আমফান ঝড় আসার আগে থেকেই আমাদের আতঙ্ক চরমে উঠেছিল যে এই ঝড় এসে কি করবে। আমরা যারা পাকা বাড়িতে থাকি তাদের হয়তো ততটা ভয় নেই। কিন্তু যারা কাঁচা বাড়িতে থাকে টিনের চালের তলায় থাকে, তাদের তো ভীষণ ক্ষতি হবে। বিশেষ করে সুন্দরবন, সেখানে প্রচন্ড ক্ষয়-ক্ষতি হবে, আয়লার সময়ও হয়েছিল। এই সব ভেবে মনটা খুব উদ্বিগ্ন ছিল আমার। কেননা এগুলো তো আমাদের হাতে নয়, ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রাকৃতিক ব্যাপার। যে কারণে আমি খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলাম। আমদের হয়তো যারা পাকা বাড়িতে থাকি তাদের কিছু হবে না কিন্তু গরিব মানুষদের খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। আর একটা দুশ্চিন্তা ছিল, কলকাতায় এমনি তো গাছ খুব বেশি নেই, যে কটা আছে সে কটাই আমাদের সম্বল। এ গাছগুলো যদি পড়ে যায়, তাহলে কি হবে? তো আমফান এলো, সেই ভয়ঙ্কর শব্দ, ভয়ঙ্কর ঝড় আমরা সব দরজা জানলা বন্ধ করে বসে আছি, অসহায় ভাবে, কিছু করার নেই। ঝড় বয়ে যাচ্ছে, আমরা চুপচাপ বসে আছি।

আমার ভাগ্য খুব ভালো। প্রসন্ন এই কারণে যে আমার বাড়ির ইলেকট্রিসিটিটা যায় নি, সেটা ছিল আগাগোড়াই। কিন্তু বাদবাকি যোধপুর পার্ক অন্ধকার, শুধু আমার এলাকাটায় আলো ছিল। আরো দু-একটা জায়গায় আলো ছিল। তারপরে অন্ধকার, অন্ধকার তো অন্ধকার সেটা এখন তিনদিন চারদিন ধরে অন্ধকার। তারপর আমার বাড়ির ঠিক সামনে একটা আমগাছ পড়ে গেল, পড়ে গিয়ে আমার গেট বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মনে হলো যেটা আমার, আমফান খুব বড়ো ক্ষতি করে দিয়ে গেছে সন্দেহ নেই, অনেক গাছপালা ফেলে দিয়েছে সুন্দরবনের এতো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটা ঠিকই, তো মনে হয় এটা যে, যে ক্ষতির, যে আরও মহাক্ষতির আশঙ্কা করেছিলাম, হয়তো ততটা হয় নি, কেননা আমরা শুনছিলাম যে কলকাতার কাছ ঘেঁসে যাচ্ছে ঝড়টা, কলকাতার হয়তো তেমন ক্ষতি হয় নি, গাছপালা পড়েছে, ইলেকট্রিক গেছে, অনেক জায়গায় জল জমে গেছে, কিন্তু তবু, আমাদের কলকাতা তো ঝড় বড়ো কম দেখনি, বহুকাল ধরে ঝড়ের সঙ্গে আমরা বসবাস করছি, একটা বিশেষ সময় ঝড় আসে, কোন কোনও বছর ভয়ঙ্কর ঝড় আসে, কোন কোনও বছর অল্পের ওপর দিয়ে যায়, কিন্তু এগুলো খানিকটা আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে।

কলকাতা ঝড় প্রবণ জায়গা, বৃষ্টি বেশি হয় এখানে, এ সব কিছুই আছে ঠিকই, আবার মানুষ এখানে এ সব নিয়েই বেঁচেও তো আছে। লড়াই করে তারা— যেমন সুন্দরবন অঞ্চলে দেখলাম অনেকেই ঘর ছাড়ে নি, সবাই সরকারি আস্তানায় গিয়েছিল, সেখানে হয়তো সকলের জায়গা হয়ে ওঠে নি, নিজেদের ঘরেই আছে তারা, সাহসের সঙ্গেই আছে, এবং তারা নিজেরা বাঁধ দিয়েছে। সেই বাঁধ ভাঙে নি অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, যে বাঁধ অটুট আছে, জল ঢুকতে পারে নি গ্রামে, মানুষের সংগ্রামটাতো মনে রাখতে হবে, যে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কতো সংগ্রাম করে, আর এই সব ঝড়-ঝঞ্ঝা আসে আর মানুষের মৃত্যু হয় এটা একটা খুব দুঃখের ব্যাপার কিন্তু আমাদের, বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী এবং আর সকলেই বারণ করেছিলেন যে কেউ ঘরের বাইরে যাবেন না, এই সময়টা ঘরের মধ্যে থাকবেন, কোনও কারণেই বাইরে যাবেন না। কিন্তু সে কথা লোকে শোনে নি। যারা শোনে নি তাদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে এবং সেটা খুব দুঃখের ব্যাপার। মানুষ যে কথা শোনে না, এটা আমাদের দেশে একটা মস্ত বড় রোগ বলা যেতে পারে। মানুষ ঠিক বিপদের সম্ভাবনাটা বুঝতে পারে না। কতখানি বিপদ আসছে না আসছে। তো সেই ভাবেই হলো, যা হবার হয়েছে, কিছু প্রাণও গেছে মানুষের, ক্ষয়ক্ষতিও প্রচুর হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, ঝড়ের আগে মানুষকে সতর্ক করতে, জাগ্রত রাখতে এবং অন্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে। কিন্তু তবু, মানুষ তাঁর কথা না শোনার ফলে কিছু কিছু প্রাণহানি ঘটেছে। আমরা এও কাটিয়ে উঠবো নিশ্চয়ই। আমার মনে হয়, সবরকম বিপদ আপদকেই মানুষ মোকাবেলা করতে পারে। মানুষ শেষ পর্যন্ত বেঁচেও থাকে। আমরা বলি যে, মানুষ যতক্ষণ বেঁচে আছে ততক্ষণ সে মৃত্যুকে জয় করেই বেঁচে আছে। থাকবে।