ব্যবধান টা ৫ বছর ২৭ দিনের। ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর নন্দীগ্রাম থেকেই ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার শুরু করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১-এর ১৮ জানুয়ারি সেই নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের প্রথম প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেন তৃণমূল সুপ্রীমো। বিধানসভা কেন্দ্রের নাম নন্দীগ্রাম, প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির অলিন্দে মাঠে ঘাটে সাড়া পড়ে গিয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে থেকেই জিতে মন্ত্রী হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দলত্যাগে তৃণমূলের মধ্যে অনেক হিসেব নিকেশ শুরু হয়েছে। তাঁকে দলে পেয়ে লাভের আশায় বুক বেঁধেছে বিজেপি। এই দলবদল নিয়ে মানুষ কী ভাবছেন তা প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষার বিষয় হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে অনেকেই কপিলদেবের অধিনায়কত্বের মিল খুঁজে পান। তাঁরা মনে করেন মাঠে দাঁড়িয়ে কপিল যেমন তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত নিতেন মমতাও সেইভাবেই অনেক সিদ্ধান্ত নেন। এবারও সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা যেভাবে নন্দীগ্রাম বিধানসভাকেন্দ্রে নিজেকেই প্রার্থী ঘোষণা করেছেন, তাতে অনেকে সেই মিল খুঁজে পাচ্ছেন। তবে আমার মনে হয় মমতার এই পদক্ষেপের পিছনে রণকৌশলের তীক্ষ্ণ বর্শামুখ রয়েছে।
২০১১ সালের বিধানসভা ভোট ছিল তৃণমূলের কাছে পরিবর্তনের ভোট, আর ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন তৃণমূলের কাছে প্রত্যাবর্তনের ভোট। ২০০৭-এর নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলন ২০১১তে রাজ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ভিত তৈরি করেছিল। সেই আন্দোলন রাজ্যে ভৌগলিক গন্ডী পেরিয়ে দেশ এবং বিদেশের সংবাদ মাধ্যমে ঠাঁই পেয়েছিল। সংবাদ মাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যম সর্বত্রই জমি আন্দোলন কাজ করলে নন্দীগ্রামের আন্দোলনকারীদের ছবি পাওয়া যেত। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের জেরে পুলিশের গুলি চালনা, মিছিলে, সমাবেশে, রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের দাবী উঠেছিল। সেই পরিবর্তনের আঁতুড় ঘর নন্দীগ্রাম যে শুভেন্দু পর্বের পরও নিজেদের দখলে আছে তা প্রমাণ করার অর্থ তৃণমূলের মমতা ছাড়া আর কে হতে পারে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পরে পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূল কর্মীদের লোকাল গার্জেন হয়ে ওঠে অধিকারী পরিবার। সেই অধিকারী পরিবারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিটি বিজেপিতে চলে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই একটা শূণ্যতা তৈরি হয়। নন্দীগ্রামে নিজেই প্রার্থী হয়ে সেই শূন্যতা আঁচল দিয়ে ঢেকে দিলেন মমতা। দলবদলের পর থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের প্রতিটি সভায় শুভেন্দু নিজেকে পান্তাভাত খাওয়া, মুড়ি চিবনো, গ্রাম্য মানুষ বলে তুলে ধরে তৃণমূলকে শহরের নেতাদের দল বলে আক্রমন করেছেন। শুভেন্দুর লক্ষ্য গ্রামের প্রতি শহরের যে স্বাভাবিক তাচ্ছিল্যের অভিযোগ ওঠে তাকে উস্কে দেওয়া। নিজেকে প্রার্থী করে মমতার উদ্দেশ্য সেই আক্রমনকে ভোঁতা করা। মমতার এই চালে বিজেপি যে প্রাথমিকভাবে কিছুটা অগোছাল তা বোঝা যাচ্ছে তাদের প্রতিক্রিয়ায়। বিজেপি বলছে ভবানীপুর নন্দীগ্রাম দু-জায়গা থেকে দাঁড়ানো চলবে না। তাঁকে যে কোনও একটি কেন্দ্র থেকে দাঁড়াতে হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ভবানীপুর থেকে ভয়ে মমতা নন্দীগ্রামে পালাচ্ছেন। দেশের সংসদীয় নির্বাচনে একজন প্রার্থীর একাধিক কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নির্বাচনে লড়ার ভুরি ভুরি নজির রয়েছে। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী নিজের গড় গুজরাট এবং উত্তরপ্রদেশ এই দুটি রাজ্যের দুটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়েছিলেন। আবার নির্বাচনী কেন্দ্র বদলানোর অনেক নজির রয়েছে। এই রাজ্যে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরাও নির্বাচনী কেন্দ্র বদল করেছিলেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরে প্রার্থী হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৫ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছিলেন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের এগিয়ে থাকার ব্যবধান ছিল ৩১৬৮ ভোট এই অঙ্কে বিরোধীরা অনেকে বলছেন, ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে জেতার বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেস দোলাচলে রয়েছে। এর উত্তর অবশ্যই