দেশের পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে বাকি এখনও তিন বছর। কিন্তু সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে আগেই। আর সেই লড়াইয়ে এখনও পর্যন্ত বড় ভূমিকা নিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার বিধানসভা নির্বাচন জয়ে হ্যাটট্রিক করার পর তাঁর লক্ষ্য একটাই ২০২৪ দিল্লির কুর্সি দখল। মোদিকে হারাতেই হবে। তাই প্রস্তুতিতে কোনওরকম খামতি রাখতে চান না তৃণমূল সুপ্রিমো।
বিজেপি বিরোধী ঐক্য গড়তে আপাতত দিল্লিতে সলতে পাকানোর কাজ করছেন তৃণমূল নেত্রী। গতকাল কংগ্রেস নেতা কমলনাথ, আনন্দ শর্মার সঙ্গে একপ্রস্থ বৈঠক সেরেছেন। আর আজ কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাসভবনে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বৈঠক থেকে ইতিবাচক ফল আশা করেন রাজনৈতিক মহল। সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে আলোচনা শেষে তেমনটাই জানিয়েছেন মমতা। তিনি জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে দেশের যা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। আমি বলেছি যে কেউ নেতৃত্ব দিতে পারে। আমি নূন্যতম কাজ হলেও করব। ‘নেত্রী নই, আমি একজন কর্মী,’। মোদিকে হঠাতে সবকিছুই করতে রাজি আছি।’
অন্যদিকে দিল্লিতেও পেগাসাস ইস্যু নিয়ে কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল নেত্রী বর্তমানের বিজেপি সরকারের রাজত্বকে জরুরি অবস্থার থেকেও ভয়ঙ্কর বলেছেন। পেগাসাস নিয়ে তিনি জানিয়েছেন, ‘পেগাসাস স্পাইওয়্যার দিয়ে আমার, পিকের আর অভিষেকের ফোন হ্যাক করে নিয়েছে। সাংবাদিকদের ফোন হ্যাক করেছে, তাদের কোনও স্বাধীনতা নেই। আমাদের নিরাপত্তা নেই’। তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘ত্রিপুরাতে আই প্যাকের কিছু ছেলে-মেয়ে গিয়েছে কাজের জন্য, তাদের আটকে রেখেছে ত্রিপুরার বিজেপি সরকার। এইভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে। সংসদের মধ্যেও কাউকে কিছু বলতে দেয়না। সবার কণ্ঠরোধ করছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করার চেষ্টা চলছে’।
সোনিয়ার সঙ্গে বৈঠকে হাজির ছিলেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধি। মোদি-শাহকে হারিয়ে বর্তমানে গোটা দেশেই জনপ্রিয়তার শিখরে মমতা। সেই কারণেই দিল্লি সফরে একাধিক হেভিওয়েট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। আগামী কয়েকদিন আরও করবেন। তবে এদিন কংগ্রেস সভানেত্রীর সঙ্গে বৈঠক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যা সফল হয়েছে বলে খোদ তৃণমূল নেত্রী জানিয়েছেন। তিনি নতুন স্লোগান দিয়েছেন ‘হোপ ২০২৪’।

প্রসঙ্গত, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা কমল নাথের সঙ্গে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির সুসম্পর্কের কথা রাজধানীতে সবাই জানে। অন্যদিকে কংগ্রেস শীর্ষ নেতা অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি নারদ মামলা থেকে শুরু করে অনেক মামলাতেই তৃণমূল নেতাদের হয়ে আইনজীবী হিসাবে কাজ করে চলেছেন। মোদি বিরোধী মুখ হিসাবে এখন মমতার ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কেবল রাজনৈতিক মহল নয় সবাই জানেন। তাই মমতার সঙ্গেই জোট তৈরি করে নতুন করে জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে মরিয়া কংগ্রেস। সোনিয়া গান্ধী এবং মমতা ব্যানার্জির মধ্যে সম্পর্কও বহুকালের। তাঁরা কোনওদিন একে অপরকে ব্যক্তি আক্রমণ করেন না। সম্প্রতি পেগাসাস কাণ্ডে কংগ্রেস-তৃণমূলের মধ্যে নতুন করে সখ্যতা তৈরি হয়েছে। অভিষেক ব্যানার্জিকে উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরছে কংগ্রেস। যা থেকে বোঝাই যাচ্ছে কংগ্রেস-তৃণমূল সেতুবন্ধনের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে দিল্লির ময়দানে মমতা ব্যানার্জির খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে।
মোদী সরকারকে উৎখাতে মরিয়া মমতা। দিল্লি সফরে শুরুতেই তৃণমূল নেত্রী স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে, আপাতত বিরোধীদের একসূত্রে গাঁথতে তৎপর তিনি। কিন্তু এই পরিস্থিতি বড় হয়ে উঠেছে বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বের প্রশ্ন। কে হবেন বিরোধী মুখ? এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি জ্যোতিষী নই। এটা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে। অন্য কেউ জোটের নেতৃত্ব দিলে আমার কোনও আপত্তি নেই। এটা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, যখন প্রয়োজন পড়বে তখন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হবে। অন্যদিকে দিদিকেই দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে ধরছে তৃণমূল। কিন্তু, বিজেপি বিরোধী ঐক্য গড়তে আপাতত দিল্লিতে সলতে পাকানোর কাজ করছেন তৃণমূল নেত্রী।
দিল্লিতে পা রাখার পর থেকেই মমতাকে ঘিরে রয়েছে তামাম মিডিয়া৷ কেবল মিডিয়া নয়, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন রাজনীতিকরাও৷ কারণ সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে একজোট করার নেত্রী হিসেবে উঠে আসছে তাঁর নাম৷ অনেক আগে থেকেই ২৪-এর বিজেপি বিরোধী জোটের ঐক্য মঞ্চকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন বাংলার দিদি। আর তারপর থেকেই ঘুরেফিরে প্রশ্ন আগামীদিনে বিরোধী জোটের নেত্রী কি তাহলে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী? কিন্তু আজও বিচক্ষণ রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায জানিয়েছেন, ‘আমি একা কিছু পারব না৷ দেশকে বাঁচাতে হলে বিজেপিকে হারাতে হবে৷ আর সেজন্য সকলকে একত্রিত হওয়া জরুরি’৷ তারপরই হাসতে হাসতে বোমা ফাটিয়েছেন, ‘আমি থোরাই লিডার, আমি তো ক্যাডার’। টানা ১৩ বছরের সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে হ্যাটট্রিক করার পরও একমাত্র মমতাই এমন অনায়াস ভঙ্গীতে বলতে পারেন।