মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলা আকাডেমি পুরস্কার দেওয়া নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য মাধ্যমেগুলিতে নানারকম, নানা রঙের প্রতিবাদ হচ্ছে। যোগ্য পুরস্কারের যোগ্য প্রাপক না হলে প্রতিবাদ হয়, হোক। একজন লোক প্রতিবাদী হয়ে তাঁর পদে ইস্তফা দিয়েছেন। সেই পদটি ছিল সাহিত্য আকাডেমির বাংলা সাহিত্য বিভাগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পদ। এই ভদ্রলোক নতুন দিল্লির ভারতীয় সাহিত্য আকাডেমির জেনারেল কাউন্সিল মেম্বারও বটে। এই পদটি তিনি ছাড়েননি। দু-টি পদই তিনি ২০১৮ সালে পেয়েছেন। ভদ্রলোকটির নাম অনাদিরঞ্জন বিশ্বাস।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নামে পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার পর রাগে সাহিত্য আকাডেমির বাংলা সাহিত্য বিভাগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পদ থেকে সদর্পে ইস্তফা দিয়েছেন অনাদিরঞ্জন। তাঁর এই ইস্তফা দেওয়ার কান্ডে তাঁকে হিরো বানিয়ে দিয়েছেন অন্য প্রতিবাদীদের একটা অংশ। আমারও কৌতুহল হয়, এতবড় কান্ড করে যিনি হিরো হয়েছেন, তাঁকে নিয়ে একটু চর্চা করা দরকার। তাঁর সাহিত্যকীর্তি সম্পর্কে আমি অবগত নই। বহুবছর আগে সুদূর আন্দামানের পোর্টব্লেয়ার থেকে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছেন বাঙালি যুবক অনাদিরঞ্জন বিশ্বাস— এরকম একটি খবর পড়েছিলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও খুব প্রশংসা করেছিলেন। ভালো লেগেছিল, প্রণিত হয়েছিলাম বাংলা ভাষা আর বাঙালির টানে। এতদিন পরে এতবড় পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে হিরো বনে যাওয়া উচ্চ মাধ্যমিক পাশ তেষট্টি বছরের অনাদিরঞ্জন বিশ্বাসকে জানার বাসনায় তাঁর প্রোফাইলে চলে যাই। নেটেও তাঁর আটটি কবিতা পড়ি।
প্রোফাইলে অনাদিরঞ্জন বিশ্বাস নিজেকে ‘Writer’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। ৪০২ জন বন্ধু। আমার সাথে মিউচুয়াল বন্ধু ৭ জন। তারপর একের পর এক তাঁর পোস্টগুলি পড়ি আর অবাক হই। প্রায় প্রতিটি পোস্ট সাম্প্রদায়িক রঙে রঞ্জিত। জাত-পাত আর ধর্মীয় বিভাজনের বিষ ঢেলেছেন পোস্টগুলিতে। পড়তে পড়তে তখনই মনে হয়েছিল অনাদিরঞ্জন বিশ্বাসকে নিয়ে একটি লেখা লিখবো। পরের দিন তাঁর প্রোফাইল খুলতে গিয়ে দেখি লকড্। এখন অবধি তালাবন্ধ রয়েছে। আগেই বন্ধু শর্মিলা ঘোষ অনাদিরঞ্জনের পোস্টের কিছু স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছিলেন। সেগুলির কিছু এখানে হুবহু তুলে দিলাম।
বিষ/১
অমর্ত্য সেনকে লাভ জিহাদ নিয়ে কটাক্ষ
অনাদিরঞ্জন পোস্টে লিখেছেন :
”লাভ জিহাদ’ ব্যাপারটির মধ্যেও তাঁর দীর্ঘ নাক গলাচ্ছেন ভারতীয়দের সঙ্গে প্রতারণাকারী, BOSPESMAN পাওয়া (নোবেলজয়ী নৈব নৈব চ) অমর্ত্য সেন। কংগ্রেসী কপিল সিব্বলের সুরে সুর মিলিয়ে তিনি বলছেন, যেখানে লাভ সেখানে জিহাদ আসে কি করে?”
