ইতিহাস গড়ে বিরাট চ্যালেঞ্জের সামনে এসে দাঁড়ালেন মমতা। বঙ্গবাসীর বিপুল সমর্থন বুঝিয়ে দিয়েছে যে বাংলা নিজের মেয়েকেই চেয়েছিল। বিজেপির ‘সুনার বাংলা’ লুট রুখে দিয়েও; বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হয়েও তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের মুকুটে কাঁটা বিধে ছিল নন্দীগ্রামের ফলাফল। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, নন্দীগ্রামে পরাজয় সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কি ফের শপথ নিতে পারবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
ভারতীয় সংবিধান অনুসারে, বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত না হয়েও একজন মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমনকী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। তবে তাঁকে অবশ্যই মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে যে কোনও একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই পথেই হাঁটলেন এবং তৃতীয় বার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন।
এমন উদাহরণ তো এই প্রথম নয়। ২০১১ সালে যখন ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে পরিবর্তন ঘটে, সেবারও মমতা বিধায়ক ছিলেন না। বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা শপথগ্রহণ করেছিলেন বিধায়ক পদ ছাড়াই। পরে অবশ্য তিনি নির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন।
কেবল বাংলা নয়, এমন উদাহরণ রয়েছে বাংলার বাইরেও। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তিরথ সিং রাওয়াত বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত না হয়েই শপথ নিয়েছিলেন। দল জিতলেও প্রেম কুমার ধুমাল ২০১৭ সালে হিমাচলপ্রদেশে বিধানসভা ভোটে হেরে গিয়েছিলেন। তাঁর পরিবর্তে বিজেপি জয়রাম ঠাকুরকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিল। ১৯৫২ সালে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়। তখন মহারাষ্ট্র ও গুজরাট মিলিয়ে স্টেট অফ বম্বের বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গিয়েও মোরারাজি দেশাই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে সি রাজাগোপালাচারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর উপনির্বাচনেও লড়েননি তিনি। মাদ্রাজ চেম্বার্স অফ কমার্সের কোটায় বিধান পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কিন্তু মমতার কাছে এখন তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ করোনা। যার মোকাবিলা করতে দরকার প্রচুর অর্থ। উল্লেখ্য, প্রথম, দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয়বার সরকার গড়েও সেই আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি তিনি। অন্যদিকে বিপুল জনসমর্থণ মানে মানুষের প্রত্যাশাও তাঁর কাছে অনেক বেশি। রাজ্যে কোভিড সংক্রমণ ইতিমধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তার মধ্যে অক্সিজেনের অভাব, যথেষ্ট সংখ্যক ভ্যাকসিন নেই, হাসপাতালগুলিতে নেই বেড। সবিতীয় দফার শেষ সময় থেকেই কোভিডের আগ্রাসন, তার ওপর বিধ্বংসী আমফান, এই দুই পরিস্থিতি সামাল দিতেই বিপুল খরচ করতে হয়েছে রাজ্যকে।
রাজ্যের অভিযোগ অনুযায়ী কেন্দ্র কোভিড মোকাবেলায় যথেষ্ট অর্থ দেয়নি। ফলে রাজ্য কোষাগারে চাপ বেড়েছে। আমপান খাতের টাকা নিয়েও কেন্দ্র রাজ্য টানাপোড়েন চলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের তৃতীয় দফার সুচনার আগে থেকেই করোনা ২য় ঢেউ আরও ভয়াবহ আকারে আছড়ে পড়েছে। সেই আগ্রাসী কোভিডকে মোকাবিলা করা তাঁর কাছে এখন সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় রাজ্যে পরবর্তীতে আর্থিক সঙ্কট তৈরি হওয়ার সম্ভবনার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। তার মানে মমতা আরও একবার সেই টানামানি অর্থনৈতিক অবস্থার সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই মুহূর্তে বকেয়া অর্থ রাজ্যের হাতে আসা খুবই জরুরি।কারণ, একদিকে নতুন সরকারকে সামাজিক এবং পরিকাঠামো খাতে খরচ করতে হবে, অন্যদিকে প্রবল জনস্বাস্থ্যের চাপকেও সামল দিতে হবে।
সরকারি হিসেব বলছে চলতি আর্থিক বছরে রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সরকারি কোষে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। তার ওপর ধার মেটাতে খরচ হতে পারে ৬৩ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া বেতন, পেনশন-সহ সামাজিক খাতে নানা প্রয়োজনতো আছেই। ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন সরকারের প্রথম কাজই হবে কোভিড ঠেকানো। গত বারের চেয়ে এবারের পরিস্থিতি অনেক গুণ বেশি ভয়ংকর, সংক্রমণও বেশি। অতএব ব্যবস্থা অনেক বাড়াতে হচ্ছে। চিকিৎসা খরচও বেড়েছে। সরকারি, সরকারি অধিগৃহীত বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো ছাড়াও চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। নিখরচায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে সরকারকে। সব মিলিয়ে বিপুল খরচ।
ভোটের আগেই রাজ্যে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প শুরু হয়েছে। বিনামূল্যে রেশন দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য।আছে কন্যাশ্রী, কৃষকবন্ধু প্রকল্প। নির্বাচনী ইস্তাহারের প্রতিশ্রুতি- পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য রেখার থেকে উপরে তোলা হবে। প্রতি বছর পাঁচ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান হবে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে রাজ্যে প্রতি বছর ১০ লাখ ছোট ও মাঝারি শিল্প হবে। পাঁচ বছরে বড় শিল্পের দুই হাজারটি ইউনিট যুক্ত হবে। আর বিনিয়োগ হবে পাঁচ লাখ কোটি টাকা। মানে বছরে এক লাখ কোটি টাকা। প্রতিটি ব্লকে একটি করে মডেল আবাসিক স্কুল হবে। পার্শ্ব শিক্ষকদের বছরে বেতন তিন শতাংশ করে বাড়বে, অবসরের পর তারা তিন লাখ টাকা করে পাবেন। প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ, অতিরিক্ত সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতিও আছে।সব পরিবারকে স্বাস্থ্য সাথীর আওতায় নিয়ে আসাঢ় কথাও বলা আছে।সব মিলিয়ে খুবই কঠিন কাজ। একসঙ্গে এত প্রতিশ্রুতি পালন করাও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
একসঙ্গে এত প্রতিশ্রুতি পালন করা কি সম্ভব?
তাঁর দলে দুর্নীতিগ্রস্তদের ভিড় বেশি, তাঁর দলে অশিক্ষিতের সংখ্যা বেশি, তাঁর দলে ধান্দাবাজদের ঘুরঘুর, তাঁর দলে
পালটিবাজদের রমরমা তাদের চাবকে চাকর বানিয়ে রাখাটাও চ্যালেঞ্জ। সেটা যখন অনেকটা পেরেছেন বাকিটাও নিশ্চয়
পারবেন।
ভাঁড়ারের শূন্য অবস্থা প্রথম থেকেই কিন্তু মানুষের জন্য করতে চান বোঝাই যায়, তবে তার চারপাশে যেসব লোকজন,
তাদের শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও তো বাংলার মানুষ স্বস্তি পায়।