যাওয়ার কথা ছিল আগেই। কিন্তু সফর বাতিল করতে হয়েছিল উপনির্বাচনের কারণে। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পরে প্রথম উত্তরবঙ্গ সফরে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃষ্টিবিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উত্তরবঙ্গ সফর নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
এবারের উত্তরবঙ্গ সফরে মুখ্যমন্ত্রী তেমন কিছু ঘোষণা নাও করতে পারেন। তার চেয়ে বরং এবারের সফরে তিনি খোঁজখবর নিতে পারেন ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গে চালু হওয়া প্রকল্পগুলি কতখানি বাস্তবায়িত হয়েছে সে বিষয়ে। এছাড়া উত্তরবঙ্গে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী উত্তরকন্যায় বৈঠক করবেন জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার নিয়ে। তারপরেই মুখ্যমন্ত্রীর গন্তব্য কার্শিয়াং। সেখানেও একগুচ্ছ প্রশাসনিক বৈঠকের কথা রয়েছে। তৃণমূল সূত্রে খবর, একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরকালেই ৪-৫ জন বিজেপি বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন।
প্রসঙ্গত, বিগত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল বিপুলভাবে ফিরে এলেও কার্যত উত্তরবঙ্গে তারা পেয়েছেন মিশ্র ফলাফল। উত্তর দিনাজপুর ও মালদা জেলা থেকে তৃণমূল বেশ বড় সংখ্যার আসন পেয়ে রেকর্ড গড়লেও আলিপুরদুয়ার ও দার্জিলিং জেলা থেকে তৃণমূল কোনও আসন না পায়নি। উত্তর দিনাজপুর ও মালদা এই দুই জেলা থেকেই যেমন তৃণমূল এর আগে এত আসন পায়নি। তাছাড়াও তৃণমূল আসন পেয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলা থেকে। সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের ঝুলিতে এসেছে ২৩টি। কিন্তু দার্জিলিং ও আলিপুরদুয়ার জেলায় তাদের একটি আসনও মেলেনি।
অন্যদিকে বিগত বিধানসভা নির্বাচনে ৩০টি আসন পেয়েছে বিজেপি। আর তারপরেই বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্র করে বিজেপি সাংসদ পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্য গঠনের দাবি তোলে। সেই দাবিতে দলের প্রত্যক্ষ সমর্থন না থাকলেও ওই সাংসদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় ঠাই পান। কিন্তু পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্য গঠনের দাবির জেরে খোদ উত্তরবঙ্গের বিজেপি বিধায়কেরাই পড়ে যান অস্বস্তিতে। ইতিমধ্যেই তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন উত্তরবঙ্গের কালিয়াগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক। জানা যাচ্ছে আগামী দিনে তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন উত্তরবঙ্গের আরও ৬জন বিধায়ক। এও শোনা যাচ্ছে তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর সফরকালে যোগ দিতে পারেন। এখন দেখার বিষয় মুখ্যমন্ত্রী এবারের উত্তরবঙ্গ সফরে বিজেপির এই বাংলা ভাগের রাজনীতি নিয়ে কিছু বলেন কিনা।
মুখ্যমন্ত্রীর এবারের উত্তরবঙ্গ সফরকে কোনও কোনও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, মমতা পাহাড়ের পালস বুঝতে কার্শিয়াং যাচ্ছেন! পাহাড়ে প্রবল বৃষ্টিতে ধস নেমেছে। তাছাড়া পাহাড়ের সমীকরণও গত কয়েক মাসে বেশ কিছুটা বদলেছে। নানা সময়ে পাহাড়ের মাথারা আলাদা আলাদা দল গড়েছেন। যারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন সময় তৃণমূল নেত্রীর ‘কাছের লোক’ ছিলেন- বিমল গুরুং, অনীত থাপা, বিনয় তামাং প্রত্যেকেই আজ পৃথক পৃথক দলের নেতা। গোর্খা জনমুক্তির এই নেতাদের ‘হাঁড়ি’ আলাদা হয়ে যাওয়ায় জিএনএলএফের শক্তি বেড়েছে। পাহাড়ের এই রাজনীতি বদল এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণটা তৃণমূল নেত্রীর এবার পরখ করে নেওয়া দরকার।
পাশাপাশি পাহাড়ে গুরুং, অনীত, বিনয়দের সাম্প্রতিক কালের শক্তি-সামর্থটাও একবার মেপে দেখা দরকার! সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রী কার্শিয়াং যাচ্ছেন বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। অনেকে তো বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী পাহাড় সফর শেষ করে ফিরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জিটিএ নির্বাচন ঘোষণা করতে পারেন। পাহাড়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে বকেয়া জিটিএ নির্বাচন। গত চারবছর ধরে স্থগিত রয়েছে ওই নির্বাচন। কার্শিয়াঙে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে গঠিত একাধিক কালচারাল বোর্ড। সেই সব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদগুলিতেও বদল হয়নি দীর্ঘদিন। চলতি সফরে গিয়ে সেই বদলও করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী।
তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে প্রথমবার উত্তরবঙ্গ সফরে সোমবার কার্শিয়াঙে প্রশাসনিক বৈঠক। এরপর মঙ্গল ও বুধবার উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির প্রশাসনিক বৈঠক করবেন ভার্চুয়ালি। বৃষ্টি ও ধস বিধ্বস্ত দার্জিলিং এবং কার্সিয়াং-এর বিভিন্ন এলাকায় বিপর্যস্ত জনজীবন। একাধিক রাস্তা ধসের কারণে বন্ধ। প্রশাসনের তরফ থেকে ধস সরিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কার্সিয়াং-এ যাওয়ার পথে মুখ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পর্যালোচনা করবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় কী করণীয় তা নিয়ে সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
পাশাপাশি ৩০ অক্টোবর রাজ্যের অন্য তিন আসনের সঙ্গে দিনহাটার উপনির্বাচন রয়েছে। দিনহাটা কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ। একুশের ভোটে তিনিই প্রার্থী হয়েছিলেন তৃণমূলের। কিন্তু বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিকের কাছে মাত্র ৫৭ ভোটে হেরে যান তিনি। এবার উপনির্বাচনেও উদয়ন গুহকেই প্রার্থী করেছে তৃণমূল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার সারছেন ৬৭ বছরের প্রার্থী উদয়ন গুহ। তাঁর হয়ে প্রচারে করেছেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। প্রচার করবেন সুব্রত বক্সী, সোহম চক্রবর্তী ও দেবাংশু ভট্টাচার্য। দিনহাটায় যাবেন সায়নী ঘোষ এবং সায়ন্তিকা ব্যানার্জি।