বাংলায় তৃতীয়বার সরকার গঠনের পর এই প্রথম দিল্লি যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্লেখ্য, এ বার মমতা মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর থেকেই কেন্দ্রের সঙ্গে নানা বিষয়ে সংঘাত লেগেই রয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা নিয়ে রাজ্যের বিরোধীরা তথা মোদী সরকার রাজ্যের বিরুদ্ধে লাগাতারভাবে সরব। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীও কেন্দ্রের রাজ্যের প্রতি লাগাতার অসহযোগিতা প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করে যাচ্ছেন। মমতার বক্তব্য— কেন্দ্র কোভিড মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ করছে না। রাজ্যের বকেয়া টাকা দিচ্ছে না। কেন্দ্রের কাছে জিএসটি-সহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই রকম পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি সফরের কথা উঠতেই রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মমতা তার এই দিল্লি সফরসূচিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন? এদিকে আজই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা জাতীয় নির্বাচন কমিশনে পৌঁছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানায়। উপস্থিত ছিলেন সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুখেন্দু শেখর রায়, ডেরেক ও ব্রায়ন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায় ও কাকলী ঘোষদস্তিদার। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তাদের আলোচনার বিষয় ছিল রাজ্যে সাতটি উপনির্বাচন কবে হবে তাই নিয়ে। বলাই বাহুল্য তৃণমূল উপনির্বাচন নিয়ে কমিশনের ওপর এই চাপ বাড়ানোর কৌশলকে বিজেপি ভালো ভাবে দেখছে না। কারণ বিজেপি এক্ষুনি উপনির্বাচন চায় না। তার কারণ বিপর্যয় সামাল দিয়ে এক্ষুনি উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি বিজেপির নেই। তাছাড়া বাংলায় বিজেপির বিপুলভাবে হেরে যাওয়া কর্মী-সমর্থকদের মনোবল যথেষ্ট ভেঙে পরেছে। তারওপর নতুন-পুরাতন দন্দ্বে জেরবার বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। অন্যদিকে রাজ্যে ১১২ টি পুরসভায় ভোট বাকি। সেই ভোট করানোও খুব জরুরি।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুখেন্দু শেখর রায়, ডেরেক ও ব্রায়ন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায় ও কাকলী ঘোষদস্তিদার।
জানা গিয়েছে, মমতার সম্ভাব্য দিল্লি সফর সময় ২৫ থেকে ৩০ জুলাই। দিল্লিতে তাঁর থাকার কথা ৭ দিন। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এতটা সময় তিনি দিল্লিতে এর আগে খকনও থাকেন নি। তাই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন টের পাওয়া যাচ্ছে। তবে মমতা যখন দিল্লিতে, তখন সংসদের বাদল অধিবেশন চলবে। প্রতিবারই অধিবেশন চলাকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে যান। এমনিতে দিল্লি গেলেই সংসদভবনে একবার অন্তত যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের সাংসদদের তিনি যেমন নেতৃত্ব দেন তেমনই দীর্ঘ দিন নিজে সাংসদ থাকার দরুন রাজধানীতে তার যে বিরাট পরিচিত রাজনৈতিক মহল রয়েছে, তাদের সঙ্গেও তিনি জনসংযোগ করেন।
সূত্রের খবর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার দিল্লি গিয়ে শুধুই যে দলীয় সাংসদদের সঙ্গে দেখা করবেন বা দিল্লির পার্টি অফিসে যাবেন এমনটাই নয়। মনে করা হচ্ছে বিজেপি বিরোধী মঞ্চ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে নেতৃত্বরা গুরুত্বপূর্ণ তাঁদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার দেখা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁর গতিবিধির দিকে নজর রাখবে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহল। সব মিলিয়েই এবার তাঁর দিল্লি যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪-এর নির্বাচন তৃণমূলের পাখির চোখ, একথা এখন জলের মত পরিষ্কার। আর সেই কারণেই সংসদ অধিবেশন চলাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লি যাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ দিনের এই