একথা ঠিক ভারতের রাজনীতিতে বিগত ৭ বছরে কোনো নেতাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেননি। বিভিন্ন পর্যায়ে মোদিবিরোধী হাওয়া উঠলেও সেভাবে কেউই তাঁর জনপ্রিয়তায় আঘাত করতে পারেনি। কারণ কেউই সেভাবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেননি। তবে একুশের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার জয় কার্যত চিন্তায় ফেলে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদিকে। কারণ রাজ্য বিধানসভার ভোটের ফলাফলে মমতা যেভাবে মোদি তথা বিজেপিকে ধাক্কা দিয়েছেন; এতবড় ধাক্কা মোদিকে আর কেউ দিতে পারেনি। কেবল তাই নয়, আগামী দিনে মমতা যে দিল্লির মসনদেও মোদিকে টেক্কা দেবেন; সেই ধারণাও জোরদার হচ্ছে।
মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এমন ক্ষমতাশালী মুখ তৈরির চেষ্টা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। ভারতের শতাব্দী প্রাচীন রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেস ২০১৩ সালে রাহুল গান্ধীকে দিয়ে সেই চেষ্টা করে। কিন্তু ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাহুলের নেতৃত্বে কংগ্রেস মুখ থুবড়ে পড়ে। উনিশের লোকসভা নির্বাচনে রাহুলকে সামনে রেখে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে মাঠে নামায়, কিন্তু তাতেও কংগ্রেস ঘরে সুফল তুলতে পারেনি।
রাহুল-প্রিয়াঙ্কা ছাড়াও অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মুলায়ম সিং যাদব, অখিলেশ যাদব, মায়াবতী, চন্দ্রবাবু নাইডু, জয়ললিতা-সহ আরও অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মোদি বিরোধী মুখ হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত মোদিকে টেক্কা দিতে পারেননি। নোটবন্দি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে তীব্র মোদি বিরোধী হাওয়াতেও তিনি অটল ছিলেন।
কিন্তু একুশের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একা লড়াইতে মোদি-অমিত শাহরা পর্যুদস্ত হয়েছে তাতে এই কথাই ঊঠে এসেছে, মোদির পালটা মুখ এই মুহূর্তে মমতা। এ ব্যাপারে তিনি অন্য সব জাতীয় স্তরের বিরোধী নেতা-নেত্রীদের পিছনে ফেলে বেশব কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছেন। একুশের নির্বাচনে তার একক লড়াই দেখে রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা মমতাকেই মোদি বিরোধী মঞ্চের নেতা বলে মনে করছেন।
জাতীয় রাজনীতিতে একটা সময় ছিল যখন ভোটে মোদিকে পর্যুদস্ত করার কথা ভাবাই যেত না। কিন্তু আজ যখন পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাডুর বিধানসভা নির্বাচনে মোদিকে রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত করা গিয়েছে, অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যের পুরসভা, পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে তখন সেই সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
তামিলনাডুতে ডিএমকে জয়ী হলেও স্টালিন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এবারেই প্রথম। অন্যদিকে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল বিজেপির অনেক আক্রমণ প্রতিরোধ করে জিতলেও রাজনীতির ক্ষেত্রে মমতার পাশে নবীন। তাই মোদির প্রতিপক্ষ মুখ হিসেবে এবং জনপ্রিয়তার নিরিখে মমতাই এখন অনেকখানি এগিয়ে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই মোদিবিরোধী নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেন। উনিশের লোকসভা ভোটের আগে এই মমতাই কলকাতার ব্রিগেড থেকে মোদিবিরোধী মহাজোটের ডাক দিয়েছিলেন। যদিও সেই জোট স্থায়িত্ব পায়নি। তবে সেই উনিশ থেকেই গুঞ্জন ওঠে, দিল্লি যাবে হাওয়াই চটি। একুশের নির্বাচনে মমতা মোদিকে পরাস্ত করার পর সেই গুঞ্জন আরও তীব্র হয়েছে।
মমতাকে প্রধানমন্ত্রী করার দাবি ধীরে ধীরে বাংলা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের জাতীয় স্তরে। যদিও দিল্লির মসনদ অনেক দূরের কথা। তবে বিশ্লেষকরা একমত যে, শুধু বাংলায় নয় ভারতের জাতীয় স্তরেও মোদিবিরোধী মুখ হিসেবে খুব দ্রুত উঠে আসছেন মমতা।
রাজ্য বিধানসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ে মোদি বিরোধীরা নতুন করে হিসাব কষতে শুরু করেছেন। তারা বুঝতে পারছেন ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে মোদিবিরোধী শক্তি একজোট হলে জয়ী হওয়া সম্ভব। ইতিমধ্যে বাংলার ভোটের পর এনসিপি প্রধান শারদ পাওয়ার বলেই দিয়েছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মোদিবিরোধীদের একজোট হয়ে লড়তে হবে। তবেই ভারত থেকে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপিকে পরাস্ত করা সম্ভব হবে। শুধু তিনি নন, মোদি বিরোধী আরও কয়েকটি দল ইতিমধ্যে মমতার নেতৃত্বে লোকসভা নির্বাচনে লড়াই করার দাবি তুলেছে।
খবর; ন্যাশনাল কনফারেন্স, ডিএমকে, আরজেডি, তেলেগু দেশম, জনতা দল (এস), ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চাও শারদ পাওয়ারের দাবির সঙ্গে একমত হয়েছে। তারাও চাইছে ইউপিএর শরিক দল চলে আসুক মোদিবিরোধী এই জোটে। কংগ্রেসেরও একটি অংশ চাইছে প্রস্তাবিত সেই জোটে বিজেপি বিরোধীদের নেতৃত্ব দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দাবিতে সহমত দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা গুলাম নবী আজাদ, কপিল সিবাল, শশী থারুর, মণীশ তেওয়ারী, রেণুকা চৌধুরী, মিলিন্দি, অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, মমতা নিজেই গত ২৮ মার্চ দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোকে চিঠি দিয়ে বিজেপি বিরোধী জোট গঠনের দাবি তুলেছিলেন। প্রশ্ন কংগ্রেস এই জোটে থাকবে কিনা, রাজনৈতিক মহলেও এ নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে যদি কংগ্রেস মমতার নেতৃত্ব মেনে নেয়, তবে এক ধরনের জোট হবে, আর না মানলেও কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে আরেক ধরনের জোট হবে। নেট দুনিয়াতেও ভারতে এবার একজন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী চাই বলে দাবি উঠেছে। মমতাকে সামনে রেখেই যে এই প্রচার শুরু তা বলাই বাহুল্য।
খুবই যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা তবে জাতীয় কংগ্রেস সমর্থন না দিলে শক্তিশালী মোদি বিরোধী মঞ্চ তৈরি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।