এবার কি বলবেন বামপন্থী বন্ধুরা? এবার কি তবে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের সমালোচনা শুরু করবেন? সম্প্রতি অমর্ত্য সেন এক সংবাদসংস্থাকে বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা মমতা ব্যানার্জীর আছে। এতবড় কথা বলেছেন অমর্ত্য সেন? প্রকাশ্যে বলেছেন তিনি, যিনি বামপন্থাকে পছন্দ করেন? হ্যাঁ, বলেছেন তিনি। কারণ তিনি বাস্তববাদী, কল্পনার পক্ষীরাজ ঘোড়ায় ওড়েন না তিনি, বালিতে মুখ গুঁজে ঝড়কে প্রতিহত করতে চান না। অমর্ত্য সেনের কথা শুনে মুখ লুকোতে চেষ্টা করবেন বামপন্থী বন্ধুরা। তাঁদের অতি প্রিয় ‘দিদি মোদি সেটিং’ কল্প স্লোগানটি যে মুখ থুবড়ে পড়তে চলেছে। কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছিলেন তাঁরা, সে মইটিও কেড়ে নিতে চলেছেন অমর্ত্য। কারণ ২০২৪-এ বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইতে তিনি আঞ্চলিক দলগুলির সংহতির কথা বলেছেন, কংগ্রেসকে কোন গুরুত্ব দেন নি। বামপন্থীদের মতো অমর্ত্য সেন দ্বৈত শত্রুর (বিজেপি + তৃণমূল) বিরুদ্ধে লড়াই-এর কথা বলেন নি। পরিষ্কার ভাষায় তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম শত্রুর কথা বলেছেন। সেই শত্রুর প্রথম নাম বিজেপি এবং শেষ নামও বিজেপি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শক্তি আছে মমতা ব্যানার্জীর। বলেছেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। বামপন্থীরা মমতার শক্তিকেই স্বীকার করতে চান নি প্রথম থেকে। ২০১১-এর পর প্রত্যেকবার তাঁরা ‘ঘুরে দাঁড়াবার’ স্বপ্ন দেখেছেন। শেষ পর্যন্ত তা দিবাস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ২০২১ তে তো তাঁরা মিলিয়ে গেলেন হাওয়ায়। ইতিহাসে যার যা স্থান, তাকে তা দিতে হবে, তাকে আমি পছন্দ করি বা না করি। এ শিক্ষা বামপন্থীরা গ্রহণ করেন নি। ২০১১ এর নির্বাচন-এর ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জীকে। সেই সময়, আমার একটি বই প্রকাশিত হয়। নাম : ‘একা এক নারী : প্রতিপক্ষ কয়েকজন’। সেই বইতে আমি মমতা ব্যানার্জীর শক্তির উৎস বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম দৃশ্যত সামান্যা এই নারীটির ভিতরে আছে অসামান্য শক্তি। তাই বংশগৌরবহীন, প্রাতিষ্ঠানিক শিলমোহরহীন এই নারী তৃণমূল থেকে উঠে এসে গঠন করেছিলেন ‘তৃণমূল’। বলেছিলাম সহজিয়া চলন-বলন মমতার শক্তির উৎস। নেতাসুলভ ‘তথাকথিত’ গুণাবলি তাঁর নেই, চাপা হাসি মাপা কথা নেই, নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা নেই। মমতার পোশাক-পরিচ্ছদ — সরুপাড় হাল্কা রঙের শাড়ি, হাওয়াই চপ্পল, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ—তাঁর শক্তির উৎস। তুলনা করেছিলাম হাঁটুর উপর ধুতি, আদুল গা গান্ধীর সঙ্গে। দুজনেই মানুষের সঙ্গে নৈকট্য তৈরির জন্য সচেতনভাবে এই পোশাক ব্যবহার করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। বলেছিলাম মমতার চলিষ্ণুতার কথা। সকালে লালগড়, বিকেলে বারাসাত, সন্ধ্যায় দিল্লি। অবিরাম পথপরিক্রমায় নারীর কিছু বাধা থাকে। মমতা সে বাধাকে গ্রাহ্য করেন নি। এই দৃশ্যত সামান্যা নারীটি আসলে পৌরুষের প্রতীক। তৃপ্তি মিত্রের নাটকের ভাষা ধার করে বলতে পারি : ‘বিদ্রোহী দলে একমাত্র পুরুষ’। আমি সে লেখায় বলেছিলাম মমতার অসামান্য স্মৃতিশক্তির কথা। রাস্তার নাম, স্থান ও ব্যক্তির নাম, সাংগঠনিক কর্মীদের নাম সব মুখস্থ তাঁর।
সে লেখায় পরিশেষে আমি বলেছিলাম মমতার সাহস বা দুঃসাহসের কথা। হঠাৎ বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। মন্ত্রীত্ব ত্যাগ, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন, মহাকরণের বদলে নবান্ন ….। এ সবের পিছনে কাজ করে অবিবেচনার আবেগ। ক্ষয়-ক্ষতি হয়। তবু পিছিয়ে পড়েন না। সিপিএমের মতো সংগঠিত, ক্যাডারভিত্তিক দলের বিরুদ্ধে লড়াইটাও ছিল দুঃসাহস। বিবেচক কিংবা স্থিতাবস্থাপন্থীরা দুঃসাহসকে হঠকারিতা বলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেন পৃথিবীর বড় বড় সভ্যতা মানুষের দুঃসাহসের সৃষ্টি, সে দুঃসাহস শক্তি ও বুদ্ধির দুঃসাহস।
আমি মমতা ব্যানার্জীর দলের কর্মী বা সদস্য নই। কিন্তু আমার নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে মমতার অন্তর্নিহিত শক্তির উৎসটি উন্মোচিত হয়েছিল। বহু অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বামপন্থীরা কি মমতার শক্তি অনুধাবন করতে পারেন নি? আমার মনে হয়, পেরেছিলেন তাঁরা, কিন্তু স্বীকার করতে চান নি লজ্জায়। মমতার মতো লড়াকু নেত্রী তৈরির চেষ্টাও করে গেছেন কংগ্রেস বা বিজেপির মতো। শেষ পর্ষন্ত ব্যর্থ হয়েছেন। তারপরে মমতার বিরুদ্ধে জেহাদ করে গেছেন তাঁরা, সেটাও ‘একা এক নারীর’ শক্তিরই প্রমাণ।
২০২৪-এর যে নির্বাচন সামনে আসছে, তাতে যদি বামপন্থীরা ‘দিদি-মোদি’কে এক আসনে বসিয়ে রাখেন, তবে তাঁদের প্রাসঙ্গিকতা থাকবে না বিন্দুমাত্র। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জীকেও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে অমর্ত্য সেনের কথা। অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার ভার নিতে হবে মমতাকে, নেতৃত্ব দিতে হবে, দূরদর্শিতা ও সহনশীলতা দিয়ে জয় করতে হবে তাঁদের। রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজির শক্তি ও দুর্বলতা প্রসঙ্গে ‘সত্যের আহ্বান’ প্রবন্ধে যে কথা বলেছিলেন, সে কথা মনে রাখতে হবে —‘বিধাতা মহাত্মার কণ্ঠে ডাকিবার শক্তি দিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি ডাক দিলেন সংকীর্ণ ক্ষেত্রে; বলিলেন — চরকা কাটো, সুতা গোনো।’
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক