আক্ষরিক অর্থেই জনজোয়ার। আর সেই জনজোয়ারেই একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন, শিলান্যাস ও পরিষেবা প্রদান করলেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেইসঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকও সারলেন। উল্লেখ্য, সোমবার ছিল আরামবাগের কানায় কানায় পূর্ণ কালীপুর মাঠ। দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ তাঁর কপ্টার এখানে অবতরণ করে। তারপর-ই শুরু হয় সভার কাজ।
প্রথমেই মুখ্যমন্ত্রী হুগলি জেলার উল্লেখযোগ্য খাবার, কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্প নিয়ে সৃষ্টিশ্রী নামে একটি স্টল পরিদর্শন করেন। এরপর তিনি সভামঞ্চে চলে আসেন। মঞ্চে উপস্থিত সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাংসদ দীপক অধিকারী (দেব) এর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পরেই মাইক্রোফোন হাতে নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রায় এক ঘন্টা বক্তব্যের অধিকাংশই সরকারের উন্নয়ণ ও জনমুখী প্রকল্প সংক্রান্ত। মঞ্চ থেকে সরকারের কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, রূপশ্রী ইত্যাদি প্রতিটি প্রকল্পের কিছু উপভোক্তাকে মঞ্চ প্রতিকী হিসাবে এগুলি প্রদান করা হয়। লক্ষ্মী ভান্ডারের টাকা দ্বিগুণ করা, মিড ডে মিলের কর্মীদের ভাতা পাঁচশো টাকা বৃদ্ধি করা। ভিলেজ পুলিশের সাম্মানিক বাড়োনো — এই সব উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছাসে ফেটে পড়ে জনতা। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে তিনি সাম্প্রতিক রাজ্য বাজেটের অনেকটাই উল্লেখ করলেন। বক্তব্য রাখতে গিয়ে বললেন, ‘দিদি বলে না, দিদি করে দেখায়। কেন্দ্র সরকার এখান থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু আবাস যোজনার টাকা দেয়নি, একশো দিনের টাকা দেয়নি। কিন্তু আমরা মানুষের পাশে আছি। আমরা ঠিক করেছি ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ লক্ষ মানুষ যারা একশো দিনের কাজ করে টাকা পাননি , তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেব। আমরা রাজ্য সরকারের উদ্যোগে পঞ্চাশ দিন কাজের ব্যবস্থা করব। কবে দিল্লি দেবে তবে হবে, কবে কোকিল ডাকবে তবে বসন্ত আসবে সেই আশায় আমরা বসে থাকব না। আমরা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজ দফায় দফায় শুরু করব। কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়পত্র না দেওয়ায় কাজ করা যায়নি, এবার আর বসে থাকব না।’ এদিনের মঞ্চ থেকে বেশ কিছু নতুন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৬১০ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকায় নির্মিত চাঁপাডাঙ্গা, পুরশুড়া, আরামবাগ ফোর লেন রাস্তা, ১৫৫৬ কোটি টাকায় নির্মিত উত্তরপাড়া পুরসভার জল প্রকল্প, খানাকুল ১ ব্লকে ২০ কোটি ১৬ লক্ষ টাকায় নির্মিত হিমঘর, সিঙ্গুরে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ, ৬৭২ কোটি টাকায় দামোদর মুণ্ডেশ্বরী নদীর বাঁধ মেরামত ইত্যাদি। এছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘তারকেশ্বর মন্দির ও সংলগ্ন এলাকার কাজ করার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। কামারপুকুর মঠের ও এলাকার উন্নয়ণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই সব উন্নয়নের পাশাপাশি আমরা জেলায় ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার দিকেও নজর দিচ্ছি, যাতে যুব — যুবতীদের কর্ম সংস্থান হয়। আমরা চাকরি দেওযার প্রক্রিয়া শুরু করছি, সি পি এম ও অন্যান্য দল কোর্টে চলে যাচ্ছে। কিছুতেই আমাদের এগোতে দেবে না। আমি বলি কোর্টে নয়, ভোটে দাঁড়াও। তোমাদের ক্ষমতা দেখা যাবে।’ এতো কিছুর পরেও দুটি বিষয়ে অপূর্ণ থেকে গেল বহু মানুষের স্বপ্ন। অনেকেই আশা করেছিলেন এবার দিদি আরামবাগকে জেলা ঘোষণা করবেন। ব্যাপক সভা সমিতি, পদযাত্রা হয়েছিল তাই নিয়ে। আবেদন পত্রও পাঠানো হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো আশ্বাস দেননি তিনি। আর রামমোহনের জন্ম স্থানের খুব কাছে এসে এবং আরামবাগ মহকুমায় দাঁড়িয়ে রামমোহন নামটি পর্যন্ত একবারও উচ্চারণ করেননি তিনি, তাঁর এলাকা উন্নয়ন তো অনেক পরের কথা।
রসঙ্গত, সোমবার আরামবাগে আসেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কালীপুর স্পোর্টস কমপ্লেক্সে সরকারি পরিষেবা প্রদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। সেই উপলক্ষে প্রশাসনের তৎপরতা ছিল তুঙ্গে। মাঠের চারদিক নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। এদিন মুখ্যমন্ত্রীর সফর ঘিরে উৎসাহ উদ্দীপনা তুঙ্গে। ইতিমধ্যে মেডিক্যাল কলেজ, রেল সহ একাধিক পরিষেবা দিয়ে মহকুমাকে বদলে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে কি আরামবাগকে জেলা করা নিয়ে তিনি কোনও বার্তা দেবেন ? এই আশা করেছিলেন আরামবাগবাসী । কিন্তু নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে।
আরামবাগ সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত এক দশকে আরামবাগ বদলে গিয়েছে। কংগ্রেস ও বাম আমলে এই মহকুমা বরাবর উপেক্ষিত থেকেছে। তৃণমূল সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরামাগের উন্নয়নে নজর দেন। স্বাধীনতার পর প্রথমবার আরামবাগের উপর দিয়ে রেল চলাচল শুরু হয়। মেডিক্যাল কলেজের মাধ্যমে মহকুমার প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা সুবিধা পেতে শুরু করেছেন। খানাকুলে মুচিঘাটা ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। এই ব্রিজ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে যাতায়াত আরও সহজ করে তুলবে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী পড়ুয়াদের কথ্য ভেবে আরামবাগ হাইস্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে পঠনপাঠন শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির পরিষেবা আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় পাকা রাস্তা, পরিশ্রুত পানীয় জল ও উজ্জ্বল আলো পাওয়া যাচ্ছে। ধারাবাহিক উন্নয়নের কাজ মহকুমাবাসীকে জেলা পাওয়ার আশা বাড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে গত সপ্তাহে সব দফতরের বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব ভগবতী প্রসাদ গোপালিকা। সেই বৈঠকে স্পষ্ট করে নির্দেশ দেওয়া হয় যে দফতর অনুযায়ী কোথায় কত শূন্যপদ (Vacant Post in West Bengal Govt) রয়েছে তার দ্রুত হিসাব বের করতে। স্থায়ী (Permanent) ও অস্থায়ী (Contractual) দুই রকম পদের জন্যই দফতরওয়াড়ি তথ্য চাওয়া হয়।তার পর সোমবার আরামবাগে প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, রাজ্য সরকারি চাকরিতে প্রায় ৫ লক্ষ শূন্যপদ রয়েছে। সরকার ওই সব শূন্যপদ পূরণ করতে চায়। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ৫ লক্ষের মধ্যে ১ লক্ষ শূন্যপদ রয়েছে শিক্ষকদের জন্য। এ ছাড়া পুলিশে নিয়োগ করা হবে ৬০ হাজার। বাংলায় সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার জন্য এদিন বিরোধীদের দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমি সরকারি চাকরিতে ৫ লক্ষ পদ তৈরি করতে চাইছি। শুধু বিজেপি আর সিপিএমকে বলুন না আটকাতে। ওদের কোনও মায়াদয়া নেই’।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘আদালতে যেতে কারও বাধা নেই। কিন্তু ওরা আদালতে যাচ্ছে আর মামলা করে চাকরি আটকে দিচ্ছে। তার পর বলছে, কেমন আটকে দিলাম। অথচ ১ লক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে সরকারকে। পুলিশে ৬০ হাজার নিয়োগ করা হবে। সব মিলিয়ে সরকারি চাকরিতে ৫ লক্ষ নিয়োগ হবে’।