গোয়াকে কয়লার হাব হতে দেবেন না বলে রাহুল গান্ধী ‘গোয়ানস, লেট আস প্লে!’ স্লোগান দিয়েছেন। এ যেন অনেকটা ‘খেলা হবে’র সুরে যুব কংগ্রেসের স্লোগান। অবশ্য ফুটবল প্রতিযোগিতা উদ্বোধনের পর, তবু মিল পাওয়া যায়; মমতা একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে হুইলচেয়ারে বসে হাতে করে যেমন ফুটবল ছুড়েছিলেন, রাহুলও গোয়ায় কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশে ফুটবল উড়িয়ে দিয়েছেন।
বছর ঘুরলেই বিধানসভার ভোট। তাই পশ্চিমঘাট সমুদ্র ঘেঁষা গোয়ায় নজর দিয়েছেন প্রায় সবাই। গত নির্বাচনের পরে বিজেপি কংগ্রেসের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে ৪০ আসনের গোয়া বিধানসভায় সরকার গড়েছিল। ইতিমধ্যে উপকূল রাজ্যে কংগ্রেসের ঘর ভেঙে ঘর নিজেদের ঘর গোছাতে শুরু করে দিয়েছে তৃণমূল। এই অবস্থায় গোয়া সফর সারলেন তৃণমূল নেত্রী। মমতার সফরের মাঝপথে গোয়ায় হাজির রাহুল গান্ধী।
মমতা গোয়া সফরে আনাচ কানাচ ঘুরেছেন, কখনও মঙ্গেশ মন্দির, কখনও মাপুসার মৎস্যজীবীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন সংগঠন বাড়াতে। তাঁর সফরকালেই তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন টেনিস খেলোয়াড় লিয়েন্ডার পেজ, নাফিসা আলী ছাড়াও আরও অনেকে। দেখা করেছেন গোয়া ফরোয়ার্ড পার্টির প্রধান ও গোয়ার প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় সরদেশাইয়ের সঙ্গে।
গোয়ায় জোড়াফুলের আগ্রাসন থেকে হাতকে বাঁচাতে তারপরেও আসরে নামেন খোদ রাহুল গান্ধী। গোয়ায় দলের নেতাদের নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি কথা বলেছেন মৎস্যজীবীদের সঙ্গেও গোয়ায় ‘কোল হাব’ বানানোর উদ্যোগের প্রবল বিরোধিতায় কংগ্রেস নেতা। উপকূলের এই রাজ্যের পরিবেশ বাঁচাতে কংগ্রেস সবরকমভাবে রাজ্যবাসীর পাশে থাকবে বলেও জানিয়েছেন রাহুল গান্ধী।।
তিন দিনের গোয়া সফরের শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসকে তুলোধনা করেছেন। আকার-ইঙ্গিতে নয়, তৃণমূলনেত্রী কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন চাঁচাছোলা ভাষায়। বক্তৃতায় মমতা বুঝিয়েছেন, এই মুহূর্তে বিজেপি বিরোধিতায় দেশে কংগ্রেস প্রধান শক্তি নয়, তৃণমূল সেই জায়গায় এসে গিয়েছে।
অন্যদিকে মমতা যখন গোয়ার মাটিতে কংগ্রেসকে আক্রমণাত্মক ভাষায় সমালোচনা করছেন, তখন পাল্টা আক্রমণের রাস্তায় না হেঁটে রাহুল গান্ধী জনসংযোগে মন দেন। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তিনি ফুটবলে কিক করে খেলা শুরু করার বার্তা দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিতে চাইলেন গোয়ায় কংগ্রেসের গড় রক্ষায় তাঁর আত্মবিশ্বাস আছে।
গোয়ায় রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেও তিনি জনসংযোগের চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন কংগ্রেস সহজে হাল ছেড়ে দেবে না। লক্ষ্যনীয় রাহুল মোদী বা মমতা কারও বিরুদ্ধেই তিনি আক্রমণ শানালেন না। শুধু গোয়াবাসীদের সঙ্গে জনসংযোগে বার্তা দিয়ে গেলেন।
রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়া সফর আসন্ন গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে জোট ও সমঝোতাকে কেন্দ্র করেই। অন্যদিকে গোয়ায় দলের ভাঙন রোখাই এখন রাহুলের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ঠিক মমতার সফরের সময়েই রাহুল গান্ধী আসার পিছনে অন্য কোনও সমীকরণ রয়েছে কি না তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট জল্পনা ছিল। রাজনৈতিক মহলও অবশ্য মনে করছে গোয়ায় দলের ভাঙন রোখাই এখন রাহুলের মূল উদ্দেশ্য। মমতার সফর চলাকতালীন তাই রাহুলের গোয়ায় উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রসঙ্গত ২০১৭-তে ৪০ আসনের গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে ১৭ টি আসন জিতেছিল কংগ্রেস, ১৩ টি আসন পেয়েছিল বিজেপি। যদিও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে বিজেপি গোয়ায় সরকার গড়ে। আর তারপর থেকেই একে একে কংগ্রেস বিধায়ক দল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়ে যোগ দেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের এই ভূমিকাকে তুলোধোনা করে বলেছেন, কংগ্রেসের জন্যই নরেন্দ্র মোদী শক্তিশালী হচ্ছেন। কংগ্রেস বিজেপির সঙ্গে সমঝোতা করে চলে। এরপরেই মমতা জানান, তিনি আঞ্চলিক দলের সঙ্গে রয়েছেন। কংগ্রেসের জন্য ফুল-মিষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
অন্যদিকে রাহুল গান্ধী গোয়ায় ‘কোল হাব’-এর বিরোধিতা করে বলেন, ‘গোয়ায় কোল হাব তৈরির চেষ্টা মানব না। এই উদ্যোগ গোয়ার পক্ষে কখনই হিতকর হবে না। বরং কোল হাব হলে এখানকার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।’ এরই পাশাপাশি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে গোয়ায় ক্ষমতায় এলে দলের তরফে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি পালন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। রাহুলের এই আশবাসের পর তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোয়াবাসীকে বলেন, কংগ্রেস কাজের কাজ কিছুই করে না, শুধু আশ্বাস দেয়।
২০২২-এর বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধীর গোয়া সফরে হঠাৎ উতপ্ত হয়ে উঠেছে সৈকত রাজ্যের রাজ্য রাজনীতি। আচমকাই লাইমলাইটে চলে এসেছে গোয়া। কোনও রাজনৈতিক দলেরই এতদিন গোয়া নিয়ে তেমন মাথাব্যাথা ছিল না। এখন গোয়া জাতীয় রাজনীতির স্তরে। একথা ঠিক যে মমতা গোয়ার মাটিতে পা রেখেই এই রাজ্যের রাজনীতির হাল বদলে দিয়েছেন। একদিকে তিনি যখন বিজেপিকে হারাতে না পারার জন্য কংগ্রেসের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন তাঁরা। অন্যদিকে রাহুল গান্ধী পাল্টা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূলকে নিশানা না করে নিজের কর্মসূচিতে মেতে জনসংযোগ বাড়ানোর চেষ্ট করে গেলেন।