বাংলার মানুষ যতই সভ্য ও আধুনিক হয়েছে ঠিক সেইভাবেই সমাজ ব্যবস্থার ভিত ক্রমশ আলগা হয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আমাদের সমাজে যে অনুশাসন ও শৃঙ্খলা ছিল তা আস্তে আস্তে অনেকটাই ভঙ্গুর হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনধারণের মানের উন্নয়ন ঘটলেও সমাজে কিন্তু ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক অবক্ষয়। স্বচ্ছতা, সততা, আদর্শ, মূল্যবোধ বর্তমানে প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। একসময় ভারতবর্ষের মানুষ বাংলাকে নিয়ে ভাবতো—বাংলা আজ যা ভাবে ভারতবর্ষ তা আগামীকাল ভাবে। এই বাংলা রবীন্দ্রনাথের বাংলা, কাজী নজরুলের বাংলা। আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি অন্যান্য প্রদেশের মানুষের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। কিন্তু বাংলায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে সমাজের নিয়ন্ত্রণ- শক্তি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন সময়ে বাংলায় যারা সাম্যবাদের গান শুনিয়ে ও গরিব মানুষকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সমান করার স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল সেই মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। ক্ষমতায় আসার পরই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করার লক্ষ্যে তৎকালীন সমাজের বুদ্ধিজীবী ও সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ যাঁরা সমাজ পরিচালনা করতেন তাঁদের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে চক্রান্তের জাল বুনে তাঁদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষের সামনে শ্রেণিশত্রু বানিয়ে ওই মানুষগুলোকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা শুরু করল ও নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সঙ্গে নিয়ে সমাজে নিজেদের মোড়ল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুরু হলো।

ধীরে ধীরে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রথমেই সমাজের মানুষের মধ্যে বিভাজন করা শুরু হলো। সমাজের একান্নবর্তী পরিবারগুলোকে ভেঙে খান খান করে দেওয়া হলো। ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে কাজে লাগিয়ে পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তিশালী করার চেষ্টা শুরু হলো। ধীরে ধীরে নিজেদের সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে সমাজের এই সমস্ত বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনেরা আস্তে আস্তে অত্যাচার, দমন-পীড়নের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করলো। তারপর সেই মানুষগুলোকে আস্তে আস্তে মেরুদণ্ডহীন করে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নের টাকা লুঠ করে গরিব মানুষের মেকি বন্ধুরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী হয়েছে। যতই এই অত্যাচারী শোষকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে ততই বাংলার সাধারণ মানুষের উপর এদের অত্যাচারের সীমা চরমে উঠেছে। গোটা বাংলায় একসময় অত্যাচার ও নির্যাতনে মানুষ হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো। জঙ্গলমহলের সরল উদার আদিবাসী মানুষদের নিজেদের ঝান্ডা ধরিয়ে, ভোটের বাক্সে কাজে লাগিয়ে, ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকে নিজেদের পরিবর্তন ঘটিয়ে এইসব মানুষদের টাকা লুঠ করে বড়োলোক হয়েছে।

যখন বাংলায় সিপিআইএমের অত্যাচার, শোষণ, নিপীড়ন চলছে, যখন গোটা বাংলার সর্বস্তরের মানুষ এই হার্মাদদের বিরুদ্ধে মুক্তির আশায় ছটফট করছেন তখন বাংলার কোনও রাজনৈতিক দল বা কোনও মানুষ এগিয়ে আসেননি এই অত্যাচারিত মানুষদের স্বার্থে। তৎকালীন সময়ে যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী তথা আপোসহীন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করে এই হার্মাদদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করলেন। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে কৃষকদের জমি জোর করে দখল করার বিরুদ্ধে প্রবল বিক্রমে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সকলকে একত্রিত করে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মা-মাটি-মানুষ সরকারের প্রতিষ্ঠা হওয়ার সাথে সাথে বাংলার মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মযজ্ঞে সামিল হলেন। বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় আসার পরে বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলায় শুধু মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন বা জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন গড়লেই বাংলার সার্বিক উন্নয়ন করা যাবে না। সেই জন্য তিনি শুরু করলেন আমাদের সমাজের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার কাজ ও মানুষ যাতে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা।

‘লোক প্রসার প্রকল্প’-র মাধ্যমে লোকশিল্পীদের সম্মান প্রদর্শন ও ভাতা প্রদান করার কাজটি দেশের মধ্যে নজির গড়েছে। সরকারি উৎসাহে ‘হুল দিবস’ উদ্যাপন ও লোক প্রসার প্রকল্পের মাধ্যমে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি সম্মান জানানোর কাজ তথা তাঁদের পুরোনো সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ‘বিবেক চেতনা উৎসব’-এর মাধ্যমে মানুষের মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা চলছে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের কৃতী ব্যক্তিদের ‘বঙ্গ সম্মান’ প্রদানের মাধ্যমে মেধাকে উৎসাহ ও সম্মান প্রদান করা হচ্ছে। ‘রাখিবন্ধন উৎসব’-এর মাধ্যমে সৌভ্রাতৃত্ববোধের প্রসার ঘটানোর চেষ্টা সমাজের বন্ধন মজবুত করবে তা বলাই বাহুল্য। বিভিন্ন মনীষীদের জন্মদিন পালন ও তাঁদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মাধ্যমে সচেতনভাবে বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাসকে বিশ্বের সামনে স্মরণ করানোর কাজটিও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের উদ্যোগে শুধু সমাজের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের কন্যাসন্তানদের শিক্ষার আলোয় এনেছে তাই নয়, সমাজের মেয়েদের সম্মানের আসনে বসানোর কাজটি সারা বিশ্বে প্রশংসা পেয়েছে।

‘সবুজসাথী’ প্রকল্প ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যালয়মুখী করার সাথে সাথে তাদের আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করেছে। সরকারি উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ‘শিক্ষক দিবস’ পালন করায় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক মজবুত তো হবেই উপরন্তু সমাজে শিক্ষকদের শ্রদ্ধেয় করার কাজটিও গুরুত্ব সহকারে হচ্ছে। মাটি উৎসব, মাটিতীর্থ কৃষিকথা ইত্যাদি উৎসবের মাধ্যমে শুধু বাণিজ্য নয়, সর্বস্তরের মানুষের কৃতিত্বকে সম্মান জানানো হচ্ছে। এই সবই সমাজ ব্যবস্থা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে মজবুত করার লক্ষ্যে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শুভ প্রচেষ্টা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসবের মোড়কে সমাজ সংস্কারের এই কাজ যুগে যুগে আলোচিত হবে। বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘ অপশাসনে সমাজে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে মেরামত করার কাজটি শ্রীমতী বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত সুচারুভাবে করে চলেছেন। পশ্চিমবঙ্গে সরকার গরিবদরদি, জনগণ-নির্ভর ও মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে বদ্ধপরিকর। শ্রীমতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কর্মযজ্ঞে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার সাথে সমাজের সার্বিক সংস্কার নিশ্চিত হবে এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের সচেতন মানুষ অত্যন্ত প্রত্যয়ী। রাজনীতির এই দুঃসময়ে শুধু বাংলায় নয়, গোটা ভারতবর্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই পারেন রাজনীতিকে নতুন পথ দেখাতে ও সমাজের সার্বিক সংস্কার করতে। ভবিষ্যতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজ সংস্কারক রূপেও বিশ্বে পূজিত হবেন—এটা আমাদের স্থির বিশ্বাস।