প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির বাঘা বাঘা নেতারা বাংলায় প্রচারে ছুটে এসেছিলেন। সবাই বলছিলেন, তৃণমূল শেষ, ক্ষমতায় আসছে বিজেপি। কিন্তু নির্বাচনের ফলে আশাভঙ্গ হয় বিজেপির। যাবতীয় হিসেব–নিকেশ ওলোট পালট করে ২৯৪ আসনের মধ্যে ২১৩টি আসনে জয়ী হয় তৃণমূল। বিজেপি-র কপালে জোটে মাত্র ৭৭টি আসন।
বিজেপি-র এ ধরণের পরাজয়ে রাজ্যের রাজনীতির ছক উল্টে যায়। তৃণমূলের দলত্যাগীরা বুঝতেই পারেননি যে বিজেপি এভাবে পর্যুদস্ত হবে। মোহভঙ্গ হওয়ায় তাদের মধ্যে অনেকেই এখন দিদির আশ্রয়ে ফিরতে চাইছেন। ইতিমধ্যে সোনালী গুহ, দিব্যেন্দু বিশ্বাস, সরলা মুর্মু, বাচ্চু হাসদা প্রমুখ তৃণমূলে ফিরে যাওয়ার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন করেছেন। রাজ্যের প্রাক্তন বনমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ও নাকি তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। প্রবীর ঘোষাল দুঃখ করে বলেছেন, ‘আমার মা মারা যাওয়ার পর বিজেপির একজন নেতাও আমাকে ফোন করে খোঁজ খবর নেননি, আমার বাড়িতে এসে সমবেদনা জানানো, সেটা আশা করিনি।’
এদিকে নির্বাচন পরবর্তী হিংসার কারণে ঘরছাড়া হয়েছিলেন বহু বিজেপি কর্মী ও সমর্থক। কোনও বিজেপি নেতা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেননি। কিন্তু প্রমাণিত সত্য, ছোট-বড়ো-মাঝারি বিজেপি নেতাদের জন্যই এই সাধারণ বিজেপি সমর্থকরা ঘরছাড়া। এখন অবশ্য তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্যোগেই তারা ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে ত্রিপল লুঠের অভিযোগ উঠেছে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে। শুধু শুভেন্দুই নয়, ত্রাণ-সামগ্রী লুঠের অভিযোগ উঠেছে শুভেন্দুর ভাই তথা কাঁথি পুরসভার প্রাক্তন পৌরপ্রধান সৌমেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেও। কাঁথি থানায় ওই অভিযোগ দায়ের করেছেন কাঁথি পুরসভার পৌর প্রশাসক বোর্ডের সদস্য রত্নদ্বীপ মান্না। পাশাপাশি সেচ দফতরে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে ‘শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ’ রাখাল বেরা নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সেচ দফতরে সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে বহু লোকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন রাখাল। প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের সেচ দফতরের মন্ত্রী ছিলেন শুভেন্দু।
বিজেপির এই ঘেঁটে যাওয়া অবস্থায় বাংলার বাইরেও তৃণমূল কংগ্রেসের বিস্তার ঘটাতে উদ্যোগী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলা বাহুল্য ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়েই নেত্রীর এই উদ্যোগ। তাছাড়া বিধানসভা নির্বাচনে প্রবল পরাক্রমশালী বিজেপিকে একক ক্ষমতায় বাংলা থেকে বিদায় করার পর তৃণমূল নেত্রী এখন সর্বভারতীয় স্তরে নিজেকে বিজেপি-বিরোধী অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী। তিনি জানেন আগামী দিনে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান দেশের বহু মানুষ। যদিও সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মমতা নতুন মুখ নন। সেই উচ্চতায় তিনি অনেক আগেই উঠে এসেছেন। তবে তাঁর দল তৃণমূল এখন পুরোপুরি বাংলা কেন্দ্রিক। এক সময়ে ত্রিপুরায় তৃণমূলের উত্থান হলেও পরে সেখানে তৃণমূল তার সংগঠন ধরে রাখতে পারেনি। একই ভাবে মণিপুর-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য কয়েকটি রাজ্যে তৃণমূলের সংগঠন তৈরি হলেও পরে তা টেকেনি। