তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে মন দিয়েছেন সামাজিক উন্নয়নে। তিন মাসের মধ্যেই একাধিক প্রকল্পের সূচনা করেছেন। রাজ্যের প্রায় সর্বত্র চলছে দুয়ারে সরকার ক্যাম্প। মঙ্গলবার পর্যন্ত ক্যাম্পগুলিতে ২ কোটি মানুষ ভিড় করেছেন। তাদের বেশিরভাগই মহিলা।
কথা দিয়েছিলেন বাংলায় ক্ষমতায় ফিরলে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবেন। সেইমতো শিল্পবান্ধব সরকার হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রাজ্যে বিনিয়োগের নতুন ঠিকানা হয়ে উঠতে চলেছে পানাগড়। নতুন মেয়াদে সরকারে এসেই রাজ্যে বিনিয়োগ টানতে উদ্যোগী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেইজন্য শিল্পতালুক গড়ে তুলতে বেছে নেওয়া হয়েছে বর্ধমানের পানাগড়কে। পানাগড়ে তৈরি হচ্ছে একাধিক শিল্প। গড়ে তোলা হচ্ছে পলিফিল্ম কারখানা।
এ দিন পানাগড়ে পলিফিল্ম প্রকল্পের উদ্বোধন করার পাশাপাশি পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে জঙ্গল সুন্দরী শিল্প পার্কেরও সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এর পাশাপাশি দুর্গাপুর, জামুড়িয়া, হাওড়া, জামালপুরের মতো বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু শিল্প প্রকল্পেরও সূচনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ মুখ্যমন্ত্রী এ দিন প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের ঘোষণা করেন যেখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে৷ পাশাপাশি রঘুনাথপুরে জঙ্গল সুন্দরী শিল্প পার্কেও প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে এবং ডেউচা পাচোমিতে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হলেও লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ সেখানে খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি৷
রাজ্যে শিল্পস্থাপনের জন্য একজানালা পদ্ধতি চালু হয়েছে। শিল্পস্থাপন ত্বরান্বিত করতে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার চেয়ারম্যানও মুখ্যমন্ত্রী। এছাড়াও কমিটিতে আছেন মুখ্যসচিব-সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দফতরের সচিব। প্রতিমাসে এই কমিটির একটি করে বৈঠক করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শিল্প দফতরকেও নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব রূপায়ণের ক্ষেত্রে আরও তৎপর হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷
রাজ্যে শিল্প বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়াতে দু’টি নীতি তৈরি করছে রাজ্য সরকার৷ প্রথমটি হল এথানল উৎপাদনে উৎসাহ দিতে নতুন নীতি৷ জৈব জ্বালানি হিসেবে এথানলের ব্যবহার বাড়ছে৷ এথানল পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি৷ পেট্রোল, ডিজেলের সঙ্গে মিশিয়ে এথানলকে ব্যবহার করা হচ্ছে৷ জৈব জ্বালানি হিসেবে এথানলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে৷ ভাঙা চাল দিয়ে এথানল তৈরি হয়৷ রাজ্য ধান উৎপাদনে দেশের মধ্যে এক নম্বর৷ সরকার চাষিদের কাছ থেকে ভাঙা চাল কিনে নিলে তাঁদের আয়ও বাড়বে৷ এথানল উৎপাদন বাড়লে গ্রামগঞ্জেও প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে৷
এর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ডেটা সেন্টার ইন্ডাস্ট্রি, ডেটা হ্যান্ডলিং অ্যান্ড স্টোরেজ হাব গড়ে তোলা হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। ডেটা সেন্টারগুলি থেকে শিল্প সংক্রান্ত সবরকম সাহায্য করবে রাজ্য সরকার৷ এর ফলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে৷ সেখানে অন্তত ২৪ হাজার কর্মসংস্থানও হবে৷

রাজ্যের শিল্পায়নের দেউচা-পাচামি কয়লাখনির কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রথম পর্যায়ে যে জমি লাগবে, তা রাজ্য সরকারের হাতে ছিল, কাজের জন্য তা তুলে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়েও জমি অধিগ্রহণ হবে, সে ক্ষেত্রে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাঁদের জন্য চাকরি-শিক্ষা-ঘর-স্কুল-কলেজ তৈরি করে দেওয়া হবে। ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে সেখানে লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের কথাও তিনি জানান। দেউচা-পাচামিতে কয়লা উত্তোলন শুরু হলে রাজ্যে যেমন আগামী ১০০ বছরে বিদ্যুতের অভাব হবে না, তেমনই বিদ্যুতের দামও কমবে।
এদিন রাজ্যের শিল্পায়নে তাজপুর পোর্টের উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী গুজরাতের নাম না করে বলেন এক একটা রাজ্যে ৪-৫ টা বন্দর, সেখানে তো শিল্প উন্নত হবেই। তবে তাজপুর পোর্ট গড়ে উঠলে সেখানেও প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে। রঘুনাথপুর শিল্পতালুকে ৭২ হাজার কোটির বিনিয়োগে প্রায় লক্ষাধিক কর্মসংস্থান হবে। পানাগড় শিল্পতালুকে ২৫ হাজার, জামালপুরে ১০ হাজার, ইথানল থেকে ৪৮ হাজার কর্মসংস্থানের হিসাব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি এও বলেন, যেখানে প্রতিদিন জ্বালানির দাম বাড়ছে, সেখানে রাজ্যে অন্যতম বিকল্প হয়ে উঠতে পারে ইথানল। যা সেরা দেশকেই পথ দেখাতে পারে। ভাঙা চাল থেকে ইথানল তৈরিতে আগামী একবছরে ১৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্যে তৃতীয় বার ক্ষমতায় ফিরে তার লক্ষ্য শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজ্যকে এক নম্বরে নিয়ে যাওয়া। গত দশ বছরে রাজ্যে ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এর পাশাপাশি বিশ্ব বাংলা শিল্প সম্মেলন থেকে ১৩ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে বলে জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ আগামী বছর ফের বিশ্ব বাংলা সম্মেলনের প্রস্তুতি শুরু করতেও নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ আগামী দেড় বছরের মধ্যে অন্ডাল বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে এও জানান, দেশে যখন কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হচ্ছে তখন করোনা অতিমারির মধ্যেও বাংলায় ৪০ শতাংশ বিনিয়োগ বেড়েছে৷
প্রসঙ্গত, বিগত দশবছরে তৃণমূল সরকার সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সেভাবে কর্মসংস্থান করতে পারেনি। তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই জানিয়েছিলেন তাঁর লক্ষ্য হবে শিল্প যার মাধ্যমে বাড়বে কর্মসংস্থান। বাংলায় কর্মসংস্থানের উপর জোর দিতেই মমতার লক্ষ্য এখন শিল্প। রাজ্যে শিল্প সম্ভাবনার কথায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ডানকুনি থেকে অমৃতসর পর্যন্ত ফ্রেট করিডর তৈরি হচ্ছে। কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দর কে আগামি দুবছরে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হিসাবে তৈরি করা হবে, পাশাপাশি বালুরঘাট ও কোচবিহার বিমানবন্দর প্রায় তৈরি। এছাড়া ৩০টি হেলিকপ্টার স্টেশন তৈরি হচ্ছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।