রাজ্যে লকডাউন শিথিল হলে একাধিক ইস্যুতে গেরুয়া শিবির রাস্তায় নামবে বলে জানিয়েছে। জেলায় জেলায় তারা আন্দোলন সংগঠিত করবে বলেও খবর। ওদিকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শুধু রাস্তায় নেমে আন্দোলনই নয়, বিধানসভায় সরকারের দমবন্ধ করা হবে। তবে বিজেপির অন্দরে দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধীতার চড়া সুর শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়। তাঁর নেতৃত্ব মানতে নারাজ বহু বিজেপি কর্মী-সমর্থক।
তবে বিজেপির অন্দরের কোন্দল কিংবা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি নিয়ে কোনও ভাবান্তর নেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি ২০২৪-এর ছক সাজাতে শুরু করে দিয়েছেন। যদিও এখনও তিন বছর বাকি লোকসভা ভোটের, তার আগেই তিনি তৃণমূল দলকে জাতীয় স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য দলের আগাগোড়া ঢেলে সাজাতে শুরু করেছেন। সদ্য জনগণের রায়ে ক্ষমতায় ফিরে আসা দলের উদ্দিপনাকে কাজে লাগাতে চাইছেন। এখন থেকে তাঁর লক্ষ্য যে দিল্লি তা তিনি স্পষ্ট ভাষাতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন।
বাংলার বিধানসভা ভোটে পরাস্ত হওয়া ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের পুরসভা, পঞ্চায়েত ভোটেও বিজেপি শূন্যস্থানে গিয়ে ঠেকেছে। করোনাকালে দেশজুড়ে বিজেপি বিরোধী হাওয়া তুমুল। অন্যদিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থানকারী নরেন্দ্র মোদির গ্রাফও তলানিতে এসে ঠেকেছে। দেশব্যাপী যে কৃষক আন্দোলন মোদি সরকারকে গত ছ’মাস ধরে প্রবল চাপে রেখেছে আগামী ৯ জুন সেই কৃষক আন্দোলনের নেতা রাকেশ টিকাইতের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বৈঠক ঘিরে ইতিমধ্যে জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
কৃষক দরদী মমতা পাঞ্জাব-হরিয়ানার কৃষকদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কৃষক নেতারা তার প্রতিদানে ভোটের আগে রাজ্য এসে মমতার হয়ে সভা করেছেন। কৃষকদের অধিকার রক্ষা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলন নিয়ে সকলেরই ধারণা রয়েছে। এক বছর আগে এই কৃষক আন্দোলনকে হাতিয়ার করে মমতা মোদি-বিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য গড়তে চেয়েছিলেন। আন্দোলনের রাশ নিজের হাতেই রাখতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেস সেখানে থাকুক ডিএমকে অথবা এনসিপি বা এসপি-র মতো করে— এই কৌশল নিয়েই এগোতে চেয়েছিলেন।
সিঙ্গুরের কৃষি আন্দোলন থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কেন্দ্রে চলে আসেন মমতা। ফলত মমতা আরও বেশি করে দলকে কৃষক আন্দোলনমুখী করে তুলতে চেয়েছিলেন। প্রত্যাশিত ভাবেই কৃষি আন্দোলনকে হাতিয়ার করেই দলের অভিমুখ ঠিক করেন মমতা। বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইনের বিরোধিতায় রাজধানী যখন উত্তাল, সে সময় তাঁদের সমর্থন জানিয়ে মমতা টুইট করেছিলেন। পাশে থাকার বার্তা দিতে দলের রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনকে দিল্লি-হরিয়ানা সীমানায় বিক্ষোভকারী কৃষকদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফোনে নিজেও আন্দোলনকারী কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন মমতা। তখন থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল, তাঁর সাবেক আন্দোলনের ভিত্তিভূমিতেই দলকে ফের নিয়ে যেতে চাইছেন মমতা।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মুহুর্তে বাংলায় মমতা সরকারের বিপুল জয়ের পর ফের মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন জানানো, তাদের নেতার সঙ্গে বৈঠক নতুন মাত্রা যোগ করবে। কৃষক নেতার সঙ্গে বৈঠক ফের কৃষক আন্দোলনে শান দেওয়া তো বটেই তার চেয়ে অনেক বেশি মোদি বিরোধিতা। রাজনৈতিক মহলের মতে, সর্বভারতীয় স্তরে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করতে মমতার কাছে কৃষক আন্দোলন বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে চলেছে। এই বৈঠকে শুধু কৃষকদের অধিকার রক্ষার লড়াই নয়, ২০২৪-র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে। কৃষক নেতা রাকেশ টিকাইতের সঙ্গে বৈঠক তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কৃষক নেতার সঙ্গে মমতা গোটা দেশে কৃষক আন্দোলন জোরদার করা নিয়ে আলোচনা করবেন। এই আলোচনাই সর্বভারতীয় নেত্রী বাছাই করতে মমতাকে বেশ কয়েক ধাপ সামনে এগিয়ে রাখবে।
একুশের বিধানসভা ভোটের জয় মমতাকে ২০২৪-এর টার্গেট সামনে এনে দিয়েছে। এবার টার্গেট ২০২৪-র লোকসভা ভোট। সম্প্রতি সাংগঠনিক বৈঠকে নেত্রীর বেশ কিছু রদবদল তাঁর লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে দেয়। রাজ্য কমিটিতে একাধিক নতুন মুখকে তুলে আনা থেকে শুরু করে এক ব্যক্তি এক পদের সিদ্ধান্ত নেওয়া এরকম একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যে পুরোটাই ২০২৪-কে টার্গেট করেই তা স্পষ্ট ভাবেই বোঝা যায়।
কৃষক আন্দোলনের বিষয়টি মমতার খুবই স্পর্শকাতর। সংসদে জোর করে বিল পাশ করানোর ঘটনাটিকে তিনি একুশের ভোটের আগেই বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ দিতে চেয়েছিলেন। অন্নদাতাদের আন্দোলনকে তিনি সমর্থন জানিয়েও দলের নীতির পরিপন্থী হওয়ায় বন্ধে সায় দেন নি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভিন্ন সভাতেও কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তৃণমূলনেত্রী। ধানের শীষ, শাক-সবজি দিয়ে সাজানো ডায়াসের পিছনে দাঁড়িয়ে ভাষণ শুরু করেন মমতা। নবান্নের ধান ছুঁয়ে সেখানেই কৃষকদের পাশে থাকার শপথ নেন তিনি। আগামীদিন কৃষক নেতার সঙ্গে বৈঠকে তিনি তাদের আন্দোলনকে যেমন ১০০ ভাগ সমর্থন জানাবেন সেই সঙ্গে ২০২৪-এর জন্য মোদি বিরোধী আন্দোলনের ভিত্তিও স্থপন করবেন।
কৃষক আন্দোলন বিষয়টি মমতার কাছে খুবই স্পর্শকাতর। সিঙ্গুরের কৃষি আন্দোলন থেকেই তাঁর উত্থান বা ক্ষমতায় আসা।
ফলে তিনি কৃষক আন্দোলনকে ২০২৪-এর জন্য কেবল সমর্থন নয় পাশে থাকার চেষ্টা করবেন।