আর যেই ভয় পাক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে বান্দা নন। মুখ্যসচিব বদলির নির্দেশ সংবিধানের উপর কেন্দ্রের আঘাত, প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে সোজা জানিয়ে দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। খোলাখুলি জানালেন, কেন্দ্রের পদক্ষেপ বেআইনি, অসামবিধানিক।
ভারতীয় সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর কেন্দ্রের হামলা রুখতে সাহসি পদক্ষেপ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার প্রধানমন্ত্রীকে দীর্ঘ চিঠি লিখে জানালেন, ছাড়া হচ্ছে না রাজ্যের মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই সঙ্গে তুললেন গুরুত্বপূর্ণ আইনি, সাংবিধানিক, নৈতিক ও প্রচলিত পদ্ধতি ভাঙার প্রসঙ্গও।
হঠাৎ, কোনো কারণ ছাড়াই, ২৮ মে সন্ধ্যায় রাজ্যের মুখ্যসচিবকে কেন্দ্রে বদলির নির্দেশ এসে পৌঁছয় নবান্নে। সে চিঠিতে মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নির্দেশ জারি করা হয়, ৩১ মে সকাল দশটার মধ্যে কেন্দ্রের একটি মন্ত্রকে যোগ দিতে। প্রসঙ্গত, এইদিনেই অবসর নিতে চলেছেন আলাপন। অবসরের দিনটি এমন একটা সময়, যখন রাজ্য চলেছে গুরুতর সমস্যার মধ্য দিয়ে। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের দাপাদাপির মধ্যেই বিরাট সাইক্লোন ‘ইয়াস’ আছড়ে পড়ে। নানা দুর্যোগে বিধ্বস্ত রাজ্যে মুখ্যসচিবের আরও কিছুদিন পদে থাকা প্রয়োজন মনে করে কেন্দ্রকে আগেই জানিয়েছিল রাজ্য। রাজ্যের চাহিদা ছিল, মুখ্যসচিবকে তিন মাস এক্সটেনশন দেওয়া হোক। চলতি মাসের ২৪ তারিখ সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিল কেন্দ্র। মুখ্যসচিব পদেই আলাপনকে আরও তিন মাস কাজ চালিয়ে যাবার অনুমতি দিয়েছিল কেন্দ্র। সেই অনুমোদন ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। হঠাৎ ১৮০ ডিগ্রি পাল্টি খেয়ে ২৮ তারিখে এক নির্দেশিকা জারি করে কেন্দ্র। ওই চিঠিতে বলা হয়, আলাপন যেন ৩১ মে ২০২১ সকাল দশটার মধ্যে কেন্দ্রের কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রকে গিয়ে রিপোর্ট করেন। এহেন নির্দেশে হতবম্ব হয়ে যায় রাজ্য তথা দেশের সংশ্লিষ্ট মহল। ওই নির্দেশ আসার পরের দিন, ২৯ তারিখে সাংবাদিক সম্মেলন করে কেন্দ্রকে নির্দেশিকা প্রত্যাহার করতে অনুরোধ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু কেন্দ্রের দিক থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ল না। এই অবস্থায় ৩১ মে সোমবার প্রধানমন্ত্রীকে পাঁচ পৃষ্ঠার এক চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ছাড়া হবে না মুখ্যসচিবকে। কোভিড ও ঝড়ে বিপন্ন রাজ্যে বর্তমান অবস্থায় হঠাৎ এই বদলির আদেশ কেন, সে প্রশ্নও তুলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।





বেআইনি, অভূতপূর্ব ও অসাংবিধানিক
মুখ্যসচিবকে বদলির কেন্দ্রের নির্দেশ একতরফা, আইএএস ক্যাডার বিধি, ১৯৫৪ সহ এ সংক্রান্ত সমস্ত আইন, বিধি ও প্রচলিত পদ্ধতির পরিপন্থী, প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আইএএস, আইপিএস ও এ ধরনের ক্যাডার সম্পর্কিত আইন ও বিধির মূল বিষয় কেন্দ্র-রাজ্যের সহযোগিতা। সেই নীতির তোয়াক্কা না করে, রাজ্যের মতামত না জেনেই একতরফা ভাবে এমন নির্দেশ জারি করা যায় না, জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই মুখ্যসচিবের এভাবে বদলিতে রাজ্য প্রশাসন প্রবল সমস্যায় পড়বে। সেক্ষেত্রে আইএএস ও সমগোত্রীয় অফিসাররা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রী এবং অফিসারদের কথা শুনবেন কেন? সপাটে চালিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, এসব কারণেই এই বদলির নির্দেশ বেআইনি, অভূতপূর্ব ও অসাংবিধানিক এবং খামখেয়লি।
প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী বৈঠকে কেন শুভেন্দু?
প্রসঙ্গত, কোভিড মহামারি চলাকালীনই ২৬ মে বুধবার রাজ্যের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঘুর্ণিঝড় ‘ইয়াস’। ২৮ তারিখ মুখ্যমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল সফর করা শুরু করেন। এই দিনই প্রধানমন্ত্রী ওড়িশা ও বঙ্গে আকাশ থেকে পরিদর্শনের কর্মসূচি নেন। প্রধানমন্ত্রী যখন আসছেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রস্তাব করেন, ঝড় মোকাবিলার পথ ও পন্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী-মুখমন্ত্রী একান্ত বৈঠক হোক। কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাংবিধানিক বৈঠকের মর্যাদাহানি করে কেন্দ্র, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলেব। সে প্রসঙ্গেই তাঁর চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর রাজ্য সফর ও কলাইকুন্ডা মিটিংয়ের উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা জানিয়েছেন, ঝড় ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় নজিরবিহীন ভাবে সে সভায় একজন স্থানীয় বিধায়ককে ডাকা হলো। বিজেপি দলের বিধায়কের এ ধরনের সভায় থাকার কোনো অধিকারই থাকতে পারে না। এ বৈঠকে ডাকা হয়েছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং রাজ্যপালকেও। এ দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রাজ্যপালের এই বিষয়ে কিছুই করার নেই। তা সত্ত্বেও রাজ্যপাল ওই বৈঠকে থাকেন। বিজেপি বিধায়কের থাকা নিয়ে রাজ্যের আপত্তির কথা জেনেও শুভেন্দুকে বৈঠকে রাখা হয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই।
এসব সত্ত্বেও মুখ্যসচিব-সহ মুখ্যমন্ত্রী ওই সভায় গিয়েছিলেন, লিখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়। প্রধানমন্ত্রীর হাতে রাজ্যের ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত রিপোর্ট তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিব। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়েই এরপর তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান, লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কলাইকুন্ডার সভার কথা তুলে মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে সব অপপ্রচারের জবাবও দিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে শুভেন্দুর অনধিকার প্রবেশের প্রশ্নটিও সামনে নিয়ে এসেছেন। মুখ্যমন্ত্রী ২৯ তারিখেই সাংবাদিক বৈঠক করে কেন্দ্রকে এই আদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিলেন. এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে এই নির্দেশ ফিরিয়ে নিতে বললেন। এখন বল কেন্দ্রের কোর্টে। তাদের কাজ বেআইনি ও অসাংবিধানিক, এমন অভিযোগের সামনে বেসামাল কেন্দ্র এখন কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার। এই বিশেষ বিষয়টি কোন দিকে যাবে, তা দেখার জন্য আরও কিছুটা সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এ দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক কাঠামো রক্ষায় মমতার এই সাহসি পদক্ষেপ আরও বড় প্রেক্ষিত জুড়ে প্রভাব ফেলবে, এমনই মত বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই।