ভবানীপুরে ভোটের ফল জানতে এখনও কাল মানে রববার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণত উপনির্বাচনের ফল সরকারি দলের পক্ষেই যায়। ভোটও পরে কম যার সুবিধা পায় শাসক দল। তবে এই উপনির্বাচনের অন্যতম প্রার্থী যেহেতু স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী তাই তাঁর জেতাটা সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু কত ভোটে জিতবেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর দলের সমর্থকদের ধারণা দিদি বিপুল ভোট জিতবেন। কিন্তু সেই বিপুল ভোটের অঙ্কটা কত? অনেকেই বলছেন, ফারাকটা হবে ৫০-৬০ হাজার। কিন্তু হিসাব অনুযায়ী ভোট পড়েছে ১ লক্ষ কয়েক হাজার সেখানে ব্যবধান অর্ধেকের বেশি হওয়াটা কি সম্ভব?
ভবানীপুরে কংগ্রেস প্রার্থী না দিলেও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরি বলেছেন, ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেও জিতেছেন, এবারেও জিতবেন। সে ভোট কম পড়ুক আর বেশি পড়ুক। অধীর তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যাও দেন। তিনি বলেন, ভবানীপুরে উচ্চমধ্যবিত্ত পাড়া এবং যেই অংশগুলিতে মনে করা হয় ভোট তৃণমূলের বিরুদ্ধে যাবে সেখানকার ভোটারদের ভোট দিতে আসার জন্য নিষেধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু, ভোটদান বেশি হলে বার্তা যেত বেশি সংখ্যক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটদান করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জয়ী করেছেন। যদি এই নির্বাচনে বেশি শতাংশ ভোট পড়ে তাহলে বোঝা যাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ভবানীপুরের বাসিন্দারা। কিন্তু ভোটের হার কম হলে এই কথা বলা আর তাঁর পক্ষে সম্ভব হতে না।
এর পাশাপাশি ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জিই জিতবেন- এমনটা দাবি করেন বিজেপির রাজ্য সহ সভাপতি জয় ব্যানার্জি। তিনিও মমতা ব্যানার্জির জয়ের পিছনে কিছু কারণ দেখিয়েছেন। তাঁর মতে বিজেপি গত বিধানসভা নির্বাচনের মতন একই ভুল এই উপনির্বাচনেও করেছে।ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বকে বারবার বলা হয়েছিল, বাঙালি প্রার্থীকে দিয়েই বাংলার মানুষের মন জয় করতে হবে। কিন্তু ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে প্রার্থী করা হল প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালকে। এরপরই তিনি বলেন, ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জির জয় নিশ্চিত। মুখ্যমন্ত্রী ৫০ হাজারের বেশি ভোটে জিতবে বলে দাবি করেন বিজেপির রাজ্য সহ সভাপতি জয় ব্যানার্জি।
তাঁর দাবি, কোথাও কোনও রিগিং হয়নি। তবে ভবানীপুরে বিজেপির হারের পর ফুল পাঠাব! কটাক্ষ ফিরহাদ হাকিমের। ভাবিত নয় মানুষ! তবে পাল্টা বিজেপির দাবি, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ৫৩ শতাংশ ভোট প্রমাণ পড়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন ভবানীপুরের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে দাবি বিজেপি নেতা শমিক ভট্টাচার্যের। তাঁর মতে, এই নির্বাচনকে একটা উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভোটের হার প্রমাণ করে দিচ্ছে আদৌতে কিছুই না, দাবি বিজেপি নেতার। শুধু তাই নয়, মুখ্যমন্ত্রীর পদ নিয়ে ভবানীপুরের মানুষ ভাবিত নন বলেও দাবি শমিকের। তবে ভবানীপুর উপনির্বাচনে প্রিয়াঙ্কা টিবড়েওয়ালের জয়ের বিষয়েও বিজেপি আত্মবিশ্বাসী বলে দাবি করেন শমীকবাবু।
ভবানীপুর উপনির্বাচনে গুরু দায়িত্বে থাকা ফিরহাদ হাকিম বলেন, উপনির্বাচনে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। যা উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট। ফিরহাদ জানান, বিজেপি ভেবেছিল ভবানীপুরে নন্দীগ্রামের মতো ঘটনা ঘটাবে। চেয়েছিল যাতে বৃষ্টি হয় আর মানুষ ভোট দিতে না আসতে পারে। এতে বিজেপির সুবিধা হত।কিন্তু ওদের সমস্ত ষড়যন্ত্র ভেস্তে গিয়েছে।
কিন্তু এসবই তো কথার কথা।প্রশ্ন এখন একটাই, মমতা কত ভোটে জিতবেন। মমতার গতবারের জয়ের মার্জিন টপকে গিয়েছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। মমতা কি সেই মার্জিন পেরতে পারবেন? ২০১১-র উপনির্বাচনে ভোটের হার ছিল মাত্র ৪৪.৭৩%। তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ৫৪ হাজার ২১৩। ২০২১-এর ভোটের হার ছিল ৬১.৭৯%। জয়ের ব্যবধান কমে হয় ২৮ হাজার ৭১৯। জয়ের ব্যবধান তিনবারের মধ্যে ষোলো সালে সবচেয়ে কম। ২৫ হাজার ৩০১।
তবে এবার যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে নেতা-কর্মীদের মতে, রেকর্ড ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতছেন। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে এ কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী হয়েছিলেন। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল ৬৫ হাজার ৫২০। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর উপনির্বাচনে জেতা আসনেও হেরেছে বিজেপি। যেখানে তৃণমূল কোনওদিন জেতেনি সেই আসনেও বিজেপিকে পর্যুদস্ত করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই নিরিখে ভবানীপুরেও যে বিজেপি হারবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত নেতৃত্ব। এমনকী মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুর নিয়েও বিজেপি আশাবাদী নয়। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই ফল তৃণমূলের পক্ষ ৩-০ হতে চলেছে।
অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ভোট পড়ার হার সন্তোষজনক নয় ভবানীপুরে। সব দিক বিচার করে বিজেপি এখানে জেতার আশা করছে না। বরং তাঁরা অঙ্ক কষছে কত ভোটের ব্যবধানে হার হয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ব্যবধান ৫০ হাজারে না পৌঁছলেও ৩০ থেকে ৪০ হাজার হবেই। তৃণমূল যে একুশের নির্বাচনের যে ব্যবধান তার থেকে বেশি মার্জিনে জিততে সমর্থ হবে সামগ্রিক পরিস্থিতি সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। উপনির্বাচন কখনও রাজ্য বা কেন্দ্রের শাসন ক্ষমতায় পরিবর্তন আনতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষ এই নির্বাচন নিয়ে চিন্তাও করছেন না। মুখ্যমন্ত্রী নন-এমএলএ বলে এই উপনির্বাচন হচ্ছে। ফলে এই কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয় হাসিল করবেনই। জয়ের ব্যবধান আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।