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে হলে বাংলার বাইরে তৃণমূলের সংগঠন দরকার।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবে দেশের মধ্যে অন্যতম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিজেপি বিরোধী দলগুলিকে একসঙ্গে লড়াইয়ের ডাকও দিয়েছেন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে কলকাতায় একমঞ্চে মমতা সারা দেশের বিজেপি বিরোধী নেতৃত্বকে হাজির করেছিলেন। যদিও লোকসভা ভোটে বিজেপি বিপুল জয় পায়। কিন্তু বিধানসভা ভোটে সেই গেরুয়া হাওয়াকে প্রতিহত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাছাড়া দেশের বহু রাজ্যে বিজেপি তাদের ক্ষমতা হারাতে শুরু করেছে। করোনাকালে বিজেপির ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভ শুরু হয়েছে সারা দেশজুড়ে। এতে স্পষ্ট যে মোদি একাই শুধু তাঁর জনপ্রিয়তা হারান নি, বিজেপি দলের ওপরও মানুষ ভীষণভাবে বিরক্ত।
যদিও লোকসভা ভোটের তিন বছর বাকি। কিন্তু বাংলায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে হ্যাটট্রিক করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সেই সুযোগটি কিন্তু এসে গিয়েছে। উল্লেখ্য, বিজেপি বিধানসভা ভোট যুদ্ধে যেভাবে মমতার বিরুদ্ধে সেরা অস্ত্র হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে লড়িয়ে দিয়েছিল, তাতে লড়াইটা মমতা বনাম মোদি হয়ে উঠেছিল। মোদি নজিরবিহীনভাবে প্রায় ১৫টি জনসভা করেন। বিজেপির কেন্দ্রী নেতা-মন্ত্রিরা তিনমাস বাংলায় রোজ যাতায়াত করেও মমতাকে টলাতে পারেন নি। সাম্প্রতিককালে মোদিকে এত বড় ধাক্কা কেউ দিতে পারেননি। কাজেই লোকসভা ভোটে বিজেপিবিরোধী শিবিরের মুখ হয়ে ওঠাটা মমতার পক্ষে কঠিন কাজ নয়। কারণ তিনি তাঁর যোগ্যতা প্রমাণ করে দিয়েছেন।
যদিও জাতীয় স্তরে জোট-রাজনীতির অভিজ্ঞতা মোটেও ভাল নয়। মানুষ স্থায়ী সরকার চায়। সেক্ষেত্রে জোট জোরদার না হলে বিজেপির লাভ। তবে জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারলে দেশে ৬৬ শতাংশ বিজেপি-বিরোধী ভোট পাওয়া সম্ভব। সম্প্রতি বাংলার মানুষ তার প্রমাণ দিয়েছেন। কংগ্রেস-সিপিএমকে নিশ্চিহ্ন করার খুব একটা ইচ্ছে যে মানুষের মধ্যে অনেককাল ধরে ছিল তা হয়ত নয়। কিন্তু বাংলার মানুষ বিজেপিকে মানতে পারেনি, পাশাপাশি তারা বুঝেছিল বিজেপি-বিরোধী ভোট যদি ভাগ হয়, তবে লাভ গেরুয়া শিবিরের। তাই সবাই জোড়াফুলে ভোট দিয়েছেন। হয়ত অনেক বামেরাও দিয়েছেন, যারা নীতিগতভাবে তৃণমূলকে পছন্দ করেন না, কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল, ‘নো ভোট টু বিজেপি’। ‘মুখ’ ভোটে সব সময়েই একটা বড় বিষয়। বাংলার ভোটে বিজেপিকে হারাতে মমতার মুখের কোনও বিকল্প এখনও নেই। বলা যায় সর্বভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও মমতা সেই ক্ষমতা রাখেন। বস্তুত ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদিকে হারাতে হলে বাংলার মানুষের এই সিদ্ধান্তকে সব বিরোধী দলকেই স্বীকৃতি দিতে হবে। কংগ্রেসকেও তাদের ইগো ছাড়তে হবে। এটা সব বিরোধী দলকেই মানতে হবে বিজেপি এখন সবচেয়ে বেশি ভয় পায় মমতাকে। তবে তৃণমূল দলকে যত তাড়াতাড় সম্ভব আঞ্চলিক রাজনীতির তকমা হটিয়ে সর্বভারতী স্তরে পৌঁছাতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই লক্ষ্যেই নতুন করে দল সাজিয়েছেন, রদবদল ঘটাচ্ছেন।
বিজেপি ভয় পায় বলেই সব আক্রমন মমতার বিরুদ্ধে।
এই মুহুর্তে বিজেপির কাছে মমতা অন্যতম প্রধান শত্রু, সেটা মমতার পক্ষে আগামী দিন জাতীয় স্তরে মোদি বিরোধী মঞ্চে
সুবিধা এনে দেবে, মমতা নেতৃত্বের দাবিদার হয়ে উঠবেন।