বছর পাঁচ আগে পঞ্চায়েত নির্বাচনের কয়েক মাস বাকি থাকতেই মন্ত্রিসভায় রদবদল ঘটিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন মন্ত্রিসভার হেভিওয়েট সদস্য পূর্ণেন্দু বসুকে কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতর থেকে সরিয়ে কারিগরি শিক্ষা দফতরের মন্ত্রী করেছিলেন। কারণ, কৃষি দফতরের কাজে অসন্তুষ্ট ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্ন সূত্রে খবর, যে ২০টি দফতর পরিকল্পনার মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছে, তার মধ্যে অন্যতম হল কৃষি। এর আগে প্রশাসনিক মূল্যায়ন বৈঠকে কৃষি দফতরের কড়া সমালোচনা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলন, ‘দ্রুত কাজ শেষ করুন, না পারলে অর্থ দফতরের কাছে টাকা ফেরত দিন’। ওই হুঁশিয়ারির দু-দিনের মধ্যেই মন্ত্রিসভায় রদবদল সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি হয়।
এরপর গত জুন মাসে মুখ্যমন্ত্রী সেচ দপ্তরের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তখন ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ক্ষতবিক্ষত সুন্দরবন ও দক্ষিন ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সেচ দপ্তরের তরফে প্রতিবছর বাঁধ সারানো হচ্ছে। আর তা দুর্যোগ এলেই ভেঙে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করা হচ্ছে। কিন্তু তা জলে যাচ্ছে।’ গোটা ঘটনায় ৩ দিনের মধ্যে রিপোর্ট চেয়েছেন মমতা। আমফানের সময় ভেঙে পড়া গাছগুলি সম্পর্কেও রিপোর্ট চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রসঙ্গত আমফানের সময় সেচ মন্ত্রী ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এখন বিজেপিতে। মনে করা যায়, নাম না করে শুভেন্দুকেই দুষেছেন মমতা।
তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর গত বুধবার প্রথম প্রশাসনিক বৈঠকে অতিরিক্ত খরচের জন্য তিন দফতরের মন্ত্রীকে বকুনি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সব দফতরকেই খরচের রাশ টানার জন্য সতর্ক করে বলেন, সম্মিলিত ভাবে যে অর্থ সরকার বাঁচাতে পারবে, তা সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয় করা হবে।
প্রসঙ্গত সেদিন তিনি পূর্ত, সমবায়, দমকল ও সেচ দপ্তরের কাজেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর ক্ষোভের কারণ, রাজ্যের এই আর্থিক অবস্থার মধ্যেও এসবের তোয়াক্কা না করেই বেহিসাবি খরচ করছে বেশ কয়েকটি দফতর। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি আলিপুরে একটি পরিকাঠামো নির্মাণ ঘিরে এ দিন পূর্ত দপ্তরকে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়। বিচার বিভাগ থেকে পূর্ত দপ্তরের কাছে আদালত সংক্রান্ত একটি নির্মাণের প্রস্তাব আসে। পূর্ত দপ্তর তাতে অনুমোদনও দেয়। মুখ্যমন্ত্রী জানতে চান মন্ত্রিসভাকে না জানিয়ে এই ধরনের নির্মাণ করা হচ্ছে কেন? এরপরই মুখ্যমন্ত্রী বিচার এবং পূর্ত দু’টি দপ্তরের মন্ত্রী মলয়কে সতর্ক করেন। একই সঙ্গে এদিন একটি ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্প নিয়ে সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী অরূপ রায়কেও মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বিধাননগর এলাকার একটি ক্লাবকে অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র দেওয়ার জন্য অর্থ দপ্তরে ফাইল পাঠিয়েছিলেন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। তিনিও মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভের মুখে পড়েন।
বলাই বাহুল্য; করোনা ও লকডাউনের জেরে রাজ্যের কোষাগারে পড়েছে টান। কিন্তু সরকারকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালাতে হচ্ছে। স্বভাবতই এই পরিস্থিতিতে নতুন পরিকাঠামো নির্মাণ বা সংস্কার বাবদ খরচ থেকে যতটা সম্ভব বিরত থাকারব চেষ্টা করবে সরকার। যদিও পরিকাঠামো ক্ষেত্রের খরচ কমিয়ে দিলে স্থায়ী সম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া বা তার রক্ষণাবেক্ষণের প্রক্রিয়া ধাক্কা খেতে পারে। রাজ্যের অর্থনীতির উপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে পরিকাঠামো ক্ষেত্র সমস্যায় পড়তে পারে, এমন কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ার কথা বলেছে সরকার অন্যদিকে অতিরিক্ত খরচ করবে না।
তৃতীয়বার বাংলায় ক্ষমতায় এসে যে কোনওরকম ভুল-ত্রুটির বিষয়ে সতর্ক থাকতে চান মুখ্যমন্ত্রী মমতা। প্রশাসনিক কাজকর্ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনও খামতি রাখতে চান না তিনি। তাই মন্ত্রীদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, দফতরের কাজে কোনও গাফিলতি নয়। কিন্তু তা স্বত্বেও কয়েক জন মন্ত্রীর কাজে অসন্তুষ্ট হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরকে না জানিয়ে বড় কোনও খরচ করা যাবে না বলে মন্ত্রীদের সাফ নির্দেশ দিয়েছেন মমতা।
জানা গিয়েছে, খরচ নিয়ে পূর্ত, সমবায়, দমকল ও সেচ দফতরের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষত; সেচমন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্রকে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ধমক দেন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে দিল্লিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল সেচমন্ত্রীর। সেটা না করায় মুখ্যমন্ত্রী এদিন মন্ত্রীর কাছে দিল্লি না যাওয়ার কারণ জানতে চান। এরপরেই তিনি মন্ত্রীকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, ঘাটাল, দিঘা ও সুন্দরবন মাস্টার প্ল্যান নিয়ে মন্ত্রীদের দল দিল্লি গিয়ে দেখা করবেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে। ডিভিসি-ফারাক্কা নিয়েও তাঁরা কথা বলবেন।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন সমবায় ব্যাঙ্কের কাজ ঠিকমতো হচ্ছে না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রচুর বেনামি অ্যাকাউন্ট আছে ব্যাঙ্কগুলিতে। সেগুলির অডিট করা হয়নি কেন? সমবায় মন্ত্রীকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন তিনি। সমস্ত মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা, তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনও বড় খরচ করা যাবে না।