ইভিএম দিতে পারবে। তবে বলা যায় গত লোকসভা নির্বাচনে বানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র যে লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে ছিল সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী ছিলেন না। এই রাজ্যে এখনও মমতা যে কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নির্বাচনে লড়বেন, সেখানে জেতা হারার হিসেবটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই মমতার রাজনৈতিক লড়াইয়ের অভিমুখ হলো ডাইরেক্ট অ্যাকশন। মমতা যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন, তখন বাংলার গ্রামাঞ্চলে সিপিআইএম-এর দুর্গ বলে পরিচিত এলাকায় লোকবল ছাড়াই চলে যেতেন তিনি। দলীয় কর্মীর মৃত্যু বা আহত হওয়ার খবর পেলেই রাতবিরেতে ছুটে যাওয়া ছিল মমতার রাজনৈতিক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা। রাস্তায় নেমে সামনে দাঁড়িয়ে লড়তে গিয়ে আক্রান্তও হয়েছেন তিনি। এরমধ্যে তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা আছে কি নেই তা খুঁজতে যাওয়ার কোনও অর্থ হয় না। এটা একজন ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবনাপ্রসূত কৌশল। আর এই আবহেই সামনে দাঁড়িয়ে লড়ার জন্য মমতা নিজেকে নন্দীগ্রামে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। সম্প্রতি তৃণমূলে যে ভাঙনের ধারা চলছে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পূর্ব মেদিনীপুরে। এই জেলাতেই ভাঙন সবচেয়ে বেশি। কলকাতা থেকে ১২৫ কিমি দূরে এই ভাঙনের জমি থেকেই লড়াইটা বিরোধী শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য মমতার। মমতার এই পাশার দানে শুভেন্দুর জন্য লক্ষ্মণরেখাও টেনে দেওয়া রয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরে ১৬টি বিধানসভা আসন, পশ্চিম মেদিনীপুরে ১৯টি বিধানসভা আসন আর ঝাড়গ্রামে রয়েছে ৪টি বিধানসভা আসন। শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর অনুগামী নেতা কর্মীদের দলে এনে এই ৩৯টি আসনের সিংহভাগ জেতাই বিজেপির লক্ষ্য। শুভেন্দু ও তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতারা মিলে ৫টি সমবায় ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান। এই ব্যাঙ্কগুলির ১৩২টি শাখা ছড়িয়ে রয়েছে এই তিন জেলায় এর মাধ্যমে শুভেন্দু বেশ বড়োসড়ো সুবিধা ভোগী অংশ তৈরি করেছেন। এই সুবিধাভোগীদের পরিবারগুলি স্বাভাবিক ভাবেই শুভেন্দুর সমর্থক শুভেন্দুর রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংগঠনিক শক্তিতে যুক্ত হয়েছেন এই সমর্থকরা। তাই বিজেপির আশা শুভেন্দুর এই শক্তিতে ভর দিয়ে পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের মিলিত ৩৯টি আসনে ভালো ফল হবে দলের। কিন্তু নন্দীগ্রামের সভামঞ্চ থেকে বিজেপির এই আশায় কাঁটা বিছিয়ে দিলেন মমতা। এখন যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চ্যালেঞ্জ সামলাতে শুভেন্দুকে নন্দীগ্রামে প্রার্থী করে বিজেপি তাহলে শুভেন্দুকে সেখানেই আটকে থাকতে হবে। আর যদি শুভেন্দু প্রার্থী নাও হন তাহলেও তৃণমূল সুপ্রীমোর বিরুদ্ধে লড়াইতে দলীয় প্রার্থীর জন্য তাঁকে নন্দীগ্রামেই বেশি সময় দিতে হবে। এই পরিস্থিতিতে প্রাক-নির্বীচনী লড়াইয়ের প্রাথমিক পর্বে বলটা যে পদ্মশিবিরের কোর্টে তা বলাই বাহুল্য।
মমতার এই ঘোষণার আর একটি কেন্দ্র বিন্দু রয়েছে। অতিমারির পরিস্থিতির মধ্যে গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসের সংসদে তিনটি কৃষি বিল পাস হয়। তারপরেই কৃষি বিল প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নেবেন কৃষকরা। ২৫ নভেম্বর থেকে দিল্লির উপকন্ঠে শুরু হয়েছে অবরোধ। এখনো পর্যন্ত দুপক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। তবে একটা জিনিষ পরিষ্কার এই আন্দোলনকারী কৃষকরা যে আক্রমণাত্মক বক্তব্য বলছেন তা এই মুহূর্তে বিজেপি ছাড়া আর কারুর গলায় শোনা যায়নি। কৃষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ২৬ জানুয়ারি তারা দিল্লিতে প্যারেড করবেন। এই ধরনের হুঁশিয়ারি ও এখন বিজেপি ছাড়া কেউ দিতে পারেনি। কৃষকরা বলছেন তারা ২০২৪ পর্যন্ত এই ভাবেই রাস্তায় থাকবেন। লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীকে হারিয়ে ঘরে ফিরবেন। কৃষকদের এইরকম আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক মনোভাবকে অনেকেই বিজেপির সঙ্গে চোখে চোখ রেখে টক্কর বলে মনে করছেন। আর এখানেই মমতার ঘোষণার রসায়ন জড়িয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যেই তিনি এই কৃষক আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এবার নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা করে তিনি কৃষি জমি নিয়ে শিল্পের বিরোধিতায় যে আন্দোলন করেছিলেন তাকে জুড়ে দিলেন। তিনি যে কৃষিজীবীদের জন্যেই আন্দোলন করেছিলেন সেই অতীতকেও উসকে দিলেন।