“বাবুজী বিষয়টির গভীরে ঢুকুন আগে, তারপর না হয় মন্তব্য করবেন! আপনি কি জানেন, হিন্দু পরিচয় দিয়ে, নিজের হিন্দু নাম বলে একটি একটি হিন্দু মেয়ে’-কে ‘লাভ’-এর জালে জড়িয়ে ‘জিহাদ’ প্রয়োগে তাকে বিয়ে করে বিধর্মী বানানো হয়? কত হিন্দু মেয়ের সর্বনাশ করা হয় এভাবে! তখন তারা ওই ফাঁদ কেটে আর বেরোতে পারে না। আমরা চোখের সামনে আকছার এমন ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। আপনিও চোখ খোলা রাখুন, দেখতে পাবেন।”
বিষ/২
হিজাব নিয়ে অনাদিরঞ্জনের আশঙ্কা
অনাদিরঞ্জন পোস্টে লিখেছেন :
“দক্ষিণ ভারতে এখন চলছে হিজাব আন্দোলন। খানিকটা পশ্চিমবঙ্গীয় ‘হোক আলিঙ্গন’ বা ‘হোক চুম্বন’-এর কায়দায়। কী সেই আন্দোলন? না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলমান ছাত্রীদের ‘হিজাব’ পরে আসতে দিতে হবে, যাতে বোঝা যায় তারা মুসলমান। এই আবদার যদি মেনে নিতে হয় তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের মধ্যে সাম্যচেতনা আনার জন্য ‘ইউনিফর্ম’ প্রথার কী দরকার? অবিলম্বে তা তুলে দেওয়া হোক। বরং, নিজেদের চিহ্নিতকরণের সুবিধার্থে ডাক্তারকন্যা তার পোশাকের উপর লিখে আসুক ‘আমি ডাক্তারকন্যা’, উকিলের মেয়ে তার পোশাকের উপর লিখে আসুক ‘আমি আইনজীবী দুহিতা’ ইত্যাদি।”
“আসলে এটা একটা ভয়ঙ্কর অশনি সংকেত, যা গড়পড়তা ভারতীয়রা টের পাচ্ছেন না। যখন পাবেন, তখন জল প্রবাহিত হতে থাকবে নাকের উপর দিয়ে।”
বিষ/৩
ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন নিয়ে কটাক্ষ
অনাদিরঞ্জন পোস্টে লিখেছেন :
“তথাকথিত কৃষক আন্দোলন হচ্ছে ভারতে আর তার সমর্থনে খালিস্তানি পতাকাবাহী মোটর Rally হচ্ছে আমেরিকায়। ইতালিতে দেওয়াল-লিখন পড়ছে ‘খালিস্তান জিন্দাবাদ’। চোখ বন্ধ করে থাকা বিপ্লবীদের নজরে আসছে না সে সব।”
বিষ/৪
লতা মঙ্গেশকরের অন্তেষ্টিতে শাহরুখ খানকে নিয়ে নিকৃষ্ট পোস্ট
অনাদিরঞ্জন পোস্টে লিখেছেন :
“শাহরুখ খান লতা মঙ্গেশকরের মৃতদেহে থুতু দিয়েছেন না ফুঁ দিয়েছেন, তা তর্ক সাপেক্ষ। আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। একজন শিক্ষিত মুসলমান যত বড় অভিনেতা বা কবি বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বই হোক না কেন, ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া তো দূরের কথা, সে কিন্তু কখনও তার ধর্মীয় গন্ডির বাইরে পা রাখার সাহস করে না। তাই, এই উপমহাদেশে হিন্দু কবি এবং আইনজীবীকে প্রকাশ্যে গোরুর মাংস খেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে দেখা গেলেও, কোনও মুসলমান সেলিব্রেটিকে দেখতে পাওয়া যায় না যে সে শূওরের মাংস প্রকাশ্যে খেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে। এটাই ভারতীয়দের চরম ট্রাজেডি। তুমি হিন্দু, ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার দায় তোমার। আমি মুসলমান, ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার দায় আমার উপর বর্তায় না। ভারতীয় সংবিধানের চেয়ে আমার কাছে আমার ধর্মীয় রীতিনীতিই বড়।”
এখন কথা হল, এই বিষাক্ত লোকটা সাহিত্য আকাডেমির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের পদে কি করে থাকতে পারেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা আকাডেমি পুরস্কারের উপযুক্ত নন, তার জন্য প্রতিবাদ করছেন করুন, কিন্তু এই লোকটাকে হিরো বানানোর আগে কি তাঁর ঠিকুজি-কুষ্ঠির খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল না? কেন প্রতিবাদ উঠছে না যে, এই লোকটির সাহিত্য আকাডেমির মত প্রতিষ্ঠানের কোনও পদেই থাকার তাঁর অধিকার নেই? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরস্কার দেওয়ার অপরাধের চাইতে তাঁকে ওই পদে রাখার অপরাধও কম নয়।