ভবানীপুরে উপনির্বাচন ঘোষণা হতেই ওই অঞ্চলের এক ভদ্রলোক ফোন করে জানতে চাইলেন, আচ্ছা দাদা, কী হতে পারে ভোটে? তাঁকে বহুদিন ধরে চিনি, এক সময় সক্রিয় বাম কর্মী ছিলেন, এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে, সম্ভবত আমার থেকে বড়ই হবেন, যদিও পুরনো বাম ঘরানায় আমাকে দাদা বলে সম্বোধন করলেন। আমি একটু হেসে বললাম, এই ভোটটায় পূর্বাভাস দেওয়া সবথেকে সহজ, কারণ সাধারণ ভাবে ভোট বলতে যা বোঝানো হয়, তেমন ভোট ভবানীপুরে হচ্ছে না। রাজ্যের জনতা তৃণমূল কংগ্রেসকে জিতিয়েছে, যে দলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এটাই সবথেকে বড় ঘটনা। কিন্তু একটা বড় ঘটনাতেও দুয়েকটা অঘটন ঘটে। তেমনই ঘটেছে নন্দীগ্রামে। সারা রাজ্যে নিজের দলকে জিতিয়ে ওই কেন্দ্রে সামান্য ভোটে পরাজিত হয়েছেন খোদ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অবশ্য বারবার বলছেন, ওখানে নোংরা খেলা হয়েছে। নন্দীগ্রাম নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যেই আদালতে মামলাও হয়েছে। এ ধরনের মামলাকে ইলেকশন পিটিশন বলে। এই মামলায় আদালত মনে করলে ওই কেন্দ্রের পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই খতিয়ে দেখতে পারে, মনে করলে বাতিলও করে দিতে ওই নির্বাচনি ফল। অনেকের মনে পড়বে, এমনই মামলায় ১৯৭৫ সালে হেরেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। কিন্তু নন্দীগ্রামের কথা অন্য সময় হবে, আজ কেবল ভবানীপুরের কথা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৪ সালে তৎকালীন যাদবপুর কেন্দ্রে সিপিআইএম-এর ডাকসাইটে প্রার্থী সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে সাংসদ হন, সেটাই তাঁর সংসদীয় রাজনীতির শুরু। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে সাংসদ হবার আগেই তিনি নিজেকে একজন লড়াকু রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাংসদরা মূলত সংসদে কাজ করবেন, এই ধারণা পাল্টে তখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সূচনা করেন এক অন্য ধারার রাজনীতি। সংসদে যেমন, রাজ্যের আন্দোলন সংগ্রামেও তেমনই, তিনি হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের মুখ। যার ফলে তাঁকে বারবার মনোনয়ন দিয়েছে জাতীয় কংগ্রেস। একবার ছাড়া প্রতিবারই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটে জিতে লোকসভা সদস্য হয়েছেন। ১৯৯৮ সালে নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেস গড়ার পরেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত। তবে ১৯৯১ থেকে তিনি দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকেই দাঁড়াচ্ছিলেন। ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের সময় তিনি ছিলেন লোকসভার সাংসদ তথা রেলমন্ত্রী। ওই বছর তৃণমূল কংগ্রেস ও জাতীয় কংগ্রেসের জোট ভোটে জেতে, মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন নেত্রী মমতা। যেহেতু মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য বিধানসভার সদস্য নন্, বিধান অনুসারে ছয় মাসের মধ্যে তাঁকে কোনো ভোটে জিতে বিধানসভায় নির্বাচিত হয়ে আসতেই হতো। ২০১১ সালে বিধানসভার সাধারণ নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন তৃণমূল নেতা সুব্রত বক্সি। ওই কেন্দ্রে সুব্রতবাবু নিকটতম সিপিআইএম প্রার্থীকে প্রায় ৫০ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন। এই সুব্রত বক্সি বিধায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেন, যাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন। উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতেন, জয়ের ব্যবধান ছিল ৫৪ হাজার ২১৩। এর পর ২০১৬ সালেও ভবানীপুর থেকে বিপুল ভোটাধিক্যে জিতেছিলেন নেত্রী।

২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে অবশ্য ভবানীপুরে যেন দেখা গেল একটু অন্য হাওয়া। তৃণমূল জিতলেও ব্যবধান নেমে এসেছিল ৩ হাজার ১৬৮-তে। সকলেই জানতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার দাঁড়ালে ভবানীপুরে আবার বিরাট ব্যবধানে তিনি জিতবেন। কিন্তু নেত্রী ঠিক করেন, তিনি দাঁড়াবেন নন্দীগ্রামে। কৃষক সমাজের সঙ্গে একাত্মতা দেখাতেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ফলে ভবানীপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। শোভনবাবু বিপুল ভাবে জেতেন, ব্যবধান ২৮ হাজার ৭১৯। মুখ্যমন্ত্রী হলেও যেহেতু তিনি বিধায়ক নন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় জিতে আসতেই হবে ছয় মাসের মধ্যে। দলের সিদ্ধান্তে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ইস্তফা দিয়েছেন, উপনির্বাচনে প্রাথী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই লেখা যখন লিখছি, ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে মনোনয়ন পত্র পেশ করেছেন নেত্রী।

২০২১ সালে রাজ্য বিধানসভার সাধারণ নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিল বিজেপি। গভীর ভাবে দেখলে তৃণমূলের গভীর ভিত্তি স্পষ্ট হবে। এই ভোটে বুথ সংখ্যা ছিল ২৮৮। এর মধ্যে ১৮৯টি বুথে তৃণমূল জেতে বিজেপির পক্ষে যায় ৯৮টি বুথের ফল। একটি বুথে ফল হয়েছিল সমান সমান। দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ৮টি কর্পোরেশন ওয়ার্ড রয়েছে। এগুলি হলো, ৬৩, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৭ ও ৮২ নম্বর ওয়ার্ড। এই ৮ ওয়ার্ডের মধ্যে ৬টিতে তৃণমূল জিতেছে, সর্বাধিক ব্যবধান ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে, ২১ হাজার ৩৭৯ ভোট। বিজেপি এগিয়ে ছিল মাত্র ২টি ওয়ার্ডে, তাদের সর্বাধিক ব্যবধান ৭০ ওয়ার্ডে, ২ হাজার ৯২ ভোট। ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত, এখানে ২০০৫, ২০১০ ও ২০১৫ সালের কর্পোরেশন ভোটে বামফ্রন্টের ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী জিতেছিল। এবার সেই ওয়ার্ডটি বিপুল ভাবে তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছে। সদ্য হওয়া বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে বলাই যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেতা নিয়ে কোনোই সংশয় নেই, ব্যবধান আরও কত বাড়ে সেটাই দেখার।
সবটা শুনে আশ্বস্ত হলেন আমার সেই পুরনো পরিচিত বাম ঘরানার বন্ধু, বললেন, যাক নিশ্চিন্ত হলাম।