সফরে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, এনসিপি প্রধান শরদ পাওয়ার-সহ বিরোধী শিবিরের নেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা জানা গিয়েছে। দু-দিন আগে প্রশান্ত কিশোর রাহুল গান্ধি, প্রিয়ঙ্কা গান্ধি ও কংগ্রেস সুপ্রিমো সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এর আগে দফায় দফায় সাক্ষাৎ করেছেন এনসিপি নেতা শরদ পাওয়ারের সঙ্গেও। প্রসঙ্গত, প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে ২০২৬ পর্যন্ত তৃণমূলের সঙ্গেও গাঁটছড়া বাঁধা রয়েছে। বাংলার একুশের ভোটযুদ্ধে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তৃতীয়বারের জন্য শাসন ক্ষমতায় ফেরার পর মমতা রাজনীতিতে রাজ্যস্তর থেকে জাতীয়স্তরে গুরুত্ব বাড়াতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। একাধিক রাজ্যে সংগঠন মজবুত করতে তৎপর হচ্ছে ঘাসফুল শিবির। উত্তরপ্রদেশে তৃণমূলের বেশ কয়েকটা পার্টি অফিসও ইতিমধ্যে রমরমিয়ে চালু হয়েগেছে। এমন পরিস্থিতিতে দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন দলনেত্রী। তৃণমূল নেত্রী মমতার প্রতিটি পদক্ষেপই এখন বিরোধী ঐক্য মজবুত করার লক্ষ্যেই।

উত্তরপ্রদেশে নীরজ রাই-এর নেতৃত্বে বরেলি, মোরাদাবাদ, আলিগড়, আগ্রা, গোরক্ষপুর, আজমগড়, বারাণসী, মির্জাপুর, এলাহাবাদে দলীয় অফিস খোলা হয়েছে।
২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সেটা যে মমতার একার নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছে সেকথা বিরোধীরাও মানেন। ২০২৪ সালে রয়েছে লোকসভা নির্বাচন। সংসদের বাদল অধিবেশন চলাকালীনব কংগ্রেস সভানেত্রীর সঙ্গে মমতার সাক্ষাত অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। শোনা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি সফরে সংগ্রামী কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দিল্লি লাগোয়া সিংঘু ও গাজিপুর সীমান্তে যাবেন।
তাছাড়া এবার রাজ্যের পাশাপাশি রাজধানীতেও পালিত হবে ২১ জুলাই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভার্চুয়ালি শহীদ দিবসের ভাষণ দেবেন তিনি। দিল্লি-সহ আরও বেশ কিছু রাজ্যে জায়েন্ট স্ক্রিনে সম্প্রচার করা হবে মমতার বক্তৃতা। শহীদ দিবস স্মরণের মধ্যে দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে গেরুয়া শিবিরের মনোবল ভাঙতে বক্তৃতা দেবেন মমতা।
এতদিন রাজ্য রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। অন্য রাজ্যের রাজনীতি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাননি। কিন্তু তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে তিনি বুঝেছেন, গোটাদেশে মোদী বিরোধী প্রধান মুখ তিনিই। আর এই কারণেই এবার বিরোধীদের একজোট করে লোকসভা ভোটের লড়াইতে নামতে চান মমতা। বিরোধী ঐক্য মজবুত করতে তার দিল্লি সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একথা তো ঠিক যে এই মুহূর্তে গোটাদেশে বিজেপিকে হারানোর মতো একক কোনও রাজনৈতিক দল নেই। কংগ্রেসের অবস্থাও বিভিন্ন রাজ্যে বেজায় খারাপ। তাই মোদীর বিজয়রথ থামাতে দরকার একটা জোট। ২০১৯ সালে সেই জোট গঠন হয়েছিল ঠিকই। তবে সেই জোটের কোনও মুখ ছিল না। জোটের তরফে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে কাউকে ঘোষণা করা হয়নি। জোটের দলগুলির মধ্যেও সেভাবে ছিল না ঐক্য৷ প্রত্যেকেই নিজের নীতিতে রাজনীতির ঘুঁটি সাজিয়েছিল। এবার আগের ভুলগুলি শুধরে নিতে চান মমতা। বাংলায় বিজেপিকে তিনি একাই রুখে দিয়েছেন। তারপর থেকে তিনিই এখন মোদী বিরোধী প্রধান মুখ। তাকেই বিরোধীদের একজোট করে লড়াইতে নামতে হবে। সেদিক থেকে মমতার দিল্লি সফর যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। আর তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত বিরোধী নেতৃত্বও।
দিল্লিতে তাঁর একাধিক রাজনৈতিক কর্মসূচি।বিরোধী নেতাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা- ২০২৪-র লোকসভা নির্বাচনের আগে
বিরোধী জোট মজবুত করার লক্ষ্যে আলোচনা, সিংঘু সীমান্তে আন্দোলনরত কৃষক নেতাদের সঙ্গেও দেখা করতে যেতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।