্থ্য কর্মী এবং ডাক্তারদের সু-পরামর্শ, যে তাকে একটু সাহায্য করবে। অগণিত মানুষ প্রতিদিন টিকা নিচ্ছেন এই রোগের হাত থেকে বাঁচতে।
মমতা কিন্তু তার লক্ষ্যে এগিয়েই যাচ্ছেন ক্রমাগত। তিনি কিন্তু তেমন বিদ্রুপ বা উপহাস করে বিরোধীদের আঘাত করেন না। যে টুকু যেখানে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন তাই করেন। আর তাই বিরোধী পক্ষরা ক্রমাগত নানাভাবে তাকে উত্যক্ত করে চলেছেন। বিরোধী রাজনীতি যারা করছেন তাদের তেমন কোনো স্থির লক্ষ্য নেই বলেই মনে হয়, নেই কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য। সাধারণ মানুষেরা বুঝতেই পারেন না যে, বিরোধী দলগুলির পরিকল্পনা কি। আসলে যে কোনো নির্বাচনের আগে কিন্তু সাধারণ মানুষ সবসময় জানতে চায়, কোন দলের কি বক্তব্য? তারা কিভাবে কাজ করতে চাইছে ইত্যাদি। মমতা চেষ্টা করে যাচ্ছেন এটাই বড় কথা। আমরা নিজেরাই কি জীবনে সব কাজে, সব সময় সফল হই? কিন্তু থেমে তো আর থাকি না। কাজ তো চালাতেই হয়। মমতাও কিন্তু থেমে নেই। অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন তার প্রকল্পের সুবিধাগুলি যাতে মানুষের কাছে পৌঁছায় তার জন্য। সাধারণ মানুষ তার এই মনোভাবকে কিন্তু সম্মান করেন। তাই তিনি আমাদের এত কাছের, এত আপনার জন। বাঙালি জাতির যে একটা সভ্যতা, ভদ্রতা ও রুচিশীলতা আছে — তার সঙ্গে বিজেপি-র একটা কোথাও সংঘাত আছে, সে তো দিন দিন স্পষ্ট হয়ে চলেছে। এই সংঘাত ক্রমশ আরও বাড়বে। সেকথা মনে রেখেই আমাদের এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। লোকসভা ভোটের আগে থেকেই এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাবে। আমরা যেন সে কথা মনে রাখি।
তবে আজ এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই ভবানীপুরে। এই লড়াই কিন্তু তার একার নয়। এই লড়াই সারা বাংলার। এই মুহূর্তে আমাদের সকলকে এই কথা মনে রাখতে হবে। আসুন সকলে মিলে তার জন্য বলি ‘বিজয়ী ভব’। আপনার জয় হোক। অর্থাৎ আপনি জিতে আসুন আমাদের জন্য। আমরা আপনার জয় দেখতে চাই, আপনার সঙ্গে আমরা আছি। আপনি যে আমাদেরই ঘরের মেয়ে।