সেটা ২০০৬ সালের শেষ ভাগের কথা। সে বছরের মাঝামাঝি রাজ্য বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্ট বিপুল ভাবে জিতেছে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ভোটে জিতে দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। টাটাদের সঙ্গে কথা চলছিল কিছুদিন ধরেই, সিঙ্গুরে মোটরগাড়ি কারখানা করা নিয়ে। ভোটে জিতেই বুদ্ধবাবু জমি অধিগ্রহণের পদক্ষেপ শুরু করেছিলেন। অনেক কৃষক পরিবার এই জোর করে অধিগ্রহণ মানতে পারেনি, তাদের একজোট করে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। আমরা সিপিআইএম ছেড়েছিলাম যখন বামফ্রন্ট মধ্যগগনে, ২০০১ সালে, গড়ে তোলা হয়েছিল পার্টি ফর ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম বা পিডিএস দল। তার পাঁচ বছর পরে সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতা যেমন ছিলেন, পিডিএস-ও ছিল। তখন তৃণমূল কংগ্রেস এনডিএ-র অংশ ছিল, ২০০৬ সালেও সে ভাবেই নির্বাচনে গিয়েছিলেন মমতা।
পিডিএস আবার বিজেপিকে নিয়ে আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিল না। এসব নানা রাজনৈতিক প্রসঙ্গে আন্দোলনে জটিলতা ছিল। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে বিস্ময় জাগে, কী ভাবে অত প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্দিষ্ট লক্ষ্যপথে অবিচল ছিলেন মমতা। মনে পড়ছে, ২৭ নভেম্বর ২০০৬ তারিখের একটা ছোট্ট ঘটনার কথা। ওইদিন কলকাতার ধর্মতলায় পিডিএস-এর একটা সভা ছিল। কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে হঠাৎই স্বয়ং মমতা সে সভায় এলেন। রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেত্রী এসে যাওয়াতে তাঁকে সম্মান জানিয়ে বসতে অনুরোধ করা হলো। তিনি বললেন, সভায় তিনি অল্প একটু কথা বলবেন। তাঁকে মাইক ছেড়ে দেওয়ার পরে তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে সিঙ্গুরের লড়াইয়ে যোগ দেবার আহ্বান জানালেন। কয়েক মিনিটের ব্যাপার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলার পরে সৈফুদ্দিন চৌধুরি বলেছিলেন, নেত্রীর আহ্বান নিয়ে পিডিএস গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করবে। এখন ভেবে অবাক হতে হয়, অন্য একটা দলের সভায় তিনি কী অবলীলাক্রমে চলে এলেন, সংগ্রামের আহ্বান জানালেন।

অনেকের মনে পড়বে, ২৭ নভেম্বরের ক’দিন পরেই ধর্মতলায় অনশনে বসেন মমতা, টানা ২৬ দিন অনশন করেন। তখনও দেখেছি, কম শক্তি, বেশি শক্তি না দেখে সবাইকে নিয়ে চলার কী আগ্রহ তাঁর মধ্যে। ৪ ডিসেম্বর অনশন শুরু হয়, সে সময় মঞ্চে ছিলেন রাজনাথ সিংহ। পিডিএস-এর তৎকালীন সম্পাদক সমীর পূততুণ্ডকে মমতার এক বিশ্বস্ত দলীয় নেতা ফোন করেন, অনশন মঞ্চে আসবার জন্য। সমীর পূততুণ্ড ওই নেতাকে বলেছিলেন, আমরা এই আন্দোলনে আছি, তবে রাজনাথ ওখানে থাকলে আমাদের যাওয়া অসুবিধা। সেই নেতা ফোনে সমীরবাবুকে তখনই জানান, দিদির সঙ্গে কথা হয়েছে, রাজনাথ এখনই চলে যাবেন, আপনারা আসুন। সে মঞ্চে আমরা অনেকেই যেতাম। ২৯ ডিসেম্বর মমতা অনশন ভঙ্গ করেন, পশ্চিমবঙ্গের চেহারা ততদিনে বদলে গিয়েছে। যত বিভিন্ন ধারার, ধরনের মানুষকে মমতা সেদিন সমবেত করতে পেরেছিলেন, এ রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে তা বিরল। এর কিছুদিন পরের কথা। তখন কৃষিজমি রক্ষা কমিটি — এই নাম দিয়ে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, ভাঙর প্রভৃতি জায়গায় আন্দোলন চলছিল। সমীর পূততুণ্ড সহ কয়েকজন প্রস্তাব করেন, কমিটির নামটা একটু বদলে পশ্চিমবঙ্গ কৃষি জমি ও জীবন-জীবিকা রক্ষা কমিটি নাম দিলে জমি রক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি অন্যান্য আন্দোলনও করা যায়। নেত্রী সেটা মেনে নিলেন।
বর্তমানে প্রয়াত প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন এই কমিটির আহ্বায়কের কাজ করতেন। তেমনই একটা দিনে ওই কমিটির একটা সভায় কথা উঠেছিল, এ রাজ্যে বাম সরকারকে হারাতে গেলে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে হবে না। তখন ইউপিএ-১ সরকার চলছে কেন্দ্রে, বামফ্রন্ট সে সরকারের সমর্থক। নেত্রী খুব ধীরে ধীরে বলেছিলেন, কথাটা ঠিক, কিন্তু কেন্দ্রে কংগ্রেস পরিচালিত সরকারকে বামেরা সমর্থন করছে, সেই কংগ্রেসকে আমি কীভাবে এ রাজ্যে সঙ্গে নেব? এক লহমায় মমতার দূরদর্শিতা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মনে পড়ছে, ২০০৮ সালে বামদলগুলি কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেয়। এরপরই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে ২০০৯ সালের ভোটে যান মমতা। বামফ্রন্টের পতনের সেই শুরু। আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, ওই ২০০৯ সালের ভোটে এসইউসি-কে জয়নগর আসন ছেড়ে দেওয়া। জয়নগর লোকসভা আসনের মধ্যে দুটি বিধানসভা ক্ষেত্রে এসইউসি-র ভালো ভোট ছিল। যদি ওই দল আলাদা লড়ত, লোকসভা আসনটি বামফ্রন্ট পেয়ে যেত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসনটি এসইউসি-কে ছেড়ে দিয়েছিলেন। বারবার এমন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও গভীর চিন্তার স্বাক্ষর রেখেছেন এ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী।

এসব কথা যখন লিখছি, তখন মমতার দিল্লি সফর নিয়ে সারা ভারতে খবর হচ্ছে। সোনিয়া-রাহুল গান্ধির সঙ্গে মিটিং, ডিএমকে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল, প্রবীণ কংগ্রেস নেতারা, সবার সঙ্গে সভা করে মমতা বার্তা দিচ্ছেন, বিজেপি বিরোধী জোট গড়ে তুলতে হবে। কথা উঠছে, সে জোটের নেতা কে? মমতা বলেছেন, সেটা এখন না ভাবলেও চলবে। তিনি বলেছেন, আমি লিডার নই, ক্যাডার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যারা চেনেন, তারা জানেন, নেত্রী আলগা কথা বলেন না। তিনি চাইছেন সর্বভারতীয় ভিত্তিতে বিজেপি বিরোধী জোট, আর কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে সেটা হওয়া কঠিন। সেই বার্তাটা সবার কাছে পৌঁছে দিতেই তিনি দেখা করলেন সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে। এটাই তাঁর নেতৃ্ত্বের আসল সোনার কাঠি। পরিস্থিতি যখন যা দাবি করে, সহজ-সরল ভাবে সেটা নিজে করে দেখান মমতা। তাঁর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় একগুঁয়েমি কখনও দেখা যায়নি। এবারে লোকসভা ভোট ভারতের অন্তরাত্মাকে বাঁচাবার লড়াই। সে মহাভারতীয় সংগ্রামে দেশবাসী এমন নেতাকেই তো চায়।