বেঙ্কাইয়া নাইডু একটা সময় প্রায়শই বলতেন, দিল্লিতে দোস্তি আর রাজ্যে কুস্তি এই নীতি নিয়ে কি চলা যায়। যদিও ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে আসছে। বাংলায় কংগ্রেস ও সিপিআইএম পরস্পরের হাত ধরছে আবার কেরালায় একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। যে কংগ্রেস বাংলায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়ছে সেই কংগ্রেস জাতীয় রাজনীতিতে মমতাকে সঙ্গে নিয়ে জোট গড়ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সিপিআইএম-ও এখন সেই পথেই হাঁটতে শুরু করেছে।
বাংলা বিধানসভা ভোটের সময় সিপিআইএম-এর কাছে যে তৃণমূল ছিল প্রধান শত্রু। কেবল তাই নয়, নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে একদিকে তৃণমূল অন্য দিকে বিজেপি-র বিরোধিত করতে গিয়ে আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করেছে এবং তৃণমূল ও বিজেপি উভয়েই যে ভয়ংকর সেটা বোঝাতে গিয়ে ‘বিজেমূল’ স্লোগানও তুলেছিল। কিন্তু ভোটের পর সিপিআইএম নেতারা বলতে শুরু করলেন, তাদের এই মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। সিপিআইএম দলের এটা একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল যে এমন ভুল তারা মাঝে মধ্যেই করেন এবং এর কিছুদিন পর তারা সেই ভুলকে ঐতিহাসিক ভুল ইত্যাদি অভিধায় ব্যাখ্যা করে স্বীকার করেন।
স্বাধীনতার ঠিক আগের বছর থেকে ধরলে বাংলা বিধানসভায় বামেদের বিধায়ক-শূন্য দশা এই প্রথম। এই বিপুল বিপর্যয়ের দায় এবারও স্বীকার করতে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী দ্বিধা করেন নি। বিধানসভা ভোটের প্রচারে বিজেপি-বিরোধিতায় যে তাদের পক্ষে যথেষ্ট ঘাটতি ছিল সেকথা সিপিআইএম লিখিত ভাবে দলের রিপোর্টে স্বীকার করেছে। আজ তারা এ কথা মানছেন যে, বিভিন্ন স্তরে বিজেপির তুলনায় তৃণমূলের বিরোধিতা বেশি হওয়াতে মানুষের কাছে সিপিআইএম সম্পর্কে ভুল বার্তা পৌঁছেছিল। এখনও সিপিআইএম বলছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের জেরেই রাজ্যে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মনোভাব কাটিয়ে উঠে নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে তৃণমূল। এসব স্বীকারোক্তি সিপিআইএম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণেই। দিশেহারা অবস্থা থেকেই তাদের এই বোধদয়। তারা স্পষ্ট দেখছেন বাংলার রাজনীতিতে তাদের বিন্দুমাত্র ঠাঁই নেই, কারণ দলগত অবস্থানে এ রাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপি ছাড়া তারা কোথাও আর নেই। অন্যদিকে কেন্দ্রে বিজেপি-র সঙ্গে বিরোধী জোটের লড়াইয়েও তারা গুরুত্বহীন।
তার মানে বাধ্য হয়েই ২৪-এ বিজেপিকে ঠেকাতে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তৃণমূলের সঙ্গে হাত মেলাতে আপত্তি নেই বলে জানালেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। হ্যাঁ বিমানবাবু তৃণমূলের কথা বলেন নি, কিন্তু তিনি স্পষ্টই বলেছেন, বিজেপি ছাড়া যে কোনও দলের সঙ্গেই কাজ করতে তাঁরা সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। বিমানবাবু এও জানান, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এটা বহুবার ঘটেছে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী হোক কিংবা কচ্ছ থেকে কোহিমা, বিজেপি বিরোধী সমস্ত শক্তির সঙ্গে কাজ করতে তাঁরা প্রস্তুত। বিমান বসু রাজনৈতিকভাবে কি ইঙ্গিত করছেন? তা কি শুধু একুশের বিধানসভা নির্বাচনে মূল শত্রু চিনতে ভুল নাকি দেরিতে হলেও তাদের বোধোদয় হলো? তবে তৃণমূলের প্রতি সিপিআইএম-এর সুর যে নরম তা বাম চেয়ারম্যান বিমান বসুর কথাতে স্পষ্ট। বিধানসভা ভোটে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে ফের আসার পর থেকেই বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে এককাট্টা করতে প্রস্তুত হতে শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ জুলাই ভার্চুয়াল সভা থেকে প্রকাশ্যে বিজেপিকে উৎখাত করার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ইতিমধ্যেই তৃণমূলের প্রতি কিছুটা হলেও কংগ্রেস সুর নরম করা শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাম কংগ্রেস জোট-এর আয়ু যে আর লম্বা নয় সেটাও সিপিআইএম বুঝতে পেরেছে। হয়ত সে কারণে প্রকাশ্যেই তৃণমূলের সঙ্গে সখ্যতা বৃদ্ধির চেষ্টা করার উদ্যোগ নিয়েছে বামেরা।
কিন্তু প্রশ্ন হল এতকালের তৃণমূল বিরোধীতার পরে কি জোট বাধা সম্ভব? এ বিষয়েও বিমান বসু জানান, বিজেপি ছাড়া যে কোন দলের সঙ্গে কাজ করতে তাঁরা প্রস্তুত। তারমানে তৃণমূলের সঙ্গে জোট করার একটা বার্তা সিপিআইএম প্রকাশ্যেই দিতে চাইছে। এরপরের প্রশ্ন লোকসভা ভোটে কি বামেরা তৃণমূলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করবে, না কি তারা সব আসনে প্রার্থী দেবে? বামেদের মূল শক্তি তো এখন কেরালা ছাড়া আর কোথাও নেই। বাংলা বা ত্রিপুরার কথা তো এখন বলা সাজে না। তাহলে বাংলায় লোকসভা আসনে নীতি কি হবে? বিজেপি-র প্রার্থীর বিরুদ্ধে সিপিআইএম-তৃণমূল সম্মিলিতভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বে? বাংলার ৪২টি আসন নিয়ে বামেরা কী বলে সেটাও কিন্তু দেখার বিষয়।
যদিও বিমান বসু বাংলা কিংবা ত্রিপুরাতে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূলের সঙ্গে থাকা বা না থাকা নিয়ে কোনও কথা বলেননি। বারবারই তিনি সর্বভারতীয় ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সর্বভারতীয় ক্ষেত্র থেকে বাংলা বা ত্রিপুরা বাদ পড়ে না। কথাটিকে তিনি যেভাবেই বলুন না কেন বাংলা বা ত্রিপুরার কথা এসে পড়েই। কারণ বাংলায় সিপিআইএম শূন্যস্থানে অন্যদিকে ত্রিপুরায় তৃণমূল ক্ষমতার জন্য ঝাঁপিয়েছে, সেখানে কিন্তু এখনও প্রধান বিরোধী শক্তি হল সিপিআইএম। প্রসঙ্গত ২১ জুলাই ভার্চুয়াল মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের বাম তথা সিপিআইএম-এর বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। তবে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর মমতা বিধানসভায় সিপিআইএম-এর না থাকার প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন ওরা থাকলে ভাল হত। তবে বোধদোয় হোক আর নিজেদের অবস্থার প্রেক্ষিতেই হোক মোদীর বিরোধিতায় সিপিআইএম ছুৎমার্গ ছেড়ে যে মমতার সঙ্গে জোটে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা দল হিসেবে সিপিএমের পক্ষে বিরাট নীতিবদল।
শূন্য হয়ে তবে সিপিএম চিনতে পারল ওদের এক নম্বর শত্রু কে। সিপিএমের পুরো ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই
বিলম্বিত বোধোদয়। সেটা নেতাজি হোক, দেশের স্বাধীনতা হোক আর মমতাই হোক।