এই লেখাটায় সবে হাত দিয়েছি, তখনই ই-মেলে এল একটি বামপন্থী দলের বিবৃতি। পার্টি ফর ডেমোক্রেটিক স্যোশালিজম বা পিডিএস-এর এই বিবৃতিতে অন্য কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে রয়েছে ভবানীপুর উপনির্বাচনের প্রসঙ্গও। এবং এই প্রথম রাজ্যের একটি পরিচিত বাম ঘরানার রাজনৈতিক দল সরাসরি জানালো, তাঁরা ভবানীপুরে বিজেপি-কে হারাতে চায় এবং সেজন্য তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ভোট দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছে। পিডিএস দলটির কথায় কত মানুষ প্রভাবিত হবেন, দলটির নেতারা ভবানীপুরে গিয়ে ক’টা সভা করবেন, এসব প্রশ্ন এক্ষেত্রে গৌণ। বড় প্রশ্নটা হলো, বামফ্রন্টের প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও এই বাম দল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছে। এভাবেই গড়ে ওঠে মানুষের জোট।
ভবানীপুরে যে বিরাট ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতবেন, তা নিয়ে সংশয় নেই কারোরই। সেটা এই আসনটিতে ভোটের প্রধান আকর্ষণ নয়। অভিজ্ঞ মহল দেখতে চাইবেন — নানা সম্প্রদায়, ভাষাভাষীর এলাকা ভবানীপুরে সবাই মিলে কতটা শক্ত-পোক্ত জোট গড়তে পারেন। মানুষের জোট গড়ার অর্থ কিন্তু জয়ের ব্যবধান বাড়ানোই কেবল নয়। ধরুন, একটি বড়সড় এলাকায় হিন্দুরা থাকেন, পাশের এলাকায় ভালো সংখ্যায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা থাকেন। হিন্দুদের মধ্যে ২০-২৫ শতাংশ বাংলাভাষী নন্, মুসলিমদের মধ্যেও তাই। রয়েছেন শিখ ও অন্য ধর্মাবলম্বীরাও। আবার ভাবুন, এলাকাটিতে রয়েছে পেশারও বৈচিত্র্য। মধ্যবিত্ত অফিস করা মানুষের পাশাপাশিই রয়েছেন ব্যবসায়ী, মজদুর, অসংগঠিত শ্রমিক, এমনকী বন্ধ কলকারখানার বেকার হয়ে যাওয়া লোকজনও। এঁদের সবার চিন্তা একই রকম নয়, সরকার থেকে প্রত্যাশাও নানা ধরনের। সব অংশের সমর্থন মিলিয়ে চেহারাটা কী দাঁড়ালো, সেটাও কিন্তু মানুষের জোটের ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
এরই পাশাপাশি ভবানীপুর উপনির্বাচনে আরও এক ধরনের মানুষের জোট তৈরি হচ্ছে, যেটাও উড়িয়ে দেবার নয়। এ রাজ্যের অন্যতম বিরোধী দল কংগ্রেস। দলটির রাজ্য সভাপতি অধীর চৌধুরি মাসখানেক আগেই বলেছিলেন, যেহেতু মুখ্যমন্ত্রী হয়েই গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাই তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী দেওয়া উচিত হবে না। মনে রাখা দরকার, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের বোঝাপড়ায় এই আসনটি কংগ্রেসের ভাগে পড়েছিল। উপনির্বাচনেও তাই এটি কংগ্রেসেরই পাওয়ার কথা। সেই অবস্থায় আগেভাগেই রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি নিজের ব্যক্তিগত মত জানিয়ে রেখেছিলেন। পরে অবশ্য রাজ্য কংগ্রেসের সভায় প্রার্থী দেবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বেঁকে বসেন সোনিয়া গান্ধি, রাহুল গান্ধি। তাঁরা জানিয়ে দেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়া হবে না। তবে এখনও পর্যন্ত অবশ্য রাজ্য কংগ্রেস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দেবার আবেদন জানায়নি।

আরেকটি পরিচিত বাম দল সিপিআইএমএল লিবারেশন। বিধানসভার সাধারণ নির্বাচনে এই দলটি জানিয়েছিল, বিজেপিকে পরাস্ত করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। পিডিএস-এর বিবৃতিটি আসার পরে তাই ফোন করলাম এই বাম দলটির রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদারকে। তিনি বললেন, বিজেপি-ই আমাদের প্রধান শত্রু। বিজেপিকে হারানোই আমাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, আগেও যা ছিল, এই উপনির্বাচনেও তা-ই আছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রকারান্তরে আমরা তৃণমূলকে ভোট দিতে বলছি। এটা ঠিক যে আমরা প্রার্থী দিচ্ছি না। বামফ্রন্টের দিক থেকে যদি সমর্থন চাওয়া হয়, প্রচারে ডাকা হয়, তখন আমরা দলে আলোচনা করব। তবে এখনও পর্যন্ত (১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধে ৬টা পর্যন্ত) বামফ্রন্টের থেকে তেমন কোনো চিঠি আমরা পাইনি। তবে ২৭ তারিখের ভারত বন্ধ, ত্রিপুরায় বিজেপির গণতন্ত্র হত্যার ইস্যুতে আমরা বামফ্রন্টের সঙ্গে কর্মসূচি করছি। একই কথা জানালেন সিপিআইএমএল লিবারেশন দলের অন্যতম প্রবীণ নেতা কার্তিক পাল। তিনি জানালেন, কৃষক সংগঠনগুলির ডাকা ভারত বন্ধ নিয়েই তাঁরা এখন মূলত ব্যস্ত। এতবড় একটা কর্মসূচি নিয়ে যে রাজ্যের সংবাদমাধ্যম মোটেই উৎসাহ দেখাচ্ছে না, তা নিয়েও আক্ষেপ করলেন কার্তিক পাল।
এই দুই ইস্যুতে পিডিএস-ও কর্মসূচি করছে। দলটির সম্পাদিকা অনুরাধা দেব-এর বিবৃতিতে ২৭ সেপ্টেম্বর কৃষক সংগঠনগুলির ডাকা ভারত বন্ধকে সমর্থন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ত্রিপুরাতে বিরোধীদের উপর যে ভয়ংকর আক্রমণ নামিয়ে আনছে বিজেপি ও সেই দল চালিত সরকার, তারও তীব্র নিন্দা করা হয়েছে।
বাম ভোটারদের একটা বড় অংশ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে ২০২১-এর বিধানসভা উপনির্বাচনে। বামফ্রন্টের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে ইদানীং খুব ভালো ফল হচ্ছে তৃণমূলের। ভবানীপুর বিধানসভাতে ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড একটা উদাহরণ। এখানে অতীতে বারবার ফরওয়ার্ড ব্লক জিতেছে। কিন্তু ২০২১ সালের ভোটে এই একটি ওয়ার্ডে তৃণমূল ২১ হাজার ৩৭৯ ভোটে এগিয়ে গেছে। একটি ওয়ার্ডে এত বড় ব্যবধান মানে সেই ওয়ার্ডের ৮০ শতাংশ ভোটই তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছে। এর অর্থ মানুষ জোট বাঁধছেন। যাঁরা বরাবরের বামপন্থী, তাঁরাও এই সন্ধিক্ষণে মমতাকেই আঁকড়ে ধরছেন। এভাবেই আজকের বাংলায় রাজনীতির জল গড়াচ্ছে। বাম দলগুলি শূন্যগর্ভ হয়ে গেলেও বাম জনতা তা হননি। তাঁরা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিয়ে নিচ্ছেন।