২০২১-এর বিধানসভা ভোটের গভীর বিশ্লেষণ শুরু হতে না হতেই রাজ্যে বিজেপির শিরদাঁড়া দিয়ে নামতে শুরু করেছে ঠান্ডা স্রোত। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া বিধানসভা ভোটের নিরিখে রাজ্যের ৩২ লোকসভা কেন্দ্রেই এগিয়ে তৃণমূল। ২০১৯ সালে কিছুটা ভালো ফল করলেও বছর দুয়েকের মধ্যেই বিজেপি পিছিয়ে গেল দশ কদম। বিজেপির অনেক রথী-মহরথীই এই যুদ্ধে কাত, ফলাফলের বিশ্লেষণে ধরা পড়ছে সেই চিত্রই।
গত লোকসভা ভোট হয়েছিল এক বিশেষ পরিস্থিতিতে। ২০১৯ সালের প্রথম দিকে ঘটে যাওয়া পুলওয়ামা-বালাকোটের পরিস্থিতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদের পালে হাওয়া দিয়েছিল বিজেপি। নরেন্দ্র মোদির দলকে সমর্থন আর দেশপ্রেম একই, এমনই বয়ান চালু করার চেষ্টা হয়েছিল। সে প্রচারের বন্যায় কিছু মানুষ যে ভেসেছিলেন, তা বোঝা গিয়েছিল সে সময়ে। এ রাজ্যেও সে হাওয়ায় বিজেপি ১৮ আসনে জয় হাসিল করে, বিধানসভা ভোটে রাজ্য দখলের খোয়াব দেখা শুরু করে। অচিরেই কিন্তু সে স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছে, এ বারের নির্বাচনে রাজ্য বিধানসভার ২১৩টি আসন জিতে তৃতীয় বারের জন্য মসনদে বসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, লোকসভা কেন্দ্রের নিরিখেও বিজেপি খেয়েছে প্রবল ধাক্কা।
বিধানসভা ভোটের নিরিখে লোকসভা
পশ্চিমবঙ্গে মোট লোকসভা আসন ৪২টি। ২০১৯ সালে ২২ আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি পেয়েছিল ১৮ আসন। অপর দু’টি আসন ছিল কংগ্রেসের। এবার কিন্তু ৩২ টিতেই এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। অর্থাৎ সংখ্যার গণনায় ২০১৯ সালের তুলনায় বাড়তি ১০টি লোকসভা ক্ষেত্রে এগিয়ে গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। প্রকৃতপক্ষে অঙ্কটা এরকম—
গতবার জেতা ২২ আসনের ২০টি এবারও ধরে রাখতে পেরেছে তৃণমূল। ২০১৯ সালে জেতা দু’টি লোকসভা ক্ষেত্রে এবার হেরেছে তৃণমূল, জিতেছে বিজেপি। এই দুই আসন হলো আরামবাগ ও কাঁথি। আবার গতবারে বিজেপির জেতা ১০ আসন এবার তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছে। তৃণমূলকে এগিয়ে রেখেছে ২০১৯-এ কংগ্রেসের জেতা দুই আসনও। তাই তৃণমূল এবারে ২২ – ২ + ১০ + ২ = ৩২ লোকসভা ক্ষেত্রে লিড পেয়েছে।
বিজেপি ২০১৯ সালে জেতা ১৮টির মধ্যে দশটিতেই হেরেছে, কিন্তু গতবার তৃণমূলের জেতা দুই আসনে এবার লিড পেয়েছে নরেন্দ্র মোদির দল (আরামবাগ ও কাঁথি)। বিজেপির অঙ্কটা হলো, ১৮ – ১০ + ২ = ১০।
এখানে উল্লেখ্য, গতবার দু’টি আসনে জয় পেয়েছিল কংগ্রেস (মালদহ দক্ষিণ ও বহরমপুর)। এই দুই আসনে সেবার অবশ্য বামফ্রন্টও কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিল।
২০২১-এর নিরিখে তৃণমূল এগিয়ে ৩২টিতে
তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, মালদহ উত্তর ও মালদহ দক্ষিণ, জঙ্গিপুর, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ, কৃষ্ণনগর, ব্যারাকপুর, দমদম, বারাসাত, বসিরহাট, জয়নগর, মথুরাপুর, ডায়মন্ড হারবার, যাদবপুর, কলকাতা দক্ষিণ, কলকাতা উত্তর, হাওড়া, উলুবেড়িয়া, শ্রীরামপুর, হুগলি, তমলুক, ঘাটাল, ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান-পূর্ব, বর্ধমান-দুর্গাপুর, আসানসোল, বোলপুর ও বীরভূম লোকসভা ক্ষেত্রে। ৪২টি লোকসভা ক্ষেত্রের মাত্র ১০ লোকসভা কেন্দ্রে এগিয়ে কেন্দ্রের শাসক দল।
যেসব লোকসভা আসনে তৃণমূল গতবার জিতেছিল, এবার হেরেছে আরামবাগ (তপ) ও কাঁথি।
২০২১-এর নিরিখে বিজেপি এগিয়ে
বিজেপির এগিয়ে থাকা লোকসভা কেন্দ্রগুলি হলো, কুচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, রানাঘাট, বনগাঁ, আরামবাগ, কাঁথি, পুরুলিয়া ও বিষ্ণুপুর।
যেসব লোকসভা আসনে বিজেপি গতবার জিতেছিল, এবার হেরেছে এমন আসন রয়েছে দশটি। আসনগুলি হলো, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, মালদহ উত্তর, ব্যারাকপুর, শ্রীরামপুর, ঝাড়গ্রাম (তপ উপ), মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান-দুর্গাপুর ও আসানসোল।
কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট গভীর শূন্য
২০১৯-এ কংগ্রেস জিতেছিল বহরমপুর ও মালদহ দক্ষিণে। এবার এই দুই আসনে তৃণমূল এগিয়ে। বামফ্রন্ট সেবার ওবং এবার কোনো লোকসভা আসনেই এগিয়ে নেই।
বিজেপি-র এগিয়ে থাকা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে দার্জিলিংয়ের মতো কেন্দ্রও, যেখানে তিন পাহাড়ি বিধানসভা আসন, দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্শিয়াংয়ে প্রার্থী দেয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। আগামী লোকসভা ভোটে পুরো দার্জিলিং কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী দিলে ফল নিশ্চয়ই অন্যরকম হবে। আবার জলপাইগুড়ির মতো লোকসভা ক্ষেত্রে বিজেপির লিড মাত্র ৬,৯৯৫। বনগাঁ লোকসভা ক্ষেত্রে বিজেপি এগিয়ে মাত্র ১৪,৪৬৮ ভোটে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের কেন্দ্র মেদিনীপুরে তাদের ফল খুবই খারাপ হয়েছে এই ভোটে। দিলীপবাবুর জেতা মেদিনীপুর কেন্দ্রে এবার তৃণমূল এগিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ভোটে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চোধুরি (রায়গঞ্জ) দেড় লক্ষ ভোটে, সুকান্ত মজুমদার (বালুরঘাট) ৮৮ হাজার ভোটে, খগেন মুর্মু (মালদহ উত্তর) পৌনে তিন লক্ষ ভোটে পিছিয়ে পড়েছেন। পিছিয়ে গিয়েছেন অর্জুন সিংহ (ব্যরাকপুর), লকেট চট্টোপাধ্যায় (শ্রীরামপুর), কুনার হেমব্রম (ঝাড়গ্রাম), সুভাষ সরকার (বাঁকুড়া), এস এস আহলুওয়ালিয়া (বর্ধমান-দুর্গাপুর)। অন্যতম কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় (আসানসোল) পিছিয়ে গিয়েছেন প্রায় ৫৪ হাজার ভোটে। সব মিলিয়ে বলাই যায়, বিজেপির চাকায় হাওয়া বেড়িয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, বাংলায় এই নির্বাচনই বিজেপির শেষের শুরু।