গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামের ফলাফল কাঁটার মতো বিঁধেছিল গলায়। তা ভুলতেই ভবানীপুরে বড় জয় পেতে চাইছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুর উপনির্বাচনে তিনি যে জিতবেন, তা একরকম নিশ্চিতই ছিল। কিন্তু ব্যবধান কত হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন ছিল তৃণমূলের অন্দরমহলে। ২০১১ সালে পরিবর্তনের ভোটে ভবানীপুরে প্রার্থী ছিলেন সুব্রত বক্সি। তিনি বাম প্রার্থী নারায়ণপ্রসাদ জৈনকে হারিয়েছিলেন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে ওই কেন্দ্রের উপনির্বাচনে প্রার্থী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ভোটে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন সিপিএম-এর নন্দিনী মুখোপাধ্যায়। নন্দিনী মুখোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ১৯,৪২২ ভোট। মমতা বন্দ্যাপাধ্যায় পেয়েছিলেন ৭৩,৬৩৫ ভোট। দুজনের ব্যবধান ছিল ৫৪,২১৩ ভোটের। ২০১৬ সালে ভবানীপুর কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ৬৫,৫২০ ভোট। বিরোধী প্রার্থী দীপা দাশমুন্সি পেয়েছিলেন ৪০,২১৯ ভোট। ব্যবধান ছিল ২৫,৩০১ ভোটের। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এই কেন্দ্রে দাঁড় করিয়েছিল শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে। তিনি পেয়েছিলেন ৭৩,৫০৫ ভোট। বিপক্ষে থাকা বিজেপির রুদ্রনীল ঘোষ পেয়েছিলেন ৪৪,৭৮৬ ভোট। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এবং রুদ্রনীল ঘোষের ভোটের ব্যবধান ছিল ২৮,৭১৯।
সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ৫৮ হাজার ৩৮৯ ভোটে ভবানীপুর উপ-নির্বাচনে জয়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুরের মাটিতে তৈরি হল নতুন একটি রেকর্ড। এই জয়ের পরেই মমতা বন্দ্যপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিবড়েওয়াল তোপ দেগেছেন, মমতা চিটিং করে জিতেছেন। একাধিক ফেক ভোটারকে ধরে জিতেছেন এবং সব ওয়ার্ডে রিগিং হয়েছে বলেও বিস্ফোরক দাবি করেছেন বিজেপি প্রার্থী। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, ভবানীপুরের সব ওয়ার্ড থেকেই জয় পেয়েছেন মমতা। ভবানীপুর কেন্দ্রের মধ্যে কলকাতা পুরসভার আটটি ওয়ার্ড রয়েছে। ওয়ার্ডগুলি হল ৬৩, ৭৭, ৭৪, ৭১, ৭০, ৭২, ৭৩ এবং ৮২। ভবানীপুরের ভোটারদের মধ্যে ৪২ শতাংশ বাঙালি হিন্দু, ৩৪ শতাংশ অবাঙালি হিন্দু এবং ২৪ শতাংশ মুসলিম। গত ২০১৪ এবং ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এই ওয়ার্ডে বিজেপি লিড নিয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল এই ওয়ার্ডগুলিতে এগিয়ে ছিল।

মুসলিম অধ্যুষিত ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তৃণমূল বরাবর জয়ী হয়ে এসেছে। পাশাপাশি ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড বরাবর বিজেপির দিকে ঝুঁকে থাকলেও এবার কিন্তু তৃণমূলের দিকেই হেলে গিয়েছে। ৭১ নম্বর ওয়ার্ডে কোনও ভোটে বিজেপি, কোনও ভোটে তৃণমূল এগিয়ে থাকে। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে এই ওয়ার্ডে তৃণমূল এগিয়ে ছিল। এবারও এগিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৭০ নম্বর ওয়ার্ড অবাঙালি অধ্যুষিত এবং বিজেপি এই ওয়ার্ডে বরাবর এগিয়ে থাকে। এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ওয়ার্ড থেকে এগিয়ে। ৭২ নম্বর ওয়ার্ডে কখনও বিজেপি কখনও তৃণমূল এগিয়ে থাকে, তবে এবার এই ওয়ার্ড থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এগিয়ে থেকেছেন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন বাদ দিলে ৭৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তৃণমূল বরাবর এগিয়ে থেকেছে। ৮২ নম্বর ওয়ার্ডেও তৃণমূল বরাবর এগিয়ে থাকে এবারেও সেখানে তাই হয়েছে।
উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা হওয়ার পরেই হাজরা মোড়ে হোর্ডিং পড়েছিল— ঘরের মাঠে খেলা হবে। সেই খেলা শেষ হল রবিবার ফলাফল প্রকাশের পর। আর ফলাফলের ট্রেন্ড আসা শুরু হতেই দেখা গেল হাজরা মোড় থেকে ভবানীপুরের রাস্তায় বদলে গেল হোর্ডিং- এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে মমতার ছবি দেওয়া হোর্ডিং; যাতে লেখা রয়েছে- মোদী-শাহসুরমর্দিনী। ভবানীপুর বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়ের ব্যবধান ৫৮ হাজার পেরোতেই তাঁকে দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে দিল তৃণমূল। মোদী-শাহদের অসুরের সঙ্গে তুলনা করে বুঝিয়ে দেওয়া হল আগামী দিনে মোদী-শাহদের রাজনৈতিকভাবে বধ করার অস্ত্র রয়েছে দিদির হাতেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ভারতীয় রাজনীতিতে মোদী-শাহ’সুরমর্দিনীর ভূমিকায় দেখা যাবে এবার।
বাংলার নির্বাচনে জেতার পরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী হ্যাশট্যাগে ট্রেন্ডিং করে তোলা হয়েছিল। মোদী বিরোধী মুখ হিসেবে মমতাকে তুলে ধরা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি গিয়ে মোদী-বিরোধিতায় বিরোধী ঐক্যের বার্তা দিয়েছিলেন। সোনিয়া-রাহুলের সঙ্গে দেখা করে একসঙ্গে চলার বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু ভবানীপুর নির্বাচন-কালে মমতার অবস্থান বদলে যায়। তৃণমূল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মোদী বিরোধী মুখ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। নন্দীগ্রামে মমতার হার কাঁটার মতো বিঁধছিল, তাই লক্ষ্য ছিল বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়া। তৃণমূল প্রচার করতে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে মোদী-বিরোধী ঐক্যের ব্যাটন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই থাকবে। রাহুল গান্ধী নন, মোদীরবিরোধী ঐক্যের মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই লক্ষ্যে ভবানীপুরের জয়কে পাখির চোখ করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্য পুরণ হয়েছে। এবার ২০২৪-এর নির্বাচনে মোদী-বিরোধী মুখ হওয়ার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।