কেবল জাতীয় স্তরের বিজেপি নেতারাই নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁকে হারাতে মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু তিনি একার কৃতিত্বে বঙ্গ জয় করে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরেছেন। সেই জয় যতখানি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যময়, তেমনি ওই জয় তাঁকে জাতীয়স্তরের নেত্রীতে পরিণত করেছে।
তখন থেকেই রাজনৈতিক আঙিনায় এই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে, তাহলে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদি বিরোধী লড়াইয়ের মুখ হবেন? একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদী-শাহ সহ গোটা বিজেপি পরিবারকে হারিয়ে দেওয়ার পর থেকেই জাতীয় স্তরে মমতার গ্রহণযোগ্যতা চড়চড় করে বাড়তে শুরু করেছে। কেবল তাই নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসানোর জন্য জোরালো দাবি উঠতে শুরু করে।
ঠিক এই অবস্থায় ২০২৪-র লোকসভা নির্বাচনের ঘুঁটি সাজাতে এখন মাঠে নেমে পড়েন মোদী বিরোধী ভোটকুশলী পিকে। প্রসঙ্গত, তিনি মহারাষ্ট্রে গিয়ে এনসিপি সভাপতি শরদ পওয়ারের সঙ্গে দেখা করেন। পাওয়ার-পিকের সেই বৈঠকের পর থেকেই কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে আগামী লোকসভা ভোটে বিজেপি-বিরোধী জোটের জল্পনা নতুন করে গতি পায়। সম্প্রতি মুম্বইয়ে শরদের বাসভবনে পাওয়ার-পিকের দ্বিতীয় দফার বৈঠকের পর মোদি বিরোধী লড়াইয়ের মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টিতে নতুন করে সরগরম দেশের রাজ্য-রাজনীতি।
বাংলায় বিজেপির বিজয় রথ ঠেকানোর পর বিরোধী শিবরে পিকের দর এখন আকাশ ছোঁয়া। রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলায় বিজেপির ধস নামার পর এবার দিল্লীর মসনদ থেকে নরেন্দ্র মোদীকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোর। পিকে শরদ পাওয়ারকে বলেছেন বড় আঞ্চলিক শক্তিগুলিকে একজোট করে শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষ গড়তে পারলেই ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে মোদীকে কাত করা সম্ভব। প্রসঙ্গত; যশবন্ত সিনহা প্রথম ২০১৮ সালে এই মঞ্চের গঠন করেছিলেন। এই মুহুর্তে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বড় দায়িত্বে আছেন।
এখনব প্রশ্ন পিকের প্রস্তাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলি এককাট্টা হয়ে আদৌও কি তৃতীয় শক্তি জোটবদ্ধ হতে পারবে? কয়েক দিনের মধ্যে ফের বইঠকে বসছেন বেশ কয়েকজন শীর্ষ স্থানীয় বিরোধী নেতা। সেখানে যশবন্ত সিনহারও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এখন দেখার শীর্ষ বিরোধী নেতারা প্রশান্ত কিশোরের প্রস্তাবকে কতটা প্রাধান্য দেন। এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত, বিজেপির বিরুদ্ধে প্রশান্ত কিশোরের কৌশলনীতি এখনও পর্যন্ত ৯০ শতাংশ সফল হয়েছে। একের এক রাজ্যে তার স্ট্র্যাটেজিতে জয় এসেছে। এই অবস্থায় মোদী বিরোধী নেতারা তাঁকে অস্বীকার করতে পারবে না, তবে প্রশ্ন কতটা এককাট্টা হতে পারে এখন সেটাই দেখার।
এদিকে বাংলায় বিজেপিকে হারানোর পরেই জাতীয় স্তরে মমতার গ্রহণযোগ্যতা শুধু তুঙ্গেই নয়, কেন্দ্রের মোদী সরকার বিরোধী জোট গড়ার আহ্বান তিনি আগেই জানিয়ে রেখেছেন। যে কারণে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ তখন থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে মোদীর চ্যালেঞ্জার হিসাবে ভাবতে শুরু করেন। বাংলা জয়ের পর তৃণমূল নেত্রীর প্রশংসা করে মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেসের অভিজ্ঞ নেতা কমল নাথ বলেছিলেন, জাতীয়স্তরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
মমতা চব্বিশের লড়াইয়ে মোদির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠতেই সলতে পাকানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বাংলার বিধানসভা ভোট লড়াইয়ে যে সমস্ত বিজেপি বিরোধী দল মমতার পাশে দাঁড়িয়েছিল মমতা সেই সব নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তাঁরাও যোগাযোগ করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রধান বিরোধী মুখ হওয়া নিয়ে মমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রাহুল গান্ধী। এখন রাহুল সেই লড়াই থেকে বহুদুরে। অন্যদিকে মমতা জাতীয় স্তরের নেত্রীর পদে আরও কয়েক কদম এগিয়ে এসেছেন।
মমতা শুধু ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে মোদি বিরোধী লড়াইয়ের মুখ নন। ২০২২-এ উত্তরপ্রদেশে বিজেপিকে রুখতে মমতাকে পাশে চাইছেন বিরোধী নেতারা। মমতা ম্যাজিকেই আস্থা রাখার কথা জানাচ্ছেন সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির প্রেসিডেন্ট ওম প্রকাশ রাজভড়। তাঁর দল বিজেপির বিরুদ্ধে শক্তিশালী ফ্রন্ট গড়তে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরকে এক মঞ্চে চাইছেন। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গেই জোট বেঁধে লড়াই করেছিল সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি। কিন্তু পরে জোট ছেড়ে বেরিয়ে আসে তাঁরা। সভাপতি ওম প্রকাশ রাজভড় জানান, এখন বিজেপিকে রোখা সবচেয়ে বড় কাজ। সেই কারণে মেহবুবা মুফতি, কেজরিওয়াল, ওয়াইসি, উদ্ধব ঠাকরে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসঙ্গে থাকাটা দরকার।
প্রসঙ্গত, তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে অভিষেকে বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেওয়ার পরই অন্য রাজ্যে তৃণমূলের সংগঠন বিস্তারের কথা ঘোষণা করেছিলেন মমতা। তিনি যে সর্বভারতীয় স্তরে তাঁর দলকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও নিয়েছেন সেকথা তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন। যদিও যে রাজ্যে তৃণমূল লড়াই করবে সেখানে জয়ের লক্ষ্যেই লড়াই করবে সেই বার্তাও দিয়েছেন অভিষেক। উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকাও পালন করে। বিজেপি-যোগী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিজেপি বিরোধী নেতার এই ডাকে সাড়া দিয়ে সে রাজ্যে লড়াই করতে অগ্রসর হবেন কি মমতা, সেটা সময় বলবে। তবে সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির প্রেসিডেন্ট ওম প্রকাশ রাজভড়ের মমতাকে পাশে চাওয়া আরও একবার জাতীয়স্তরে মমতার গুরুত্ব প্রমান করে। সেই সঙ্গে আজ বিজেপি হটাতে তিনি যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মুখ সেটাও বোঝা যায়।
লক্ষ্য যদি অখন্ডতা বার্তায় কেন বিভাজন?
২০২৪-এর লোকসভা ভোটে মোদি বিরোধী লড়াইয়ে যদি জোট হয়; সেখানে কি কংগ্রেস-বামেরা থাকবে?
২০২৪-এর লোকসভা ভোটে মোদি বিরোধী লড়াইয়ে যদি জোট হয়; সেখানে কি কংগ্রেস-বামেরা থাকবে?